h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৮ : উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস|

Posted on: 03/07/2015


1526408_699633360082001_1080703724_n

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৮ : উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস|
রণদীপম বসু

উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস :

প্রাচীন বিশ্বাস অনুসারে রক্তবর্ণ উর্বরতার প্রতীক। হয়তো আরো অনেক কিছুই প্রাচীন জাদুবিশ্বাসে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু রক্তরঙের প্রতীকটিকে প্রাচীন মানবগোষ্ঠির বিভিন্ন জাতি ও সমাজে তাৎপর্যময়রূপে উর্বরাশক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় বলে নৃতত্ত্ববিদেরা মনে করেন। কোথাও ডালিম প্রতীকে, কোথাও সিঁদুর প্রতীকে, কোথাও বা অন্যকিছু। এই ডালিম-ফলের তাৎপর্য প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টমসনের বক্তব্যটি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লোকায়ত দর্শন গ্রন্থে পাওয়া যায়-


‘প্রাচীন পরিব্রাজক পৌসানিয়াস-এর কাছ থেকে প্রাচীন গ্রীক সমাজ সংক্রান্ত নানা খবর পাওয়া যায়। কিন্তু ডালিম-ফলের রহস্য উদ্ঘাটন করতে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত : ‘ডালিমের কথা আমি বিশেষ কিছু বলবো না, কেননা তার রহস্য অত্যন্ত গোপন।’ অধ্যাপক জর্জ টমসন প্রশ্ন তুলছেন, গোপন রহস্যটা কী রকম?
ডালিম-ফলের ভিতরটা টুকটুকে লাল। ডালিমের দানা থেকেই গ্রীক ভাষায় রক্তবর্ণসূচক শব্দটি এসেছে। ডালিম তাই রক্তের প্রতীক। এ-কথা অনেকেই স্বীকার করেছেন। কিন্তু রক্তের তাৎপর্য এখানে ঠিক কী?- এ-প্রশ্নের সমাধান ঠিকমতো করা হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, খুন বা অপঘাত-মৃত্যুর সঙ্গেই এ-রক্তের সম্পর্ক। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে টাইটানরা ডাইওনিসাসকে হত্যা করলে পর তাঁরই রক্ত থেকে ডালিম গাছের জন্ম হয়। এ-ছাড়াও মৃত্যু ও অপঘাতের সঙ্গে ডালিম-এর সম্পর্ক আরো কোনো কোনো দিক থেকে পাওয়া যায়। প্রাচীনদের বিশ্বাস অনুসারে ডালিমের স্বপ্ন অপঘাতের সূচনা করে। কিন্তু অধ্যাপক জর্জ টমসন দেখাচ্ছেন, রক্ত ও রক্তবর্ণের প্রতীক ডালিমের এই অনুষঙ্গগুলি মুখ্য নয়,- গৌণ। অর্থাৎ এগুলির পিছনে একটি মুখ্য তাৎপর্য আছে- সেই তাৎপর্যেরই আলোচনা তুলতে পৌসানিয়াসের সংকোচ হয়েছে।
ডালিম হলো রক্তের প্রতীক। কিন্তু কোন ধরনের রক্ত? প্রাচীন গ্রীক বৈদ্যশাস্ত্র থেকে তা আন্দাজ করা যেতে পারে। গ্রীক বৈদ্যরা ঋতু ও গর্ভ ব্যাপারেই ডালিম ব্যবহার করবার নির্দেশ দিয়েছেন। এই কারণেই, কোনো কোনো গুহ্য-সম্প্রদায়ের কাছে ডালিম ছিলো ‘টাবু’ : ঋতু-রজকে প্রাচীন কালের মানুষেরা ‘টাবু’ মনে করতেন। থেসমোফোরিয়া-উৎসবের সময় মেয়েদের পক্ষে শুধুই যে মৈথুন নিষিদ্ধ ছিলো তাই নয়; সেই সঙ্গে ডালিমও ছিলো নিষিদ্ধ। আর সেই সঙ্গে নির্দেশ ছিলো, তাদের শ্বেত-শয্যায় শুতে হবে, কেননা এই শ্বেত-শয্যার দরুন তাদের কামভাব সংহত থাকবে এবং তাছাড়াও শয্যার কাছে সাপ আসতে পারবে না। (প্রাচীনদের কল্পনা অনুসারে সাপের সঙ্গেও মেয়েদের যৌন-জীবনের যোগাযোগ আছে।) অধ্যাপক জর্জ টমসন তাই সিদ্ধান্ত করছেন, শ্বেত-শয্যা যদি মেয়েদের রতিবাসনার প্রতিষেধক বলে বিবেচিত হয় তাহলে সেইসঙ্গেই ডালিম-পরিহারের নির্দেশ থেকে অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে, এই ডালিম রতিবাসনার উদ্দীপক বলেই বিবেচিত হয়েছিলো। আর তাই, ডালিম যে-রক্তের প্রতীক সে-রক্তের আদি-তাৎপর্য আঘাত-জাত রক্ত নয়; নারীর যৌন-জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত রক্ত- ঋতু-রজ। প্রাচীনদের কল্পনা অনুসারে, নারীর উৎপাদিকা-শক্তির মূলে রয়েছে এই ঋতুরজই। এবং এই ঋতুরজের সঙ্গে সাদৃশ্যের দিক থেকেই ডালিম তাদের কাছে উর্বরতার প্রতীক। পৌসানিয়াস যে কেন ডালিমের রহস্য ব্যাখ্যা করতে সংকোচ বোধ করেছিলেন তা বুঝতে পারাও তাই কঠিন নয়।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৩৪-৫)


কৃষিকাজ যেহেতু মেয়েদের আবিষ্কার, কৃষিকেন্দ্রিক প্রাচীন অনুষ্ঠান তাই নারীজীবনের নানারকম গোপন ও গভীর রহস্যের সঙ্গে জড়িত। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে রক্ত বর্ণের সঙ্গে নানাদিক থেকে গণেশের নানারকম সম্পর্ক রয়েছে। সিঁদুরের নাম গণেশ-ভূষণ। এই ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে অশোভন ও অসংলগ্ন বলে মনে হয়। কেননা এই সিঁদুর সধবাদেরই সিঁথির ভূষণ। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই সিঁদুরের তাৎপর্যটা কী? এই প্রশ্নের উত্তরেও অধ্যাপক জর্জ টমসন বহু তথ্য পর্যালোচনা করে যে সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির নানা মৌলিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করে। তাই দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের তর্জমায় অধ্যাপক টমসনের সুদীর্ঘ উদ্ধতিটি উপস্থাপন করা যেতে পারে-

‘মানুষের সন্তান-উৎপাদন সংক্রান্ত জাদুবিশ্বাস, ফলাফলের বদলে ফলপ্রসূ পদ্ধতিটির সঙ্গে– সন্তানের বদলে ঋতু ও লোকিয়া-স্রাবের সঙ্গে– সংযুক্ত। ফলে ঋতু ও লোকিয়া সমস্ত স্রাবকেই কল্পনা করা হয় নারীর মধ্যে অন্তর্নিহিত প্রাণদায়িনী শক্তির বিকাশ হিসেবে। আদিম ধ্যানধারণা অনুসারে ঋতুস্রাব সন্তানের জন্মাদানের সমতুল্য পদ্ধতি বলেই বিবেচিত। এই জাদুবিশ্বাসের মধ্যে আত্মবিরোধ আছে : রক্তের ওই শক্তিই আবার তাকে ভয়াবহ করে তোলে। একদিক থেকে ঋতুমতী নারী এতো পবিত্র যে, তাকে স্পর্শ করা চলে না। অপর দিক থেকে সে কলুষিত, অস্পৃশ্য। তার অবস্থা হলো, রোমানরা যাকে বলতো ‘sacra’- পবিত্র আর ঘৃণিত দুই-ই। ফলে পুরুষপ্রধান সমাজে ধর্মাচরণের উপর মেয়েদের অধিকার লুপ্ত হবার পর এই জাদুবিশ্বাসের নেতিমূলক দিকটিরই জন্ম হয় : ঋতুমতী নারী শুধুমাত্র কলুষিত বলেই বিবেচিত হয়।
এই ধারণাগুলি সার্বভৌম। ঋতুমতী ও প্রসবিনীদের প্রতি মনোভাব-সংক্রান্ত ধারণায় সবদেশের সবমানুষের মধ্যে যতোখানি মিল আছে আর কোনো বিষয়ে তা নেই। ব্রিফল্ট এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং মানবজাতির সমস্ত শাখা ও মানব সংস্কৃতির সমস্ত পর্যায় থেকে দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করেছেন…
এ্যারিস্টটল, প্লিনি প্রভৃতি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বিজ্ঞানীদের ধারণায়, ঋতুস্রাব বন্ধ হবার পর গর্ভের মধ্যে ওই ঋতুরজ জমেই সন্তানের দেহগঠন করে। এই রক্তই হলো প্রাণদায়িনী রক্ত। তাই, কোনো মানুষ বা কোনো বস্তুর উপর ‘টাবু’ ধার্য করবার সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো, তার উপর রক্ত-চিহ্ন বা রক্ত-বর্ণ চিহ্ন দেওয়া- ঋতুস্রাব বা লোকিয়া-স্রাব বা তারই কোনো অনুকরণ থেকে এই ব্যবস্থার উৎপত্তি। টাবুটির অন্তর্নিহিত অন্তর্দ্বন্দ্ব অনুসারেই এই রক্তচিহ্নের দু’রকম তাৎপর্য : চিহ্নিত বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক-নিষেধ এবং প্রাণশক্তির সঞ্চার। সারা পৃথিবীতেই দেখা যায়, ঋতুমতীর অঙ্গে লালমাটির প্রলেপ লাগাবার ব্যবস্থা আছে- তার দরুন পুরুষদের দূরে রাখা ও উর্বরা-শক্তির বৃদ্ধি দুটো কাজই হবে। অনেক জায়গায় বিবাহানুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে স্ত্রীর কপালে রক্ত-বর্ণ চিহ্ন দেবার ব্যবস্থা আছে- এ-চিহ্নের অর্থ, স্বামী ছাড়া অন্যান্য সমস্ত পুরুষের কাছেই মেয়েটি নিষিদ্ধ হলো এবং স্বামীর কাছে সে সন্তানদানের জন্য প্রতিশ্রুত হলো। অঙ্গরাগের উৎস এই থেকেই।
বাণ্টুদের একটি জাতির মধ্যে দেখা যায়, প্রতিটি মেয়েই একটি করে লালমাটির পাত্র রাখে; পাত্রগুলি মেয়েদের কাছে পবিত্র, অনুষ্ঠানের সময় এর থেকেই তারা মুখ ও অঙ্গ রঞ্জিত করে। নানা রকম অনুষ্ঠানেই তাদের কাছে এই পাত্রগুলির প্রয়োজন হয়। তার মধ্যে নিম্নোক্ত অনুষ্ঠানগুলি উল্লেখযোগ্য : আঁতুড়ঘরের পর্ব শেষ হবার সময় প্রসূতা ও সন্তান উভয়কেই এই লালরঙে রঞ্জিত করা হয়- এরই দরুন সন্তানটি বেঁচে থাকবে এবং মা ফিরে আসবে জীবিতদের মধ্যে। ‘দীক্ষা’র (initiation) সময় মেয়েটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত রক্তবর্ণে রঞ্জিত করা হয় : এইভাবেই মেয়েটি যেন নতুন জন্ম পেলো এবং এবার থেকে সে ফলবতী হবে। অশৌচাবস্থা শেষ হবার পর বিধবারা অগ্নি স্পর্শ করে এবং তাদের লাল রঙে রঞ্জিত করা হয় : এইভাবেই সে মৃত্যুর ছোঁয়াচ থেকে ফিরে আসে।
রক্তবর্ণ হলো নবজীবন। তারজন্যেই দেখা যায়, প্রাচীন প্রস্তর যুগের উচ্চাবস্থার এবং নব্যপ্রস্তর যুগের কবরখানা থেকে পাওয়া হাড়গুলিতে লাল রঙ মাখানো রয়েছে। প্রতীকটির অর্থ আরো স্পষ্ট হয় যখন দেখি,–এবং প্রায়ই তা দেখতে পাওয়া যায়,– কঙ্কালগুলি গুটোনো ভ্রূণাবস্থার ভঙ্গিতে রয়েছে। মৃতের নবজন্ম সুনিশ্চিত করবার আশায় আদিম মানুষেরা এইভাবে তাকে গর্ভস্থ শিশুর মতো কুঁকড়ে এবং জীবনের রঙে রঞ্জিত করে রাখবার চেয়ে বেশি আর কীই বা করতে পারতো?’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৩৮-৯)


টমসনের রচনা থেকে বিশেষ মূল্যবান এই উদ্ধৃতিটুকু আমাদের দেশের নানান রকম আচার-অনুষ্ঠান এবং ধ্যানধারণাকে এইদিক থেকে বোঝবার সুযোগ করে দেয়। আমাদের দেশের সধবারা সিঁথিতে সিঁদুর দেয় এবং সধবাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সিঁদুরের ব্যবহার ভূয়ঃপ্রচলিত। এর পিছনে সেই আদিম বিশ্বাসই লুকোনো আছে- ওই রক্তবর্ণ ঋতুরজের, অতএব নবজন্মের প্রতীক। ফলে এরই স্পর্শে সধবারা সন্তানবতী হবার কামনাকে সফল করতে চায়। রক্ত ও রক্তবর্ণের এই প্রতীক-তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এই আদিম বিশ্বাসের দিক থেকেই সিন্ধু-সভ্যতার মাতৃমূর্তিকা প্রভৃতির ব্যাখ্যা অন্বেষন করেছেন-
হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোর মাতৃ-মূর্তিকাগুলি যে ওই বসুমাতা হিসেবেই পরিকল্পিত হয়েছিল- মার্শাল সর্ব-প্রথম এ-অনুমান করেছিলেন। এবং তাঁর মতে অন্যান্য দেশের বসুমাতার মতোই সিন্ধু-সভ্যতার এই বসুমাতাও প্রকৃতির উর্বরতাদায়িনী বলেই কল্পিত। এই যুক্তি অনুসরণ করেই ম্যাকে মন্তব্য করেছেন, বসুমাতার মূর্তিকা বলেই এগুলি গড়বার উপাদান মৃত্তিকা বা পৃথিবী।
বসুমাতার মূর্তিকা বলেই এগুলির মূলে সিন্ধু-সভ্যতার ওই বসুমাতার সম্পর্ক চোখে পড়ে। ম্যাকে এ-বিষয়ে নানা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। যেমন মূর্তিকাগুলির সঙ্গে রক্তবর্ণের সম্পর্ক- আদিম বিশ্বাস অনুসারে ওই রক্তবর্ণ উর্বরতার প্রতীক। দক্ষিণ-বেলুচিস্থানে আবিষ্কৃত দেবী-মূর্তিকার অঙ্গে যে কড়ির ভূষণ তারও ব্যাখ্যা একই হওয়া সম্ভব। ম্যাকে বলছেন, মাতৃ-মূর্তিকার অঙ্গে এ জাতীয় কড়ির অলংকারই স্বাভাবিক, কেননা সুপ্রাচীন কাল থেকেই কড়ি উর্বরতার অনুকুল জাদুশক্তি-বিশিষ্ট কল্পিত; মহেঞ্জোদারোর মূর্তিকার অঙ্গেও হয়তো এ-জাতীয় কড়ির অলংকার ছিল, কিন্তু এতদিন মাটিচাপা পড়ে থাকার দরুন আমাদের পক্ষে অলংকারের কড়ি সনাক্ত করা কঠিন।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭২)

এ প্রেক্ষিতে মনে হয় উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না যে, এখনও হিন্দু সংস্কৃতির সাধারণ জনগোষ্ঠিতে শঙ্খ বা শাঁখার ব্যবহার সধবা নারীদের জন্য অবশ্যম্ভাবী। তাছাড়া প্রচলিত বিবাহ-অনুষ্ঠানের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাচার হিসেবে নববিবাহিত দম্পতির মধ্যে পাশা-খেলার নামে কড়ি-খেলার যে আকর্ষণীয় প্রচলন পরিলক্ষিত হয়, তা যে আদতে নবদম্পতির মধ্যে প্রজনন-উর্বরতা কামনার সেই আদিম-বিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন লৌকিক অনুষ্ঠানে কড়ির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। আর ভারতীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিনিময়ের সাধারণ মাধ্যম হিসেবে আধুনিকতম মূদ্রার প্রচলনও কিন্তু শুরু হয়েছিলো কড়ির ব্যবহারের মাধ্যমেই। এর সাথে সুপ্রাচীন সিন্ধু-সংস্কৃতির কোন যোগসূত্র আছে কিনা তা ভাববার বিষয় বৈকি। আর সিঁদুর মানেই তো সধবার প্রতীক, যার কাছে ফলনশীল উর্বরতা কামনা করা হচ্ছে।

অতএব, দেবীপ্রধান সিন্ধু-ধর্মে উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে দেবী বলতে শাকম্ভরী বা বসুমাতা যে সন্তানদায়িনী জননীর অনুরূপ শস্যদায়িনী পৃথিবী অর্থাৎ, প্রাকৃতিক উর্বরতার কামনাই ওই বসুমাতা-কল্পনার প্রধান উপাদান, এ বিষয়ে নিশ্চয়ই দ্বিমতের অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাদের ধ্যানধারণায় এ-জাতীয় বিশ্বাস গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে? হয়তো এর একটি উত্তরই সম্ভব, প্রাকৃতিক উর্বরতার উপরই যাদের জীবন নির্ভরশীল, পৃথিবীর ফলপ্রসূতাই যাদের সমৃদ্ধির চরম উৎস, অর্থাৎ এক কথায়, যারা কৃষিজীবী। যেহেতু কৃষি-উৎপাদনই ছিলো সিন্ধু-সভ্যতার চরম অর্থনৈতিক ভিত্তি, তাই এ-সভ্যতায় শস্যদায়িনী পৃথিবীর তথা বসুমাতার বা শাকম্ভরীর উপাসনা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

মূলত এই জাদুবিশ্বাসগুলি হচ্ছে প্রাচীন কৃষিজীবী মানুষের ঐকান্তিক উর্বরতা ও ফল কামনারই বহিঃপ্রকাশ। এবং তার ফলে কৃষিকেন্দ্রিক লোকায়ত অনুষ্ঠানে বীজের বদলে উৎপাদন-ক্ষেত্রেরই প্রাধান্য। এই ক্ষেত্রপ্রাধান্য মূলত মাতৃ-প্রাধান্যেরই পরিচায়ক। এখানে বীজ অপ্রধান। আমাদের দেশে এককালে পিতৃপ্রাধান্য ও মাতৃপ্রাধান্য অর্থে বীজপ্রধান ও ক্ষেত্রপ্রধান শব্দ ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। যদিও পিতৃপ্রধান আর্যসভ্যতায় বীজের প্রাধান্য ঘোষণা করতে গিয়ে ‘মনুসংহিতা’য় বলা হয়েছে-

‘ক্ষেত্রভূতা স্মৃতা নারী বীজভূতঃ স্মৃতঃ পুমান্ ।
ক্ষেত্রবীজসমাযোগাৎ সম্ভবঃ সর্বদেহিনাম্’।। (মনুসংহিতা-৯/৩৩)
‘বীজস্য চৈব যোন্যাশ্চ বীজমুৎকৃষ্টমুচ্যতে।
সর্বভূতপ্রসূতির্হি বীজলক্ষণলক্ষিতা’।। (মনুসংহিতা-৯/৩৫)
‘যাদৃশং তূপ্যতে বীজং ক্ষেত্রে কালোপপাদিতে।
তাদৃগ্ রোহতি তত্তস্মিন্ বীজং স্বৈর্ব্যঞ্জিতং গুণৈঃ’।। (মনুসংহিতা-৯/৩৬)
অর্থাৎ :
নারী শস্যক্ষেতের মতো, আর পুরুষ শস্যের বীজস্বরূপ। এই ক্ষেত্র ও বীজের সংযোগে সকল প্রাণীর উৎপত্তি (মনু-৯/৩৩)।  বীজ এবং যোনি এই দুটির মধ্যে বীজই শ্রেষ্ঠ বলে কথিত হয়। কারণ, সর্বত্র সন্তান বীজের লক্ষণ যুক্ত হয়ে থাকে (মনু-৯/৩৫)।  বপনের উপযুক্ত বর্ষাকাল প্রভৃতি সময়ে উত্তমরূপে কর্ষণ-সমীকরণ প্রভৃতি পদ্ধতির দ্বারা সংস্কৃত ক্ষেত্রে যেরকম বীজ বপন করা হয়, সেই প্রকার ক্ষেত্রে সেই বীজ বর্ণ-অবয়বসন্নিবেশ রস-বীর্য প্রভৃতি নিজগুণের দ্বারা বিশিষ্ট হয়ে শস্যরূপে উৎপন্ন হয় (মনু-৯/৩৬)


কিন্তু পিতৃপ্রধান আর্য-আধিপত্যে চাপা পড়েও এতদঞ্চলের প্রাচীন মাতৃপ্রধান কৃষিজীবী মানুষের কামনাগুলি এখনো যে সেই প্রাচীন জাদুবিশ্বাসের রেশ নিয়ে এখনো সমাজের লোকায়তিক ধর্ম-বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে তার প্রমাণ বিভিন্ন লৌকিক অনুষ্ঠান। যার মধ্যে পুরুষ-প্রধান আর্য-সংস্কৃতির প্রভাব খুব একটা চোখেই পড়ে না। সেখানে কৃষিকেন্দ্রিক মাতৃপ্রাধান্যই স্বীকৃত। এরকম অন্যতম একটি অনুষ্ঠান হলো ‘গণেশচতুর্থী ব্রত’। এই ব্রতের কিছুটা বর্ণনা পাওয়া যায় নগেন্দ্রনাথ বসু সংকলিত ‘বিশ্বকোষ’-এ (৫/২০৬-৭)। তবে এর পূর্ণতর বিবরণ রয়েছে ১৯০৬ সালের ইন্ডিয়ান এ্যান্টিকোয়ারি পত্রিকায় শ্রীযুক্ত বি. এস. গুপ্তের প্রবন্ধে। তার উপর ভিত্তি করে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে লিখেন-

ব্রতটি এখন প্রধানতই দক্ষিণাপথবাসীদের মধ্যে প্রচলিত। বোম্বাই ও পুণা অঞ্চলে এই উপলক্ষ্যে বিশেষ ধুমধাম হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমাদের বাংলাদেশের সঙ্গে এই ব্রতের কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে কিছুটা নামান্তরের ও কিছুটা রূপান্তরের আড়ালে এই ব্রতই আমাদের অঞ্চলেও বর্তমান রয়েছে।…
ব্রতটি একদিনে উদ্যাপিত হয় না। সাতদিন ধরে একটানা এর অনুষ্ঠান চলে। কিন্তু মজা হলো, যদিও গণেশের নাম থেকেই ব্রতটির নামকরণ হয়েছে এবং যদিও ব্রত অনুষ্ঠান শুরু হবার আগে থাকতেই গণেশকে নিয়ে বেশ কয়েকদিন অনেক রকম সমারোহ করা হয়, তবুও আসল অনুষ্ঠানের মধ্যে খোদ গণেশকে দেখতে পাওয়া যায় মাত্র প্রথম দু’-একদিন। বাকি ক’দিনের অনুষ্ঠানটির মধ্যে গণেশের কোন স্থান নেই। হালকা ভাষায় বললে বলা যায়, প্রথম দু’-একদিনের মধ্যেই সিদ্ধিদাতার যেন সুবুদ্ধি দেখা দেয়। কৃষিকেন্দ্রিক এই অনুষ্ঠানটিতে নেহাতই মেয়েলি ব্যাপার বলে চিনতে পেরে তিনি বিদায় নেন দৃশ্যপট থেকে। তাঁর জায়গায়, ব্রতের কেন্দ্রে, এসে দাঁড়ান গৌরী। ফলে গণেশচতুর্থী-ব্রতের বেশির ভাগটাই হয়ে দাঁড়ায় গৌরী-ব্রত।
ভাদ্র মাসের চতুর্থী তিথিতে গণেশ-চতুর্থী ব্রতের শুরু। ওই দিনটিই বুঝি গণেশের জন্মদিন। পুণা ও বোম্বাই অঞ্চলে আজকাল অবস্থাপন্ন বাড়িতে গণেশমূর্তি কিনে এনে এই দিনটিতে মহা সমারোহে গণেশ-পুজো হয়। বলাই বাহুল্য, অবস্থাপন্ন পরিবারের সমারোহের মতোই এই পুজোপাঠের ব্যাপারটাও অবশ্যই অর্বাচীন। হয়তো তার আড়াল থেকে গণেশচতুর্থী ব্রতের প্রথম দিনকার অনুষ্ঠানের আদি ও অকৃত্রিম রূপটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। দুঃখের বিষয়, ইন্ডিয়ান-এ্যান্টিকোয়ারির প্রবন্ধ-লেখকও গণেশকে কৃষি-উৎসবের প্রতীক বলে প্রমাণ করবার ভ্রান্ত আগ্রহে গণেশচতুর্থী ব্রতের প্রথম দিনকার বর্ণনাটি দিতে ভুলে গিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ভাদ্র পঞ্চমীর দিনই, গণেশের বিসর্জন।
এইভাবে, ব্রত অনুষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে গণেশ বিদায় গ্রহণ করবার পর ব্রতটির তাৎপর্য স্পষ্টতর হয়ে উঠতে থাকে।
ভাদ্র ষষ্ঠীর দিন ভোর বেলাতেই মেয়েরা বেরিয়ে পড়ে একরকম শাকের গুচ্ছ সংগ্রহ করে আনতে। শাকগুলি উপড়ে কাপড়ে জড়িয়ে কুলোয় করে বাড়ি আনা হয়। তারপর, বাড়ি এনে সেগুলিকে ওই অবস্থায় চৌকির উপর স্থাপন করে চৌকির নিচে সিঁদুর দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। সন্ধ্যার দিকে এই কলা-বৌ মূর্তিটির পাশে এসে বসে একটি কুমারী মেয়ে। সধবারা পরস্পরকে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। তারপর, কলা-বৌকে নিয়ে বাড়ির ঘরে ঘরে ঘোরা হয়। সঙ্গে চলে কুমারী মেয়েটি। প্রত্যেকটি ঘরেই প্রশ্ন করা হয়, “গৌরী, গৌরী, কী এনেছো তুমি? কী দেখছো তুমি?” উত্তরে কুমারী মেয়েটি গৌরীর হয়ে জবাব দেয়, সে এসেছে প্রচুর ঐশ্বর্য, সে-দেখছে প্রচুর ঐশ্বর্য। কিন্তু শুধু ওই মুখের কথাটুকুই যথেষ্ট নয়। গৌরী যে এসেছিলেন, সত্যিই ঘরে ঘরে ঐশ্বর্য দিয়ে গিয়েছেন- এ-বিষয়ে একটা চাক্ষুষ প্রমাণও এঁকে দেওয়া হয়। দোরগোড়ায় আঁকা হয় গৌরীর পায়ের আলপনা। ঠিক আমাদের বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুজোর মতোই। এবং এই পায়ের আলপনার দিকে নজর করলে বোঝা যায় আমাদের লক্ষ্মীব্রতের মতোই এই গনেশচতুর্থী ব্রতের মূলেও রয়েছে প্রভূত শস্যের কামনা।
ভাদ্র সপ্তমীর দিন মেয়েরা চরকায় কাটা সূতো থেকে নিজের নিজের দৈর্ঘ্যরে ষোলোগুণ করে লম্বা মাপের সূতো নেয় এবং কলা-বৌ-এর পাশে সূতোগুলি রেখে দেয়। পরের দিন ওই সূতো তুলে তাতে ষোলোটি করে গিঁট দিয়ে, হলুদ রং-এ ছুপিয়ে, ভাঁজ করে মেয়েরা গলায় পরে। তাছাড়া, ষোলোটি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালে, ষোলোটি তিল এবং ষোলোটি ধান রাখে কলা-বৌ-এর সামনে। এই “ষোলো” সংখ্যাটির দিকে দৃষ্টি রাখা দরকার।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩২৮-৩০)

কেন ষোলো সংখ্যাটির দিকে দৃষ্টি রাখা দরকার? প্রাচীন সিন্ধু-সভ্যতার প্রত্ন-খননে আবিষ্কৃত নিদর্শন থেকে ১৬ ভিত্তিক ওজন পরিমাপের প্রত্ন-উপাদানের বিষয় স্মর্তব্য। তাছাড়া এই সংখ্যাটিকেই দেখতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের আর একটি কৃষি-কামনামূলক ব্রততেও। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ গ্রন্থে লিখেছেন-

পূর্ববঙ্গের তারাব্রতে একটি ছড়ায় আমরা পাই :
‘ষোল ষোল বর্তির হাতে ষোল সরা দিয়া,
মোরা যাই ইন্দ্রপুরীর নাটুয়া হইয়া।’

আর ইন্ডিয়ান এ্যান্টিকোয়ারির বর্ণনাদাতা শ্রীযুক্ত বি. এস. গুপ্ত বলছেন-
The sixteen knots and the sixteen folds of the skein turned into a necklace suggests the number of weeks a rice-crop takes to grow.

অর্থাৎ, মানব-অগ্রগতির কোনো এক পিছনে ফেলে-আসা-পর্যায়ে এই হলো মেয়েদের কাছে দিন গোনবার কৌশল। দেবীপ্রসাদ আরো বলছেন-
স্বভাবতই, গণেশচতুর্থী ব্রতের পঞ্চম দিনটিতে মেয়েরা ওই যে হলুদ-ছোপানো সূতোর হার গলায় পরলো সে-হার তারা খুলবে ফসলের সময় এলে–ষোলো সপ্তাহ পরে। আর তারা এই হারটির নাম দেয় মহালক্ষ্মী– গণেশচতুর্থী ব্রতের সঙ্গে বাংলা দেশের লক্ষ্মী ব্রতের মিল নানান দিক থেকে। শস্যের কামনায় অনুষ্ঠিত বাংলা দেশের আর একটি ব্রতের…নাম শসপাতার ব্রত। এবং সেই…অনুষ্ঠানের একটি অঙ্গ হলো নাচ- মেয়েদের নাচ। অবনীন্দ্রনাথের বর্ণনায়, “সমস্ত রাত দুই দলের নাচগান ছড়াকাটাকাটির উপরে চাঁদের আলো, তারার ঝিকিমিকি।” গণেশচতুর্থী ব্রতের বেলাতেও এই নাচ,– মেয়েদের নাচ,– বাদ যায় না। ইন্ডিয়ান এ্যান্টিকোয়ারির বর্ণনাদাতা বলছেন, ভাদ্র সপ্তমীর দিনটিতে মেয়েরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘোরে, তারপর পাড়ার মেয়েরা সকলে মিলে রাতভোর নাচ আর গান করে।
এই নাচগানকে আধুনিক অর্থে অবসর-বিনোদন মনে করলে একেবারেই ভুল করা হবে। সমাজ-বিকাশের পুরোনো পর্যায়ে নাচ-গান খাদ্য-আহরণ বা খাদ্য-উৎপাদন-মূলক কৌশলেরই অঙ্গ। দক্ষিণ আফ্রিকায় দেখা যায় শুম্বা মেয়েরা তাদের নাচ শেষ হবার আগে এমন কি কোদালগুলো স্পর্শ পর্যন্ত করবে না। মিসেস ব্রায়ন স্কট বলছেন, উত্তর বোর্নিওতে ডাইকদের মধ্যে কৃষিকাজকে একঘেঁয়ে একটানা শ্রমের ব্যাপার বলে মনে করলে ভুল করা হবে, কেননা তার ফাঁকে ফাঁকে নানান উৎসবের অবকাশ থাকে। আমেরিকার চেইন্নে-ইন্ডিয়ানদের বেলাতেও দেখা যায় কৃষিকাজের একটি অনিবার্য অঙ্গ হলো মেয়েদের ফসল-নাচ : তরুণী ও যুবতীর দল গোল হয়ে নাচ শুরু করে, পুরুষেরা ধরে গান- যে-মেয়েটি নাচের প্রধান অংশ গ্রহণ করে তার হাতের লাঠির ডগায় শস্যের গুচ্ছ বা বাঞ্ছিত ফসল বাঁধা থাকে।…
গণেশচতুর্থী ব্রতের আলোচনায় ফিরে আসা যাক। ব্রত-অনুষ্ঠানের শেষে শাকের-উপর-কাপড়-জড়ানো গৌরীমূর্তিটিকে মেয়েরা নদীতে বিসর্জন দিয়ে আসে এবং আসবার সময় নদীর কিনারা থেকে পলিপড়া মাটি মুঠোয় করে নিয়ে আসে, ধানের গোলার উপর আর ক্ষেতের উপর ছিটিয়ে দেয়। ইন্ডিয়ান এ্যান্টিকোয়ারির বর্ণনাদাতা বলছেন, এবং ঠিকই বলছেন, এ-অনুষ্ঠানটির তাৎপর্য খুব সম্ভব এই যে, শুরুতে নদীর কিনারার ওই পলিপড়া জমিতেই শস্যের উদ্গম হতো এবং এইভাবে ওই উর্বর মাটি ছিটোবার পিছনে যে-জাদুবিশ্বাস তা হলো মাটির উর্বরতার স্পর্শে ফসলের প্রাচুর্য পাবার আশা।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৩১)

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, নৃতত্ত্ববিদদের মতে কৃষি-বিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়েই এই জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা মানুষের মনে সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। তাই-
রবার্ট ব্রিফল্ট দেখাচ্ছেন, অসভ্য মানুষদের মধ্যে সর্বত্রই দেখা যায় অন্যান্য কাজের তুলনায় কৃষিকাজকে কেন্দ্র করেই জাদুবিশ্বাস এবং জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠানের উপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। পিউবলো-ইন্ডিয়ানদের মধ্যে খৃস্টান পাদ্রীরা নানাভাবে খৃস্টধর্ম প্রচারের চেষ্টা করেও এই অসভ্য মানুষগুলির মূল বিশ্বাস একটুও টলাতে পারেনি; অথচ এ-বিশ্বাস চুরমার হয়ে যেতে লাগলো যখন ইয়োরোপীয়রা সে-দেশে গিয়ে চাষবাস শুরু করলো। ইয়োরোপীয়দের কৃষিকাজ দেখে ওদের বিশ্বাস এ-ভাবে চুরমার হয়ে যেতে লাগলো কেন? কেননা, ওরা দেখলো কোনো রকম জাদু-অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর না করেই ইয়োরোপীয়রা ফসল ফলাতে পারছে এবং সে-ফসল গুণ বা পরিমাণ কোনো দিক থেকেই নিকৃষ্ট নয়। তাই খৃস্টান পাদ্রীরা হাজার বক্তৃতা দিয়েও তাদের মনের যে-বিশ্বাস টলাতে পারেনি ইয়োরোপীয়দের কৃষিকাজ-পরিদর্শন সে-বিশ্বাসকে উৎপাটিত করতে পারলো। পিউবলো-ইন্ডিয়ানদের এই কাহিনীটি থেকেই অনুমান করা যায়, পিছিয়ে-পড়ে-থাকা মানুষদের মনে,–এবং অতএব এগিয়ে-আসা মানুষদের পিছনে-ফেলে-আসা পর্যায়েও,– কৃষিকাজ কতো গভীরভাবে জাদুবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত এবং জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। অবশ্যই ব্রিফল্ট শুধুমাত্র এই দৃষ্টান্তটির উপরই নির্ভর করেননি। আরো বহু তথ্য সংগ্রহ করে দেখাচ্ছেন, পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের মানুষদের কাছে জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে কৃষিকাজ একান্তই অসম্ভব।’- (দেবীপ্রসাদ/ লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৪৩)

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি অসম্ভব কেন? এর বাস্তব কারণ ঠিক কী? কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা এমন ঐকান্তিক কেন? এ প্রেক্ষিতে বাংলার ব্রত সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি বলেছেন-

‘গঙ্গা শুকুশুকু আকাশে ছাই!’–সেই সময় বর্ষার জলধারা কল্পনা করে বসুধারা ব্রতের অনুষ্ঠান। এই যে জৈষ্ঠ্যের সারা মাস আষাঢ়ের ছবি মনে জাগিয়ে মানুষ প্রতীক্ষা করছে, এটা বড় কম অবসর নয় আবেগ ঘনীভূত হয়ে নানা শিল্প-ক্রিয়ায় প্রকাশ হবার জন্য।…এমনি প্রায় প্রত্যেক ব্রতেই দেখি, কামনা অনেকদিন পর্যন্ত–কোথাও একমাস, কোথাও দুমাস–অতৃপ্ত থাকছে চরিতার্থতার পূর্বে। শস্য ফলবার আগেই শস্য উদ্গমের ব্রত আরম্ভ হল এবং শস্যের প্রকৃত উদ্গমের ও কামনার মাঝের দিনগুলো মনের আবেগে নানা কল্পনায় নানা ক্রিয়ায় ভরে উঠে নাট্য, নৃত্য, আলেখ্য, এমনি-সব নানা শিল্পের জন্ম দিতে লাগল।’ (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বাংলার ব্রত)


অবনীন্দ্রনাথের কথাগুলি যে আংশিক ঠিক এবং আংশিক ঠিক নয় তা দেখাতে গিয়ে দেবীপ্রসাদ বলছেন-
কথাগুলি কতোটুকু পর্যন্ত ঠিক? কামনা এবং কামনা-সফল-হওয়ার মাঝখানের যে-দীর্ঘ ব্যবধান তাকেই মনের ঘনীভূত আবেগ দিয়ে,–কামনা সফল হওয়ার ছবি দিয়ে,–ভরিয়ে তোলাই হলো ব্রতের উদ্দেশ্য। নৃত্য, নাট্য, আলেখ্য–এমনি সব নানান উপাযের উপর নির্ভর করেই মনের ওই ঘনীভূত আবেগকে বাঁচিয়ে রাখবার আয়োজন। অবনীন্দ্রনাথের কথাগুলি ঠিক এবং এই দিক থেকেই ঠিক।
কিন্তু ঠিক নয়ও। ঠিক নয় এই কারণে যে, অর্ধ-অসহায় পর্যায়ের ওই মানুষগুলির কাছে কামনা আর কামনা-সফল-হওয়ার মাঝখানের ওই দীর্ঘ ব্যবধানটি এক চূড়ান্ত পরীক্ষার মতো। আর তাই, এই সময়টি জুড়ে নৃত্য, নাট্য, আলেখ্য এমনি সব নানান শিল্পের সাহায্যে মনের আবেগটুকুকে বাঁচিয়ে রাখবার যে-চেষ্টা তার মূলে রয়েছে জীবন-সংগ্রামের নির্মম চাহিদা, অবসর-বিনোদন নয়–এবং সেই কারণেই অবনীন্দ্রনাথ যখন বলছেন ওই ঘনীভূত আবেগের আসল উপাদান হলো অবসর, তখন তাঁর কথা স্বীকারযোগ্য হতে পারে না।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৪৪)

তবে ব্রতের আদি-তাৎপর্য হিসেবে জীবনসংগ্রামের যে-পটভূমিতে ব্রতের জন্ম তার সঙ্গে জীবনসংগ্রমের আধুনিক পটভূমির যে অনেক তফাৎ তা কিন্তু অবনীন্দ্রনাথের নিজের রচনাতেই স্বীকৃত হয়েছে। যেমন-

‘অনাবৃষ্টির আশঙ্কা আমাদের যদিই বা এখন কোনোদিন চঞ্চল করে তবে হয়তো ‘হরি হে রক্ষা করো’ বলি মাত্র; কিন্তু ঋতুবিপর্যয়ের মানে যাদের কাছে ছিলো প্রাণ-সংশয়, সেই তখনকার মানুষেরা কোনো অনির্দিষ্ট দেবতাকে প্রার্থনা কেবল মুখে জানিয়ে তৃপ্ত হতে বা নিশ্চিত হতে পারত না; সে ‘বৃষ্টি দাও’ বলে ক্ষান্ত হচ্ছে না; সে বৃষ্টি সৃষ্টি করতে, ফসল ফলিয়ে দেখতে চলেছে।…এখনকার মানুষ এ-রকম বিশ্বাস করে না, ব্রতও করে না।
ব্রত হলো মনষ্কামনার স্বরূপটি। আলপনায় তার প্রতিচ্ছবি, গীতে বা ছড়ায় তার প্রতিধ্বনি; এবং প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার নাট্যে নৃত্যে; এক কথায়, ব্রতগুলি মানুষের গীত কামনা, চিত্রিত বা গঠিত কামনা, সচল জীবন্ত কামনা।…
খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলি ঠিক কোনো দেবতার পুজো নয়; এর মধ্যে ধর্মাচরণ কতক, কতক উৎসব; কতক চিত্রকলা নাট্যকলা গীতকলা ইত্যাদিতে মিলে একটুখানি কামনার প্রতিচ্ছবি, কামনার প্রতিধ্বনি, কামনার প্রতিক্রিয়া। মানুষের ইচ্ছাকে হাতের লেখায় গলার সুরে এবং নাট্য নৃত্য এমনি নানা চেষ্টায় প্রত্যক্ষ করে তুলে ধর্মাচরণ করছে, এই হল ব্রতের নিখুঁত চেহারা। অন্তত এই প্রণালীতে সমস্ত প্রাচীন জাতিই ব্রত করছে দেখতে পাই।…
আমাদের একটা ভুল ধারণা ব্রত সম্বন্ধে আছে। আমরা মনে করি যে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ধর্ম ও নীতি শেখাতে মেয়েদের জন্যে আধুনিক কিন্ডারগার্টেন প্রণালীর মতো ব্রত-অনুষ্ঠানগুলি আবিষ্কার করে গেছেন। শাস্ত্রীয় ব্রতগুলি কতকটা তাই বটে, কিন্তু আসল মেয়েলি ব্রত মোটেই তা নয়। এগুলি আমাদের পূর্বপুরুষেরও পূর্বেকার পুরুষদের–তখনকার, যখন শাস্ত্র হয়নি, হিন্দুধর্ম বলে একটা ধর্মও ছিল না এবং যখন ছিল লোকেদের মধ্যে কতকগুলি অনুষ্ঠান, যেগুলির নাম ব্রত।’ (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বাংলার ব্রত)


অর্থাৎ বর্তমানে প্রকৃত ব্রত নামে যেগুলির প্রচলন রয়েছে তা আসলে সেই সুপ্রাচীন কৃষিকেন্দ্রিক জীবন-সংগ্রামের অঙ্গ জাদুবিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য প্রভাব। কামনা আর কামনা-সফল-হওয়ার মাঝখানে যে অনিশ্চয়তার ব্যবধান তা সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে কৃষি-বিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়েই। তাই এই পর্যায়েই কামনা-সফল-হওয়ার কল্পনা দিয়ে ব্যবধানটিকে ভরাট করে তোলবার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। নকলের সাহায্যে কামনা-সফল-হওয়ার কল্পনাকে ফুটিয়ে তোলাই হলো জাদুবিশ্বাসের প্রাণবস্তু।

.
এভাবে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ধারায় কিছু কিছু অব্যাখ্যাত রহস্যময় উপাদান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সিন্ধু-সভ্যতা তথা সিন্ধু-ধর্মের ওই মাতৃপ্রাধান্য আবিষ্কার যে কী অভাবনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেমন-
সিন্ধু-সভ্যতা আবিষ্কৃত হবার আগে সাধারণভাবে ভারতবর্ষীয় শাক্ত-ধর্মের আলোচনা প্রসঙ্গে চন্দ অনুমান করেন, কোনো-এক মাতৃপ্রধান সমাজ-বাস্তবেই এ-জাতীয় মাতৃপ্রধান ধর্ম-বিশ্বাসের উদ্ভব ও বিকাশ হওয়া সম্ভব। নজির হিসেবে তিনি প্রাচীন যুগের অন্যান্য সমজাতীয় ধর্ম-বিশ্বাসের উল্লেখ করেছেন : এশিয়া মাইনর, সিরিয়া এবং মিশরেও মাতৃপ্রধান সমাজেই মাতৃপ্রধান ধর্ম-বিশ্বাসের আবির্ভাব ঘটেছিল।
সিন্ধু-সভ্যতা আবিষ্কারের পর স্পষ্টই বোঝা গেল, এ-দেশে শাক্ত-ধর্মের ইতিহাস কত প্রাচীন। স্বভাবতই, চন্দর উপরোক্ত অনুমান অনুসরণ করে মার্শাল মন্তব্য করলেন, ওই সুপ্রাচীন যুগের মাতৃপ্রধান ধর্ম-বিশ্বাসের পটভূমি হিসেবেও মাতৃপ্রধান সমাজ-ব্যবস্থার কথাই অনুমান করা স্বাভাবিক।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৩)

যদিও সিন্ধু-যুগের সমাজ-ব্যবস্থায় মাতৃপ্রাধান্যের পরিচয় সত্যিই কতোটুকু বজায় ছিলো সে বিষয়ে কোনো সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আজও সম্ভব নয়, কিন্তু সমাজ-বিকাশ সংক্রান্ত সাধারণভাবে জ্ঞাত নৃতাত্ত্বিক নিয়মের দিক থেকে সহজেই অনুমান হয়, হরপ্পা-সংস্কৃতিতে– বিশেষত ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে– মাতৃপ্রাধান্যের সুস্পষ্ট স্মারক টিকে থাকাই স্বাভাবিক। এ-প্রেক্ষিতে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক তথ্য হলো, আধুনিক বিদ্বানদের দ্বারা সিন্ধু-অধিবাসীদের বংশধর হিসেবে মহাভারত-বর্ণিত বাহীকদেরকে সনাক্ত করা। কেননা, মহাভারতে বাহীকদের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে এই মানুষগুলি সম্বন্ধে তীব্র ঘৃণার মনোভাব ফুটে উঠলেও এই বর্ণনা থেকে অবশ্যই অনুমান হয় বাহীকদের মধ্যে মাতৃ-প্রধান ব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে কালিপ্রসন্ন সিংহের (মহাভারত-১১১৫-৭) যে দীর্ঘ তর্জমা উদ্ধৃত করেছেন তার অংশবিশেষ এরকম-

কর্ণ বলছেন-
‘হে মদ্ররাজ! আমি ধৃতরাষ্ট্র সমীপে ব্রাহ্মণ মুখে যাহা শ্রবণ করিয়াছি, তুমি অবহিত হইয়া তাহা শ্রবণ কর। ব্রাহ্মণগণ ধৃতরাষ্ট্রমন্দিরে বিবিধ বিচিত্র দেশ ও পূর্বতন ভূপতিগণের বৃত্তান্ত কহিতেন। তথায় একদা এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বাহীক ও মদ্রদেশোদ্ভব ব্যক্তিদিগকে নিন্দা করত কহিতে লাগিলেন, হে রাজন! যাহারা হিমালয়, গঙ্গা, সরস্বতী, যমুনা ও কুরুক্ষেত্রের বহির্ভাগে এবং যাহারা সিন্ধুনদী ও তাহার পাঁচ শাখা হইতে দূর প্রদেশে অবস্থিত, সেই সমস্ত ধর্মবর্জিত অশুচি বাহীকগণকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য।… আমি নিতান্ত নিগূঢ় কার্যানুরোধ বশতঃ বাহীকগণের সহিত বাস করিয়াছিলাম। তন্নিবন্ধন তাহাদের ব্যবহার বিদিত হইয়াছি।… তথায় আচারভ্রষ্ট ব্যক্তিরা গৌড়ীসুরা পান এবং লশুনের সহিত ভৃষ্ট যব, অপুপ ও গোমাংস ভোজন করিয়া থাকে। কামিনীগণ মত্ত, বিবস্ত্র ও মাল্যচন্দন রহিত হইয়া নগরের গৃহপ্রাচীর সমীপে নৃত্য এবং গর্দভ ও উষ্ট্রের ন্যায় চিৎকার করিয়া অশ্লীল সঙ্গীত করিয়া থাকে। তাহারা স্বপরপুরুষ বিবেক-বিহীন হইয়া স্বেচ্ছাক্রমে বিহার করত উচ্চৈস্বরে পুরুষগণের প্রতি আহ্লাদজনক বাক্য প্রয়োগ করে।… ’
‘হে মদ্ররাজ, আর এক ব্রাহ্মণ কুরুসভায় যাহা কহিয়াছিলেন, তাহাও শ্রবণ কর। হিমাচলের বহির্ভাগে, যে স্থানে পীলু বন বিদ্যমান আছে এবং সিন্ধু ও তাহার শাখা শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তা নদী প্রবাহিত হইতেছে, সেই অরট্টদেশ নিতান্ত ধর্মহীন; তথায় গমন করা অবিধেয়। ব্রাহ্মণ, দেবতা ও পিতৃলোক ধর্মভ্রষ্ট সংস্কারহীন অরট্টদেশীয় বাহীকদিগের পূজা গ্রহণ করেন না…’
‘হে শল্য! আমি পুনরায় তোমাকে এক উপাখ্যান কহিতেছি… কিছুদিন হইল, এক ব্রাহ্মণ আমাদের ভবনে অতিথি হইয়াছিলেন…(তিনি কহিলেন)… গান্ধার মদ্রক ও বাহীকেরা সকলেই কামাচারী, লঘুচেতা ও সংকীর্ণ।… হে মদ্রাধিপ! আমি আর একজনের নিকট বাহীকদিগের যে কুৎসিত কথা শ্রবণ করিয়াছিলাম, তাহাও কহিতেছি…। পূর্বে অরট্টদেশীয় দস্যুরা এক পতিব্রতা সীমন্তিনীকে অপহরণ পূর্বক তাঁহার সতীত্ব ভঙ্গ করিলে তিনি শাপ প্রদান করিয়াছিলেন যে, হে নরাধমগণ! তোমরা অধর্মাচরণপূর্বক আমার সতীত্ব ভঙ্গ করিলে; অতএব তোমাদিগের কুলকামিনীগণ সকলেই ব্যাভিচারিণী হইবে। আর তোমরা কখনই এই ঘোরতর শাপ হইতে বিমুক্ত হইবে না। হে শল্য! এই নিমিত্তই অরট্টদিগের পুত্রেরা ধনাধিকারী না হইয়া ভাগিনেয়গণই ধনাধিকারী হইয়া থাকে।…’


মহাভারতের সংবাদদাতাদের বর্ণনায় বাহীকদের প্রতি যে তীব্র ঘৃণার ভাব রয়েছে, সেই ঘৃণার প্রভাবে তাঁরা কিছুকিছু কাল্পনিক কথা এই বর্ণনার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন হয়তো। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে বাহীকদের সমাজ-জীবন সংক্রান্ত কিছু যে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে দেখতে পাওয়া যাবে যে এ-বর্ণনা প্রাগ্-রাষ্ট্র ট্রাইব-সমাজেরই ইঙ্গিত দেয়। ফলে বাহীকদের মধ্যে যৌন-নিষ্ঠার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সভ্য-সমাজের কাছে পরিবার-জীবন বা দাম্পত্য-ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায় বাহীকদের মধ্যে মহাভারতের সংবাদদাতারা তা দেখতে পাননি। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে-
সভ্য-সমাজের এই দাম্পত্য-জীবন চিরন্তন নয় : প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক মানবজাতিই সভ্যতার দিকে এগোবার পথে যে-পর্যায়গুলি উত্তীর্ণ হয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে সেগুলির মধ্যে আধুনিক বিবাহ-সম্পর্ক অনুপস্থিত।… মর্গানের পরিভাষা অনুসারে মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে বন্য-দশার নিম্ন স্তর থেকে; তারপর বন্য-দশার মধ্য ও উচ্চ স্তর পেরিয়ে মানুষ বর্বর-দশায় উঠে এলো এবং এই বর্বর-দশারও নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ এই তিনটি স্তর পেরোলে পরই মানুষের পক্ষে সভ্যতার আওতায় পৌঁছানো সম্ভব। এবং মর্গান দেখালেন, বন্য-দশার আগাগোড়া এবং বর্বর-দশার নিম্ন ও মধ্য স্তর পর্যন্ত কোথাও আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের বা এক বিবাহের পরিচয় নেই।’- (দেবীপ্রসাদ/ লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-২২৫)

তবে আমাদের আলোচ্য বিষয় হিসেবে এ-ক্ষেত্রে মহাভারতের ওই বর্ণনায় বাহীকদের মধ্যে প্রচলিত উত্তরাধিকার-সূত্রের যে ইঙ্গিতটি পাওয়া গেলো, তাদের মধ্যে পুত্রেরা ধনাধিকারী না হয়ে ভাগিনেয়রাই ধনাধিকারী হয়। এখানেই এই উত্তরাধিকার-সূত্রে মাতৃ-প্রধান সমাজের চিহ্ন থেকে গিয়েছে। আজো আমাদের দেশে মাতৃ-প্রধান অঞ্চলগুলিতে এ-জাতীয় উত্তরাধিকার-সূত্র টিকে থাকতে দেখা যায়। যেমন, খাসিয়া বা অনুরূপ আদিবাসী জনগোষ্ঠির মধ্যে আজও মাতৃ-প্রধান সমাজ-ব্যবস্থা ও দেবী-প্রধান দেবলোকের মধ্যে সাক্ষাৎ সম্পর্ক টিকে আছে। এক্ষেত্রে-
পূর্ণাঙ্গ মাতৃ-প্রধান সমাজে উত্তরাধিকার-সূত্র ছিলো মায়ের দিক থেকে মেয়ের দিকে। এই ব্যবস্থারই কিছুটা রদবদল হয়ে মামার দিক থেকে ভাগনের দিকে উত্তরাধিকারসূত্র প্রবর্তিত হলো। তারপর, শেষপর্যন্ত মাতৃ-প্রধান সমাজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যাবার পর, যখন পূর্ণ পিতৃ-প্রধান সমাজ দেখা দিলো তখন উত্তরাধিকারসূত্র হলো পিতা থেকে পুত্রের দিকে। মাতুল থেকে ভাগিনেয়র দিকে উত্তরাধিকারসূত্র যতোদিন বর্তমান ততোদিন পর্যন্ত সমাজ-সংগঠনে মাতৃ-প্রাধান্যের লক্ষণ রয়েছে বলে অনুমান করা যায়।’- (দেবীপ্রসাদ/ লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-২২৭)

এ-পর্যায়ে যে মৌলিক প্রশ্নটি চলে আসে, প্রাচীন মাতৃপ্রধান সমাজ-ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত্তি কী? উত্তরে বলা যায়-
প্রাথমিক পর্যায়ের কৃষি-উৎপাদন। কেননা কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার, আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজও তাই মাতৃপ্রধান। এবং প্রাচীনকালে ইউফ্রেটিস, নীল ও সিন্ধুনদের কিনারায় মানুষ যে প্রথম সভ্যতার ইমারত গড়ে তুলতে পেরেছিল তার চূড়ান্ত কারণ ওই কৃষি-আবিষ্কার। অতএব এই প্রাচীন সভ্যতাগুলির নিচে মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচয় চাপা পড়ে থাকাই স্বাভাবিক, তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে, নগর-সভ্যতাগুলির সুউন্নত পর্যায়েও সমাজ-ব্যবস্থা মাতৃপ্রধান ছিল। কেননা আদিম কৃষি-ভিত্তিক মাতৃপ্রধান সমাজ ব্যবস্থার পরমায়ু খুব দীর্ঘ নয়; প্রত্নতত্ত্বের সাক্ষ্য অনুসারে অনুমিত হয়েছে, উন্নততর কৃষিকাজের পর্যায়ে– গৃহপালিত পশুর সাহায্যে লাঙল দেবার ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়া থেকে– কৃষিকাজে পুরুষের ভূমিকাই প্রধান হয়েছে এবং তারই ফলে ক্রমশ সমাজ-ব্যবস্থাও পুরুষ-প্রধান হয়ে উঠেছে। তাই প্রাচীন সভ্যতাগুলির যখন পূর্ণ বিকাশ তখনও সমাজ-ব্যবস্থায় মাতৃ-প্রাধান্যের পরিচয় অক্ষুণ্ন ছিল। কিন্তু সমাজ-ব্যবস্থায় মাতৃ-প্রাধান্য ক্ষুণ্ন ও পরিবর্তিত হলেও বিশেষত ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে তার সুস্পষ্ট স্মারক দীর্ঘদিন পর্যন্ত বর্তমান থাকাই স্বাভাবিক। অতএব হরপ্পা-সংস্কৃতির বাস্তব সমাজ-ব্যবস্থার মাতৃপ্রাধান্যের পরিচয় কতখানি অক্ষুণ্ন ছিল এ-বিষয়ে সুনিশ্চিত অনুমানের সুযোগ না থাকলেও এ-সিদ্ধান্তে বাধা নেই যে হরপ্পা-সংস্কৃতিতে– বিশেষ ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে– এই মাতৃপ্রাধান্যের সুস্পষ্ট স্মারক টিকে থেকেছিল। বস্তুত এই দেবী-প্রধান বা মাতৃপ্রধান ধর্মবিশ্বাসই তার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
অপরপক্ষে, প্রাচীন আর্য-ধর্মে মাতৃপ্রাধান্যের পরিচয় নেই। ঋগ্বেদের দেবলোক পুরুষ-প্রধান। কেননা, প্রাচীন বৈদিক সমাজ কৃষিভিত্তিক ছিল না, তার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি পশুপালন। পশুপালন পুরুষের কাজ, পশুপালনমূলক সমাজ পিতৃ-প্রধান বা পুরুষ-প্রধান। এই কারণেই বৈদিক সমাজও একান্তই পুরুষ-প্রধান ছিল এবং এই সমাজই বৈদিক দেবলোকে প্রতিবিম্বিত : স্বভাবতই বৈদিক দেবলোকও পুরুষ-প্রধান- দেবীরা সংখ্যায় নগন্য, গৌরবে গৌণ। অতএব বৈদিক ও প্রাক-বৈদিক– আর্য ও আর্য-পূর্ব– ধর্ম-বিশ্বাসের এই মৌলিক প্রভেদটির ব্যাখ্যা শুধুমাত্র ধর্ম-বিশ্বাসের স্তরে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ-প্রভেদের চূড়ান্ত কারণ অর্থনৈতিক।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৪)

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব :  প্রকৃতি উপাসনা] [*] [পরের পর্ব : লিঙ্গ-উপাসনা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 176,747 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: