h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৭ : প্রকৃতি উপাসনা|

Posted on: 03/07/2015


10301598_822840851071012_5546513123171155425_n

| প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৭ : প্রকৃতি উপাসনা |
রণদীপম বসু

প্রকৃতি-উপাসনা :

বেদ-পূর্ব সিন্ধু-ধর্ম মাতৃপ্রধান এবং বৈদিক ধর্ম যে পুরুষ-প্রধান, এ বিষয়ে বিদ্বান-পণ্ডিতদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির আলোচনায় অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পরবর্তীকালের ভারতবর্ষীয় ধর্মে অন্তত সাধারণ জনগোষ্ঠির মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে ঋগ্বেদের প্রাচীন পুরুষ-দেবতাদের বিশেষ কোন পরিচয়ই পাওয়া যায় না। অন্যদিকে উত্তরকালের এই ধর্মবিশ্বাসের প্রধানতম উপাদান হলো মাতৃ-পূজা- তা কি ওই বেদ-পূর্ব সিন্ধু-ধর্মেরই রেশ? এ ক্ষেত্রে সিন্ধু-যুগে এই ধর্মবিশ্বাস প্রচলিত ছিলো বলে এর ব্যাখ্যা-সন্ধানে যেমন সিন্ধু-প্রত্নতত্ত্ব-লব্ধ স্মারকগুলির উপর নির্ভর করতে হবে, তেমনি পরবর্তীকালেও এই ধর্মবিশ্বাস বহুলাংশে অক্ষুণ্ন থেকেছে এই অনুমান-জন্য পরবর্তীকালের লিখিত সাহিত্য হয়তো ওই স্মারকগুলির উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করতে পারে। অর্থাৎ ওই শাক্ত-ধর্ম বা মাতৃ-উপাসনার ব্যাখ্যা সন্ধানে একাধারে প্রত্নতত্ত্বমূলক ও সাহিত্যমূলক দ্বিবিধ তথ্যের উপর নির্ভর করা যেতে পারে।


দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ কয়েকটি চিত্তাকর্ষক সাহিত্যমূলক সাক্ষ্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেমন, ‘মার্কণ্ডেয়-পুরাণে’র দেবী-মাহাত্ম্যে স্বয়ং দেবী ঘোষণা করছেন-

‘ততঃ অহম্ অখিলং লোকম্ আত্মদেহ-সমুদ্ভবৈঃ।
ভবিষ্যামি সুরাঃ শাকৈঃ অবৃষ্টৈঃ প্রাণধারকৈঃ।।
শাকম্ভরী ইতি বিখ্যাতিং তদা যাস্যামি অহং ভুবি।…’ (মার্কণ্ডেয়-পুরাণ-৯২/৪২-৩)
অর্থাৎ : অনন্তর বর্ষাকালে আত্মদেহ-সমুদ্ভূত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সমগ্র জগতের পুষ্টি-সরবরাহ করবো; তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবো।


এখানে শাকম্ভরী নামের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, শাকাদি উদ্ভিদ দেবীগর্ভপ্রসূত। এ কারণেই দেবী শাককে আত্মদেহ-সমুদ্ভূত বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ দেবী বলতে এখানে বসুমাতা, পৃথিবী। যে-সুপ্রাচীন বিশ্বাস থেকে এই দেশী-নামের উদ্ভব হয়েছিলো তার একটি মূর্ত নিদর্শন হরপ্পা ধ্বংসস্তুপের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। হরপ্পায় এমন একটি অদ্ভূত সীল আবিষ্কৃত হয়েছে- তার এক-পিঠে উত্তানপদ দেবীমূর্তি, এই দেবীর গর্ভ থেকেই উদ্ভিদের উদ্ভব অঙ্কিত হয়েছে। অতএব অনুমান হয়, মার্কণ্ডেয়-পুরাণের এই শাকম্ভরী দেবী পুরাণের চেয়ে অনেক পুরনো; প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু-যুগেও তাঁর পরিচয় অস্পষ্ট নয়।
সিন্ধু-সভ্যতায় দেবী-রহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সম্পর্ক ইঙ্গিত যে শুধুমাত্র এই সীলটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ তা নয়। অন্যান্য অনেক সীলেও দেবীকে উদ্ভিদ-পরিবৃতা বা উদ্ভিদ-অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে অঙ্কিত করা হয়েছে। এ-জাতীয় নজির থেকেই সিন্ধু-সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন পরিচালনাকারী বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শাল অনুমান করেছিলেন, সিন্ধু-সভ্যতায় বৃক্ষ-উপাসনাও প্রচলিত ছিলো। এবং এ-বিষয়ে তিনি আরো একটি যুক্তি দিয়েছেন যে- উত্তরকালে ভারতবর্ষীয় ধর্ম-বিশ্বাসে বৃক্ষের অধিষ্ঠাত্রী বলতে সর্বত্রই দেবীর কল্পনা।

এখানে উল্লেখ্য, ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের একটি সূক্তে (ঋগ্বেদ-১০/৭২) দেবী অদিতির বর্ণনাতেও এই কৌতুহলোদ্দীপক ‘উত্তানপদ’ শব্দ ও ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন-

‘দেবানাং যুগে প্রথমেহসতঃ সদজায়ত।
তদাশা অন্বজাযন্ত তদুত্তানপদস্পরি’।। (ঋক-১০/৭২/৩)
‘ভূর্জজ্ঞ উত্তানপদো ভুব আশা অজায়ন্ত।
অদিতের্দক্ষো অজায়ত দক্ষাদ্বদিতিঃ পরি’।। (ঋক-১০/৭২/৪)
অর্থাৎ :
দেবোৎপত্তির পূর্বতন কালে অবিদ্যমান হতে বিদ্যমান বস্তু উৎপন্ন হলো। পরে উত্তানপদ (উত্তানপদ বলতে বৃক্ষ : সায়ণ) হতে দিক সকল জন্ম গ্রহণ করলো (ঋক-১০/৭২/৩)।  উত্তানপদ হতে পৃথিবী জন্মিল, পৃথিবী হতে দিক সকল জন্মিল, অদিতি হতে দক্ষ জন্মিলেন, দক্ষ হতে আবার অদিতি জন্মিলেন (ঋক-১০/৭২/৪)।


আারো বেশ কিছু সূক্তের মতোই ঋগ্বেদের এই সূক্তটির রচয়িতা হলেন বৃহস্পতি ঋষি। সন্দেহ নেই, চার্বাক সম্পর্কিত আলোচনায় বৃহস্পতি নামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যদিও তা ভিন্ন প্রেক্ষিতের আলোচনা। তবে এখানে এই ঋকসমূহে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বেদ-পূর্ব বা তারচেয়েও অন্তত হাজার বছরের পুরনো সিন্ধু-ধর্মীয় কৃষিভিত্তিক উত্তানপদ-ধারণা ঋগ্বেদেও বহমান থাকা। এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে স্থায়ী হয়ে যাওয়া আর্য-সভ্যতায় পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিবেচনায় ধীরে ধীরে নিজেদের জীবন-ব্যবস্থাকে অবশ্যম্ভাবীরূপে কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থার সাথে খাপ-খাইয়ে নেয়া। এবং অবশ্যই তাদের পুরুষ-প্রাধান্য বজায় রেখে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জন মার্শাল যে সিন্ধু-সভ্যতার অন্যতম উপাদান হিসেবে বৃক্ষ-উপাসনার কথা উল্লেখ করেছেন, এই তথাকথিত বৃক্ষ-উপাসনাকে কি সিন্ধু-ধর্মের কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে, না কি একে শক্তি-সাধনার কোন অভিব্যক্তি বা লক্ষণ মনে করা যুক্তিসঙ্গত? এক্ষেত্রে পরবর্তী কালের ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসকে যদি এ-প্রশ্নের উপর আলোকপাত করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, পরবর্তী কালের শক্তি-সাধনার বিশেষ অঙ্গই হলো উদ্ভিদ-অধিষ্ঠাত্রী বা শস্যদেবীর উপাসনা। কারণ-
এ-বিষয়ে আধনিক বিদ্বানেরা ইতিপূর্বেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন : যাঁর নাম শাকম্ভরী তাঁরই নাম দুর্গা। তাই ফসলের সময়টিতেই দুর্গোৎসবের আয়োজন। কিন্তু দুর্গা-মূর্তি বলতে তো দশভূজা মহিষমর্দিনীর রূপ। কিন্তু শ্রীযুক্ত চন্দ দেখাচ্ছেন, এ-রূপ তুলনায় অনেক অর্বাচীন : প্রচলিত পৌরাণিক উপাখ্যান অনুসারে রাবণ-বধের বরপ্রার্থনায় রামচন্দ্র ওই মহিষ-মর্দিনীর উপাসনা করেছিলেন। কিন্তু বাল্মীকির মূল রামায়ণে এ-উপাখ্যান নেই; তার বদলে রামচন্দ্র সেখানে সূর্যের কাছেই বর-প্রার্থনা করছেন। অতএব এই মহিষ-মর্দিনী রূপটি অনেক পরবর্তীকালের; এবং পরবর্তী কালের বলেই (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে) “এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজার প্রতিমা গড়াইয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বৎসর পূর্বে ঠিক এমনভাবে প্রতিমা বাংলা কারিগর গড়িত না।… কারণ, আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময় যে-প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডিমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে-উৎসব করিয়া থাকি সেই উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণঘটের; দেবীকে আহ্বান করিতে হয় ‘যন্ত্রে’ ও ঘটে।” ঘটের উপর নবপত্রিকা স্থাপন করতে হয় এবং দুর্গাপূজার প্রধানতম অনুষ্ঠান এই নবপত্রিকাকে কেন্দ্র করেই। আবার, ওই নয়টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটিরই অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে এক-একটি দেবীর কল্পনা। তা হলে দুর্গাপূজার– অর্থাৎ, পরবর্তী ভারতবর্ষীয় ধর্মে মাতৃপূজা সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিব্যক্তিটির–ক্ষেত্রেও দেবীরহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সুস্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়। শ্রীযুক্ত চন্দ বলেছেন, এই কারণেই শাক্তরা প্রত্যুষে কুলবৃক্ষ বা কুলতরুকে প্রণাম করেন এবং আদি-পর্যায়ে শক্তি বা দুর্গা শস্যদেবী হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিলেন বলেই তাঁর নামান্তর অন্নদা বা অন্নপূর্ণা।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭০)

তার মানে, বৃক্ষ-উপাসনাকে সিন্ধু-ধর্মের কোন এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে বরং এ-কথা অনুমান করাই যুক্তিসঙ্গত হবে যে, সুপ্রাচীন কাল থেকে ওই তথাকথিত বৃক্ষ-উপাসনা শাক্ত-ধর্মেরই একটি প্রধানতম উপাদান ছিলো। এখন প্রশ্ন হলো, শক্তি-সাধন বা মাতৃ-উপাসনার সঙ্গে শস্য জগতের বা উদ্ভিদ-জগতের এ জাতীয় সম্পর্ক কেন? নৃতত্ত্ববিদেরা এ-প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন-
পৃথিবী বা প্রকৃতির ফলপ্রসূতামূলক কামনা থেকেই বসুমাতা বা আদ্যা-শক্তি বা জগদম্বা পরিকল্পনার উদ্ভব। অর্থাৎ, এই বসুমাতা-কল্পনার উৎসে আছে এক আদিম বিশ্বাস, সে-বিশ্বাস অনুসারে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা ও মানবীয় ফলপ্রসূতা সমগোত্রীয়। তাই শস্যদায়িনী প্রকৃতিও সন্তানদায়িনী মাতার অনুরূপ- প্রকৃতিও মাতৃরূপে পরিকল্পিত। অতএব প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও মানবীয় প্রজননের সংস্পর্শ বা অনুকরণের সঙ্গে সংযুক্ত। নৃতত্ত্ববিদদের পরিভাষায় এই আদিম বিশ্বাসের নাম ‘ফার্টিলিটি ম্যাজিক’– উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে দেশে দেশান্তরে যে-সব বহুবিধ আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত হয়েছে, নৃতত্ত্ববিদদের রচনায় তার বহুল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭১)

এখানে যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় তা হলো, উপরে উল্লিখিত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে ‘যন্ত্র’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে ‘দুর্গোৎসবের সময় যে-প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডীমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে-উৎসব করিয়া থাকি সেই উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণঘটের; দেবীকে আহ্বান করিতে হয় ‘যন্ত্রে’ ও ঘটে।’ কেননা ‘যন্ত্র’ শব্দটি তন্ত্র-সাধনার পক্ষে অবিচ্ছেদ্য একটি উপাদান। তন্ত্রে একজাতীয় চিত্রের ব্যবহার আছে, সেগুলিকে যন্ত্র বলে-
‘যন্ত্র সাধারণত দুই প্রকার- পূজাযন্ত্র ও ধারণ-যন্ত্র। পূজাযন্ত্রে যে দেবতার পূজা করিতে হইবে, সেই দেবতার যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া তাহাতে পূজা করিতে হয়। ঐরূপ যন্ত্রকে পূজাযন্ত্র বলা হয়।
যে যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া ধারণ করা হয় তাহার নাম ধারণ-যন্ত্র। এই ধারণ-যন্ত্র ভূর্জপত্রে অঙ্কিত করিয়া ধারণ করিতে হয়।…
তন্ত্রে লিখিত আছে, –যন্ত্রে দেবতার অধিষ্ঠান হইয়া থাকে, এইজন্য যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া দেবতার পূজা করিতে হয়। (বিশ্বকোষ-১৫/৪৫)

আর তন্ত্রমতে এই যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র। ‘কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রগুলি যে পূজা, দেবতা ইত্যাদি আধ্যাত্মিক বিষয়ের চেয়ে প্রাচীনতর,–অর্থাৎ, পূজা ও দেবতাদির বিষয় পরে কৃত্রিমভাবে যন্ত্রগুলির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে,–যন্ত্রগুলিকে ভালো করে পরীক্ষা করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমত, মোটের উপর একই চিত্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেবদেবীর সম্পর্ক বা ঐক্য পরিকল্পিত হয়েছে (বৃহৎতন্ত্রসারে বিভিন্ন যন্ত্রের চিত্র দ্রষ্টব্য)। তার থেকেই বোঝা যায়, উক্ত সম্পর্কাদির চেয়েও যন্ত্রগুলি প্রাচীনতর। দ্বিতীয়ত, বহু যন্ত্রের সঙ্গেই যন্ত্রসংযুক্ত দেবতাটির স্পষ্ট বিরোধ দেখা যায়। আধুনিক তান্ত্রিক গ্রন্থাদিতে কয়েকটি প্রসিদ্ধ যন্ত্রের নাম হলো, গণেশযন্ত্র, শ্রীরামযন্ত্র, নৃসিংহযন্ত্র, গোপালযন্ত্র, কৃষ্ণযন্ত্র, শিবযন্ত্র, মৃত্যুঞ্জয়যন্ত্র ইত্যাদি (বৃহৎতন্ত্রসার দ্রষ্টব্য)। উল্লেখিত দেবতাগুলি সকলেই পুরুষ। অথচ, যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪০২)

11223650_10206042737920371_2745392136956543986_n 11694033_10206042739480410_9193622057516275495_n 11701118_10206042738200378_2590062500464141214_n
তান্ত্রিক যন্ত্রগুলি যে নারী-জননাঙ্গের প্রতীকমাত্র, এ-বিষয়ে শ্রীচক্রপূজা প্রসঙ্গে স্যার ভান্ডারকরের বক্তব্য হলো-
It consists in the worship of picture of the female organ drawn in the centre of another consisting of a representation of nine such organs, the whole of which forms the `Sricakra’….The pictures are drawn on a`bhurja’ leaf or a piece of silken cloth or a gold leaf.‘-(বিশ্বকোষ-১৫/৫৪৫)

তার মানে, এভাবে নারী-জননাঙ্গের চিত্র অঙ্কন করবার পিছনে এক আদিম বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়; সেই বিশ্বাস হলো নারী-জননাঙ্গের উপরই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও নির্ভরশীল। এ-বিষয়ে তন্ত্র-সাধনার আভ্যন্তরীণ তথ্যটুকুও যাচাই করে নেয়া যায়। যেমন, আদিতে দুর্গা যে শস্য-জননী ছিলেন এবং দুর্গোৎসব যে শস্য-উৎসবই ছিলো- সে-বিষয়ে শ্রীযুক্ত চন্দের বক্তব্য থেকেই জানতে পেরেছি আমরা। প্রমাণ হিসেবে তিনি কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, দুর্গোৎসব হলো শারদোৎসব- ফসল পাকবার ঋতু তখন। দ্বিতীয়ত, শাকম্ভরী, অন্নপূর্ণা প্রভৃতি দুর্গার নাম। তৃতীয়ত, দুর্গাপূজায় নবপত্রিকার গুরুত্ব। শ্রীযুক্ত চন্দের এই প্রমাণগুলি অসামান্য মূল্যবান নিঃসন্দেহে। তার সাথে প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিটি স্মরণ করতে পারি-
এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজা দুর্গার প্রতিমা গড়িয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বর্ষ পূর্বে ঠিক এমনভাবে প্রতিমা বাংলার কারিকর গড়িত না। গোড়ায় যখন সিংহবাহিনীর মৃন্ময়ী মূর্তির পূজা এ দেশে প্রচলিত হয়, তখন কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী, কেহই ছিলেন না।…আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময়ে যে প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডীমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে উৎসব করিয়া থাকি, সে উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণ ঘটের, দেবীকে আহ্বান করিতে হয় যন্ত্রে ও ঘটে।’ (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাবলী-২/২৬৫)

তাহলে মূল কথা দাঁড়াচ্ছে, দুর্গাপূজার আদি-অকৃত্রিম রূপটিকে চিনতে হলে পুত্রকন্যাপরিবৃতা ওই দশভূজাকে বাদ দিয়ে যন্ত্র ও ঘটের উপরই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা প্রয়োজন। এর বর্ণনায় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোকায়ত দর্শন’ (পৃষ্ঠা-৪০৪-৯) এ বর্ণিত তথ্যমূলক দীর্ঘ বিবৃতির সহায়তা নিতে পারি-

11666034_10206042738440384_1454889825559678982_n
‘দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ ওই যন্ত্র ও ঘটের দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা যাক। যন্ত্রটির নাম সর্বতোভদ্রমণ্ডল। এটি তন্ত্রের একটি বিখ্যাত যন্ত্র :
এই চিত্রটি আঁকবার নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে (বৃহৎতন্ত্রসার: ৭৪-৫)-

ষটত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেৎ পদ্মং সুলক্ষণম্ ।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা।।
দ্বারশোতোপশোভাস্রাং শিষ্টাভ্যাং পরিকল্পয়েৎ।
শাস্ত্রোক্তবিধিনা মন্ত্রী ততঃ পদ্মং সমালিখেৎ।।
পদ্মক্ষেত্রস্য সংত্যজ্য দ্বাদশাংশং বিহঃ সুধীঃ।
তন্মধ্যং বিভজেদ্বৃত্তৈস্ত্রিভিঃ সমবিভাগতঃ।।
আদ্যং স্যাৎ কর্ণিকাস্থানং কেশরাণাং দ্বিতীয়কম্ ।
তৃতীয়ং তত্র পত্রাণাং মুক্তাংশেন দলাগ্রকম্ ।।
বাহ্যবৃত্তান্তরালস্য মানেন বিধিনা সুধীঃ।
নিধায় কেশরাগ্রেষু পরিতোহর্ধনিশাকরান্ ।।
লিখিত্বা সার্দ্ধসংস্থানি তত্র সূত্রাণি পাতয়েৎ।
দলাগ্রাণাঞ্চ যন্মানং তন্মানাৎ বৃত্তমালিখেং।।
তদন্তরালং তন্মধ্যসূত্রস্যোভয়তঃ সুধীঃ।
আলিখেদ্বাহ্যহন্তেন দলাগ্রাণি সমন্ততঃ।।
দলমূলেষু যুগশঃ কেশরাণি প্রকল্পয়েৎ।
এতৎ সাধারণং প্রোক্তং পঙ্কজং তন্ত্রবেদিভিঃ।।
———————————————
অঙ্গুলোৎসেধবিস্তারাঃ সীমারেখাঃ নিতাঃ শুভাঃ।
কর্ণিকাং পীতবর্ণেন কেশরাণ্যরুণেন চ।।
শুক্ল-বর্ণানি পত্রাণি তৎসন্ধীন্ শ্যামলেন চ।
রজসা রঞ্জয়েন্মন্ত্রী যদ্বা পীতৈব কর্ণিকা।।
কেশরাঃ পীতরক্তাঃ স্যুররুণানি দলানি চ।
সন্ধয়ঃ কৃষ্ণবর্ণাঃ স্যুঃ সিতেনাপ্যসিতেন বা।।
রঞ্জয়েৎ পীঠগর্ভাণি পাদাঃ স্যুররুণপ্রভাঃ।
গাত্রাণি তস্য শুক্লানি বীথিষু চ চতসৃষু।।
আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্ ।
বর্ণৈনানাবিধৈশ্চিত্রৈঃ সর্ব্বদৃষ্টিমনোহরাম্ ।।
দ্বারানি শ্বেতবর্ণানি শোভা রক্তাঃ সমীরিতাঃ।
উপশোভাঃ পীতবর্ণাঃ কোণান্যসিতভানি চ।।
তিস্রো রেখা বহিঃ কার্য্যাঃ সিতরক্তাসিতাঃ ক্রমাৎ।
মণ্ডলং সর্ব্বতোভদ্রমেতৎ সাধারণং মতম্ ।।
অর্থাৎ :
তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে। পরে অবশিষ্ট দুই পংক্তি দ্বারা মধ্যস্থলে দ্বার, উভয় পার্শ্বে দুইটি করিয়া শোভা এবং শোভাদ্বয়ের পার্শ্বে দুইটি করিয়া উপশোভা এবং পরে কোণ প্রস্তুত করিতে হইবে। যে ৩৬টি ঘর লইয়া পদ্ম অঙ্কিত, তাহার দ্বাদশটি ঘর বাহিরে পৃথক রাখিয়া তন্মধ্যস্থ ২৪টি ঘরকে ৩টি বৃত্ত দ্বারা সমভাগে বিভক্ত করিবে। উহার প্রথম বৃত্ত কর্ণিকা, দ্বিতীয় বৃত্ত কেশর ও তৃতীয়টি পদ্মপত্র। যে দ্বাদশাংশ বাহিরে রাখা হইয়াছে, উহা পত্রের অগ্র। তৃতীয় বৃত্তের মধ্যস্থ স্থানের পরিমাণে পদ্মপত্র রচনা করিবে। কেশর সমূহের অগ্রভাগে অর্ধচন্দ্র অঙ্কিত করিবে। অর্ধচন্দ্রাকৃতি রেখা-সমূহের মধ্যভাগে সূত্রপাত করত পদ্মপত্রের অগ্রগুলির সমান মাপে বৃত্তরেখা আঁকিবে।
মধ্যস্থ সূত্রপাতের দুই পার্শ্বে স্থির হস্তে দলাগ্র আঁকিবে। দলমূলে দুই দুইটি করিয়া কেশর করিতে হয়। ইহাকেই তন্ত্রবেত্তারা সাধারণ পদ্ম কহেন।…
এক অঙ্গুলি উৎসেধ অর্থাৎ বেধ পরিমাণে শুভ্রবর্ণদ্বারা সীমারেখা সকল চিত্রিত করিয়া পীতবর্ণদ্বারা কর্ণিকা, রক্তবর্ণ গুণ্ডিকাদ্বারা কেশর ও শুক্লবর্ণদ্বারা পত্রসকল রঞ্জিত করিয়া শ্যামবর্ণে সমস্ত সন্ধিস্থানে চিত্রিত করিবে। প্রকারান্তরে যথা- কর্ণিকা পীতবর্ণ, কেশরসকল পীত রক্তবর্ণ, পত্রসকল রক্তবর্ণ, সন্ধি কৃষ্ণবর্ণ, পীঠগর্ভ শুক্লবর্ণ কিংবা কৃষ্ণবর্ণ, পীঠপাদ রক্তবর্ণ ও পীঠগাত্র শুক্লবর্ণ করিয়া বীথিচতুষ্টয়ে পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে। এই কল্পলতিকা দর্শনমনোহর করিবে। দ্বারসকল শুক্লবর্ণ, শোভা রক্তবর্ণ, উপশোভা পীতবর্ণ ও কোণ চতুষ্টয় কৃষ্ণবর্ণ করিবে। মণ্ডলের বহির্দেশে শ্বেত রক্ত ও কৃষ্ণবর্ণ তিনটি রেখা চিত্রিত করিবে। এই প্রকারে সাধারণ সর্বতোভদ্রমন্ডল নির্মাণ করিতে হইবে।


এতোখানি জ্যামিতিক নিষ্ঠা নিয়ে, শোভা এবং উপশোভায় বিভূষিত করে, এই যে সর্বতোভদ্রমণ্ডলটি আঁকবার নির্দেশ পাওয়া গেলো, এর মূল কথা কী? তন্ত্রবেত্তারা জানেন, এর মূল কথা হলো অষ্টদলপদ্ম ও বীথিকা :

ষটত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেৎ পদ্মং সুলক্ষণম্ ।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা।।
(অর্থাৎ : তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে।)


সুলক্ষণ পদ্ম এবং বীথিকা; ওই বীথিকার নাম কল্পলতিকা :

আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্ ।
(অর্থাৎ : পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে।)


প্রথমে মনে রাখা দরকার, তন্ত্রে এই পদ্ম এবং বীথিকার গুরুত্ব কতোখানি। কেননা, শুধুমাত্র সর্বতোভদ্রমণ্ডল নয়, প্রায় সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রেরই মূল বিষয়বস্তু বলতে এই পদ্ম এবং বীথিকাই। তান্ত্রিক যন্ত্রের ছবিগুলিকে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে খুঁটিনাটির তারতম্য থাকলেও অষ্টদলপদ্ম এবং বীথিকাই সমস্ত চিত্রের মূল বিষয়বস্তু।

11222244_10206042739080400_3040856174016983064_n
অতএব, যন্ত্র-প্রসঙ্গে প্রধানতম প্রশ্ন ওঠে, ওই পদ্ম বা অষ্টদলপদ্মের প্রকৃত তাৎপর্য কী ? বাংলার পূজাপদ্ধতি এবং তন্ত্রের যন্ত্র-সংকেতের সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় যাঁর আছে তিনিই জানেন, তন্ত্রে পদ্ম বা অষ্টদলপদ্ম নারী-জননাঙ্গের প্রতীক মাত্র। অনেক সময় তান্ত্রিক রচনায় পদ্ম শব্দটিকে একেবারে সোজাসুজি সেই অর্থেই গ্রহণ করা হয়। যথা :

‘পদ্মমধ্যে গতে শুক্রে সন্ততিস্তেন জায়তে।।’ (বিশ্বকোষ-৭/৫৪১)
(অর্থাৎ, পদ্মমধ্যে শুক্রের মিলনে সন্ততির জন্ম)


তন্ত্রে ‘পদ্ম’-শব্দের এই জাতীয় ব্যবহার একটুও দুর্লভ নয়। বৌদ্ধতন্ত্র প্রসঙ্গে আধুনিক বিশেষজ্ঞ বলছেন (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪০৯)-

‘Vajra’ (with the variant `mani’) is a decent or mystic phrase for `linga’, the male organ, just as `padma’, lotus, is the literary rendering of `bhaga’ or `yoni’.’’
অর্থাৎ : বজ্র (বা মণি) শব্দ পুরুষ-অঙ্গবাচক, যেমন পদ্ম শব্দ হলো ভগ বা নারী-জননাঙ্গের সাহিত্যিক প্রতিশব্দ।


তাহলে পদ্মের অর্থ নারীজননাঙ্গই। এই পদ্মই হলো সর্বতোভদ্রমন্ডলের– তথা সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রের– মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু সেই সঙ্গেই লক্ষ্য করা দরকার, তান্ত্রিক যন্ত্রগুলিতে শুধুমাত্র পদ্মের চিত্র নয়; পদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে বীথিকার সম্পর্ক কী? তান্ত্রিক যন্ত্র প্রসঙ্গে এই প্রশ্নটি স্বভাবতই সবচেয়ে মৌলিক। যুক্তি অনুসারে, এর মূলে আছে এক আদিম বিশ্বাস : যে-বিশ্বাস থেকে দেবীর নাম হয়েছিলো শাকম্ভরী, কিংবা, যে-বিশ্বাসের মূর্ত পরিচয় হরপ্পার ওই অত্যাশ্চর্য সীলটিতে টিকে আছে। এবং, এইভাবে প্রাকৃতিক উর্বরতার সঙ্গে মানবীর উর্বরতার সংযোগ কল্পনা করা হয়েছে বলেই তন্ত্রে নারী-জননাঙ্গকে উদ্ভিদ-বাচক নাম (লতা) দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো।

11709546_10206042739280405_5020960250406560090_nএই আদিম বিশ্বাসটির দিক থেকে শক্তি-সাধনার তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তন্ত্রমতে নারী-জননাঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যেমন-

‘স্ত্রীভগং পূজনাধারঃ’
অর্থাৎ, ‘স্ত্রীভগ বা নারীযোনি হচ্ছে সকল উপাসনার আধার বা উৎস’।


এজাতীয় কথা তন্ত্রে বহুবার পাওয়া যায়। তন্ত্রের একটি প্রসিদ্ধ সাধনার নামই হলো ‘ভগযাগ’। এছাড়া তন্ত্র সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের প্রচুর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কেননা, তন্ত্র-সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের একটি পারিভাষিক অর্থ আছে। সে-অর্থ হলো, নারী-জননাঙ্গ। তন্ত্র-সাধনায় অন্যান্য গুহ্য সাধনার মতো আরেকটি গুহ্য ও কঠিন সাধনার নাম লতা-সাধনা। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে-
বরং ফণী ধরিয়া বিষভক্ষণ করা সহজ, বরং সিংহশার্দূলের সহিত যুদ্ধ করা সহজ, কিন্তু লতা-সাধনা অতি কঠিন, অতি কঠোর।’ (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী-২/২৫১)

এরকম গুহ্য ও কঠিন লতা-সাধনার মূল কথাটা কী? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৩৯৯) উদ্ধৃতি টেনেছেন এভাবে-
এই সাধনার প্রধান অধিকরণ স্ত্রী, এইজন্য ইহাকে লতাসাধনা কহে। এই সাধনার বিষয় তন্ত্রে বর্ণিত হইয়াছে

লতায়াঃ সাধনং বক্ষ্যে শৃণুস্ব হরবল্লভে।
শতং কেশে শতং ভালে শতং সিন্দুরমন্ডলে।।
স্তনদ্বয়ে শতদ্বন্দ্বং শতং নাভৌ মহেশ্বরি।
শতং যোনৌ মহেশানি উত্থায় চ শতত্রয়ম্ ।।
এবং দশশতং জপ্ত্বা সর্ব্বসিদ্ধিশয়ো ভবেৎ।
অথান্যৎ সংপ্রবক্ষ্যামি সাধনং ভুবি দুর্লভম্ ।।
রজোহবস্থাং সমানীয় তদ্ যোনৌ স্বেষ্টদেবতাম্ ।
পূজয়িত্বা মহারাত্রৌ ত্রিদিনং পূজয়েন্মনুম্ ।।
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
[ভাবার্থ : বিশ্বকোষ, ১৭ খণ্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]


বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক রুচি ও নীতিবোধের কাছে এ জাতীয় চিন্তাধারা বীভৎস কামবিকারের পরিচায়কমাত্র বলেই দেবীপ্রসাদ বাংলা তর্জমাটুকু এখানে উদ্ধত না করে কেবল সূত্র উল্লেখ করেছেন। সে যাই হোক, আমাদের আধুনিক যুগের পটভূমিতে এই তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতিকে যতো বীভৎস বিকৃতি বলে প্রতীয়মান হোক না কেন, সমাজবিকাশের যে-পর্যায়ে এগুলির উদ্ভব হয়েছিলো একমাত্র তারই পটভূমিতে এগুলির আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধান করা যাবে।

আমাদের আলোচ্য দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ যে যন্ত্র ও ঘট, তান্ত্রিক প্রণালীতে যন্ত্রের তাৎপর্য দেখলাম সর্বতোভদ্রমণ্ডলের আলোচনায়। এরপর সর্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হবে। এক্ষেত্রে ‘ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি’তে ঘট স্থাপন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে-

‘অনন্তর সর্বতোভদ্রমণ্ডলোপরি ঘট স্থাপন করিবে। যথা,–শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করিবে, তদুপরি ধৌত সুলক্ষণ ঘট, তাহাতে দধ্যক্ষত (দধি মাখানো আতপ চাউল) দিয়া শুদ্ধ জলপূর্ণ করিয়া স্থাপন করিবে। তাহার কণ্ঠে আচারৎ লাল সুতা ও আলতা দেওয়া হয়। মধ্যে পঞ্চপল্লব (আম্র, অশ্বত্থ, বট, পাকুড়, যজ্ঞীয়ডুম্বুর শাখা), অলভে কেবল আম্রপল্লব দিবে। তদভাবে দুইটি পানও দিবার ব্যবস্থা আছে। এক সরা চাউলে একটি হরিতকী কিংবা সুপারী দিয়া তদুপরি স্থাপন করিবে। তদুপরি একটি নির্দোষ সশীর্ষ ফল (নারিকেল অথবা কদলী) দিবে; ঐ ফলকে সিন্দুর রঞ্জিত করিবে। ঘটে একটি সিন্দুর পুত্তলিকা আঁকিবে, পুষ্পমাল্য দিয়া শোভিত করিবে…।’ (ক্রিয়াকান্ড-বারিধি-১/২৩৯)


দেবীপ্রসাদ বলেন, সর্বতোভদ্রমণ্ডলের অর্থ হলো নারী-জননাঙ্গ : সর্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট, ঘটের গায়ে সিন্দুরপুত্তলিকা- মানবীয় প্রজননের প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ নকল তোলবার আয়োজন। এইভাবে মানবীয় প্রজননের নকল তুলে কোন্ কামনা সফল করবার কল্পনা করা হচ্ছে তার আভাস আমরা আগেই পেয়েছি : নারী-জননাঙ্গের তান্ত্রিক নাম লতা, তান্ত্রিক যন্ত্রে অষ্টদলপদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। অর্থাৎ, নারী অঙ্গের জননশক্তির স্পর্শে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার কল্পনা। ঘট-স্থাপনার মধ্যে সেই চেষ্টাকেই আরো একটু এগিয়ে নিয়ে যাবার আয়োজন করা হলো। শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করে ফসল ফলানোর মহড়া শুরু হলো। আর তারপর ঘটের উপরস্থ পল্লবকে স্পর্শ করে কামনা জানানো হবে :

‘ওঁ, অয়মূর্জাবতো বৃক্ষ উজ্জীব ফলিনী ভব। পর্ণং বনস্পতের্নুত্বা নুত্বা চ সুয়তাং রয়িঃ।’ (ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি-১/২৪০)
অর্থাৎ : হে শক্তিমতি বৃক্ষ, (তুমি) বাঁচিয়া ওঠো ও ফলবতী হও। বনস্পতির পাতাকে সেবা করিয়া ধন প্রসব করো।


অনেক সময় ঘটের উপরের ডাবটির গায়েই সিন্দুরপুত্তলি এঁকে দিয়ে মানবীয় ফলপ্রসূতার সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সাদৃশ্যে বিশ্বাসকে আরো স্পষ্ট ও অভ্রান্ত করবার আয়োজন দেখা যায়। ওই যন্ত্র আর ঘটই হলো দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ। তার মানে, কৃষি-আবিষ্কার পর্যায়ের এক আদিম বিশ্বাসই এ-পূজার প্রাণবস্তু। একটু গভীরভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, আদিপর্বে দুর্গাপূজা আসলে পূজাই ছিলো না। পূজার বদলে ছিলো জাদুঅনুষ্ঠান। জাদুঅনুষ্ঠানের মূল কথাটা হলো একটা কামনা সফল করবার চেষ্টাই। কিন্তু তা প্রার্থনা-উপাসনার সাহায্যে ঈশ্বরের করুণা উদ্রেক করে নয়। তার বদলে, কামনা সফল হওয়ার একটা নকল তুলে ওই নকলের সাহায্যেই বাস্তবভাবে কামনাটিকে সফল করবার কল্পনা। অষ্টদলপদ্মের ছবি এঁকে সিন্দুরপুত্তলীর ছবি এঁকে, মানবীয় ফলপ্রসূতার নকল তোলা হলো আর কল্পনা করা হলো প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার কামনাও এইভাবেই সফল হবে।

বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক চেতনার দিক থেকে এ-বিশ্বাস একেবারে অর্থহীন। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সম্পর্ক কোথায়? কিন্তু আধুনিক চেতনার মাপকাঠিতে তন্ত্রকে বোঝা যাবে না। তার বদলে এই তান্ত্রিক বিশ্বাসটিকে ঠিকভাবে বুঝতে হলে পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের আচর-অনুষ্ঠানকে- বা পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের আচার-অনুষ্ঠানের স্মারকগুলিকে- বিচার করতে হবে। কিভাবে?  দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের তর্জমায় অধ্যাপক জর্জ টমসন-এর উদ্ধৃতি-

‘উত্তর আমেরিকায় ফসলে পোকা ধরলে ঋতুমতী মেয়েরা রাত্রে নগ্ন হয়ে ক্ষেতের উপর হাঁটে। ইয়োরোপের চাষীদের মধ্যে এ-প্রথা আজো টিকে আছে। খারাপ পোকার প্রতিষেধ হিসেবে প্লিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন, ঋতুমতী মেয়েরা খালিপায়ে এলোচুলে কোমরের ওপর পর্যন্ত কাপড় তুলে ক্ষেতের উপর হাঁটবে। কলিউমেল্লার মতে ডিমোক্রাইটসেরও সেই বিধান : তিনি বলেছেন, মেয়েরা খালিপায়ে আর এলোচুলে তিনবার দৌড়ে ক্ষেত প্রদক্ষিণ করবে। ধারণাটা স্পষ্ট এই যে, এ-অবস্থায় নারীদেহে যে-উর্বরাশক্তির আবির্ভাব হয় তাই এ-ভাবে ক্ষেতের মধ্যে সঞ্চারিত করা হবে। অন্যত্র দেখা যায়, ওই শক্তিকে নারীত্বের সহজাত শক্তি হিসেবেই মনে করা হচ্ছে। জুলুদের মধ্যে প্রথা হলো, ক্ষেতে ঘোরবার সময় মেয়েরা নগ্ন হবে, কিন্তু তখন ঋতুমতী যে হতেই হবে তা নয়। মেয়েদের জননাঙ্গ প্রদর্শন-মূলক অনুষ্ঠানাদিরও একই উৎস- এই অনুষ্ঠান গ্রীসে বিশেষ করে ডিমিটর-দেবীর সঙ্গে সংযুক্ত। নানান গ্রীক পূজাপদ্ধতিতে ব্যবস্থা দেখা যায়, পূজারিণীরা খালিপায়ে আর এলোচুলে সার বেঁধে হাঁটবে- ওই পূজাপদ্ধতিগুলিও একই জাতীয় ধারণা থেকে এসেছে।’ (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪১২)


নারী জননাঙ্গকেই মানুষ এককালে উৎপাদন-শক্তির আধার মনে করেছে আর তাই প্রাকৃতিক উৎপাদনে সংকট দেখা গেলে মেয়েরা নগ্নতার সাহায্যে সে-সংকট দূর করতে চেয়েছে।
এ প্রসঙ্গেই স্মর্তব্য যে আধুনিক বিদ্বানদের অনেকেই দাবি করেছেন, সিন্ধু-সভ্যতার প্রচলিত নানা চিত্রলিপি এবং অন্যান্য নিদর্শনের মধ্যে পরবর্তীকালে তন্ত্র সাধনায় ব্যবহৃত নানা চিত্রাবলীর সুস্পষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া যায়।
যেমন, ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে প্রত্ন-তত্ত্ব খননে এমন কিছু মাতৃমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে যে মাতৃমূর্তিগুলির রচনায় যোনি বা নারী-জননাঙ্গের উপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপণ করার চেষ্টা খুবই স্পষ্ট। তাছাড়া মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তুপ থেকে পোড়ামাটির যোনি-মূর্তিও এর জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। এই যোনি ক্রমশই জামিতিক ত্রিকোণের আকার ধারণ করেছে। কেননা তন্ত্র-সাধনায় যন্ত্র হিসেবে প্রচলিত চিত্রগুলির সঙ্গে এই মূর্তির নিম্ন-ভাগের সাদৃশ্যের আভাস পাওয়া যায় বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অভিমত। তন্ত্রে যেগুলিকে যন্ত্র বলা হয় সেগুলি আর কিছুই নয়, ওই নারী-জননাঙ্গের প্রতীক-চিহ্নমাত্র।

আদিম মাতৃপ্রধান বা শক্তি-প্রধান চিন্তাধারা ক্রমশ কী করে নারী-জননাঙ্গ-কেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ-পর্যায়ে তার ব্যাখ্যা কী হতে পারে?-
প্রাচীন মাতৃমূর্তির পরিকল্পনায় যদি জননাঙ্গকেই ক্রমশ নারীদেহের প্রধানতম অবয়ব বলে গ্রহণ করবার চেষ্টা দেখা যায় তাহলে স্বভাবতই কৃষিভিত্তিক প্রচীন সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে নারীদেহের অন্যান্য অবয়ব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র যোনি বা নারী-জননাঙ্গের মূর্তি খুঁজে পাওয়া বিস্ময়ের ব্যাপার হবে না।…
মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা এ-জাতীয় যোনি-মূর্তি রচনা করেছিলেন কেন? এর পিছনে নিশ্চয়ই প্রজননের কামনা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র প্রজননের কামনাই নয়। তার সঙ্গে জড়িত ছিলো ধনোৎপাদনের কামনাও- কৃষিকাজের সাফল্য-কামনাও। কেননা এই যোনি-মূর্তি মানব-বিশ্বাসের এমন এক স্তরের সাক্ষ্য বহন করছে, যেখানে শুধুমাত্র সন্তান-উৎপাদনই নয়– প্রাকৃতিক উৎপাদনও– নারী-জননাঙ্গের উপর নির্ভরশীল।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৯৫)

ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসটির স্মারক সিন্ধু-সভ্যতার মধ্যেই পরিসমাপ্ত নয়, বরং উত্তরকালের তন্ত্র-সাধনার মধ্যেই তার অবিচ্ছেদ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব :  বৈদিক সাহিত্যের দেবীস্তুতি প্রসঙ্গে] [*] [পরের পর্ব : উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৭ : প্রকৃতি উপাসনা|"

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 188,604 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: