h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৬ : বৈদিক সাহিত্যের দেবীস্তুতি প্রসঙ্গে|

Posted on: 03/07/2015


1908473_744382928977158_9020559613900978247_n

| প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৬ : বৈদিক সাহিত্যের দেবীস্তুতি প্রসঙ্গে |
রণদীপম বসু

বৈদিক সাহিত্যের দেবীস্তুতি প্রসঙ্গে

ঋগ্বেদে শক্তি-উপাসনা বা মাতৃ-উপাসনার নজির হিসেবে ‘দেবী-সূক্ত’-এর উল্লেখ করা হয়। এটি ‘আত্মা-সূক্ত’ নামেও পরিচিত। এখানে ঋকগুলিতে দেবী নিজের বিষয়ে নিজেই বলছেন, যা ঋগ্বেদের অন্য সূক্তগুলির বৈশিষ্ট্যের সাথে খুবই অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। তাছাড়া এই সূক্তটি যে অত্যন্ত অর্বাচীন- অর্থাৎ অনেক পরবর্তীকালে রচিত হয়ে অত্যন্ত কৃত্রিমভাবেই ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের মধ্যে সংকলিত হয়েছিলো- এ-বিষয়ে দায়িত্বশীল বেদবিদদের মধ্যে দ্বিমত নেই।

প্রসিদ্ধ এই দেবী-সূক্তটি (ঋগ্বেদ-১০/১২৫) হলো-

‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরাম্যহমাদিত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ।
অহং মিত্রাবরুণোভা বিভর্ম্যহমিন্দ্রাগ্নী অহমশ্বিন্যেভা।। ১
অহং সোমমাহনসং বিভর্ম্যহং ত্বষ্টারমুত পূষণং ভগম্ ।
অহং দধামি দ্রবিণং হবিষ্মতে সুপ্রাব্যে যজমানায় সুন্বতে।। ২
অহং রাষ্ট্রী সঙ্গমনী বসূনাং চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্ ।
তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা ভূরিস্থাত্রাং ভূর্যাবেশয়ন্তীম্ ।। ৩
ময়া সো অন্নমত্তি যো বিপশ্যতি যঃ প্রাণিতি য ঈং শৃণোত্যুক্তম্ ।
অমন্তবো মাং তা উপ ক্ষিয়ন্তি শ্রুধি শ্রূত শ্রদ্ধিবং তে বদামি।। ৪
অহমেব স্বয়মিদং বদামি জুষ্টং দেবেভিরুত মানুষেভিঃ।
যং কাময়ে তন্তমুগ্রং কৃণোমি তং ব্রহ্মাণং তমৃষিং তং সুমেধাম্ ।। ৫
অহং রুদ্রায় ধনুরা তনোমি ব্রহ্মদ্বিষে শরবে হন্তবা উ।
অহং জনায় সমদং কৃণোম্যহং দ্যাবাপৃথিবী আ বিবেশ।। ৬
অহং সুবে পিতরমস্য মূর্ধন্মম যোনিরপস্বন্তঃ সমুদ্রে।
ততো বি তিষ্ঠে ভুবনানু বিশ্বোতামূং দ্যাং বর্ষ্মণোপ স্পৃশামি।। ৭
অহমেব বাত ইব প্র বাম্যারভমাণা ভুবনানি বিশ্বা।
পরো দিবা পর এনা পৃথিব্যৈতাবতী মহিনা সং বভূব’।। ৮
অর্থাৎ ঃ [বাগ্দেবীর উক্তি]
১। আমি রুদ্রগণ ও বসুগণের সঙ্গে বিচরণ করি, আমি আদিত্যদের সঙ্গে এবং সকল দেবতাদের সঙ্গে থাকি, আমি মিত্র ও বরুণ এ উভয়কে ধারণ করি, আমিই ইন্দ্র ও অগ্নি এবং দু অশ্বিদ্বয়কে অবলম্বন করি।  ২। যে সোম আঘাত অর্থাৎ প্রস্তর নিষ্পীড়ন দ্বারা উৎপন্ন হন, আমিই তাঁকে ধারণ করি, আমি ত্বষ্টা ও পূষা ও ভগকে ধারণ করি, যে যজমান যজ্ঞসামগ্রী আয়োজনপূর্বক এবং সোমরস প্রস্তুত করে দেবতাদের উত্তমরূপে সন্তুষ্ট করে, আমিই তাকে ধন দান করি।  ৩। আমি রাজ্যের অধীশ্বরী, ধন উপস্থিত করেছি, জ্ঞানসম্পন্ন এবং যজ্ঞোপযোগী বস্তু সকলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এরূপে আমাকে দেবতারা নানা স্থানে সন্নিবেশিত করেছেন, আমার আশ্রয়স্থান বিস্তর, আমি বিস্তর প্রাণীর মধ্যে আবিষ্ট আছি।  ৪। যিনি দর্শন করেন, প্রাণধারণ করেন, কথা শ্রবণ করেন অথবা অন্ন ভোজন করেন, তিনি আমার সহায়তায় সে সকল কার্য করেন। আমাকে যারা মানে না, তারা ক্ষয় হয়ে যায়। হে বিদ্বান! শোন, আমি যা বলছি তা শ্রদ্ধার যোগ্য।  ৫। দেবতারা এবং মনুষ্যেরা যাঁর শরণাগত হয়, তাঁর বিষয় আমিই উপদেশ দিই। যাকে ইচ্ছা আমি বলবান অথবা স্তোতা অথবা ঋষি অথবা বুদ্ধিমান করতে পারি।  ৬। রুদ্র যখন স্তোত্রদ্বেষী শত্রুকে বধ করতে উদ্যত হন তখন আমিই তাঁর ধনু বিস্তার করে দিই। লোকের জন্য আমিই যুদ্ধ করি। আমি দ্যুলোকে ও ভূলোকে আবিষ্ট হয়ে আছি।  ৭। আমি পিতা, আকাশকে প্রসব করেছি। সে আকাশ এ জগতের মস্তকস্বরূপ। সমুদ্রে জলের মধ্যে আমার স্থান। সে স্থান হতে সকল ভূবনে বিস্তারিত হই, আপনার উন্নত দেহদ্বারা এ দ্যুলোককে আমি স্পর্শ করি।  ৮। আমিই সকল ভুবন নির্মাণ করতে করতে বায়ুর ন্যায় বহমান হই। আমার মহিমা এরূপ বৃহৎ হয়েছে যে দ্যুলোককেও অতিক্রম করেছে, পৃথিবীকেও অতিক্রম করেছে।


মহাপণ্ডিত সায়নাচার্যকে বেদের সর্বজন-স্বীকৃত ভাষ্যকার বা টীকাকার বলা হয়। এই দেবী-সূক্ত সম্পর্কে সায়নাচার্যের ভাষ্য হলো- ‘বাগ্দেবীকে এ সূক্তের বক্তা অর্থাৎ ঋষি বলে নির্দেশ করা হয়েছে। কিন্তু বাক্ যে এ সূক্তের বক্তা, সূক্তের ভেতর তার কোনও নিদর্শন নেই। বক্তা আপনাকে সর্বনিয়ন্তা ও সর্বনির্মাতা বলে পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে একমাত্র ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনীয়, অর্থাৎ তিনি ঈশ্বর।

এই দেবী-সূক্তে দেবী বলছেন তিনি বিস্তর প্রাণীর মধ্যে আবিষ্ট আছেন। তিনি দ্যুলোকে ও ভূলোকে আবিষ্ট আছেন, তিনি সকল ভুবনে বিস্তারিত হন। এবং এ প্রেক্ষিতে অত্যন্ত কৌতুহলজনক বিষয় হচ্ছে, এই একই রকম সর্বেশ্বরবাদী চিন্তার প্রকট প্রকাশ দেখা যায় ঋগ্বেদেরই অন্য আরেকটি অর্বাচীন সূক্তের ভিন্ন অবস্থান থেকে, এবং সেই সূক্তটি হচ্ছে ঋগ্বেদের প্রসিদ্ধ সেই ‘পুরুষ-সূক্ত’, যেখানে এক পরম-পুরুষই সর্বেসর্বা। সেখানে এমন এক সর্বব্যাপী বিরাট পুরুষের কল্পনা করা হয়েছে, যাঁর সহস্র মাথা এবং সহস্র চরণ। পৃথিবীকে ব্যাপ্ত করেও তিনি তাকে অতিক্রম করেছেন, এতো বিরাট তিনি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তাঁর অঙ্গ বা বিভিন্ন অংশ হতে চন্দ্র, সূর্য, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, স্বর্গ, ভূমি, ইন্দ্র, দিক ও ভুবন সবই সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর দেহই খণ্ডিত হয়ে বিশ্বের নানা বস্তু ও জীবে পরিণত হয়েছে। তিনিই বিশ্বরূপে রূপান্তরিত হয়েছেন। অতি-প্রসিদ্ধ এই পুরুষ-সূক্তটি (ঋগ্বেদ-১০/৯০) হলো-

‘সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃহাত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্ ।। ১।
পুরুষ এবেদং সর্বং যদ্ভূতং যচ্চ ভব্য।
উতামৃতত্বস্যেশানো যদন্নেনাতিরোহতি।। ২।
এতাবানস্য মহিমাতো জ্যায়াংশ্চ পূরুষঃ।
পাদোহস্য বিশ্বা ভূতানি ত্রিপাদস্যামৃতং দিবি।। ৩।
ত্রিপাদূর্ধ্ব উদৈৎ পুরুষঃ পাদোহস্যেহাভবৎ পুনঃ।
ততো বিষ্বঙব্যক্রামৎ সাশনানশনে অভি।। ৪।
তস্মাদ্বিরাড়জায়ত বিরাজো অধি পূরুষঃ।
স জাতো অত্যরিচ্যত পশ্চাদ্ভূমিমথো পুরঃ।। ৫।
যৎ পুরুষেণ হবিষা দেবা যজ্ঞমতন্বত।
বসন্তো অস্যাসীদাজ্যং গ্রীষ্ম ইধ্মঃ শরদ্ধবিঃ।। ৬।
তং যজ্ঞং বর্হিষি প্রৌক্ষন্ পুরুষং জাতমগ্রতঃ।
তেন দেবা অযজন্ত সাধ্যা ঋষয়শ্চ যে।। ৭।
তস্মাদ্যজ্ঞাৎ সর্বহুতঃ সম্ভূতং পৃষদাজ্যম্ ।
পশুন্তাংশ্চক্রে বায়ব্যানারাণ্যান্ গ্রাম্যাশ্চ যে।। ৮।
তস্মাদ্যজ্ঞাৎ সর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে।
ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদ্যজুস্তস্মাদজায়ত।। ৯।
তস্মাদশ্বা অজায়ন্ত যে কে চোভয়াদতঃ।
গাবো হ জজ্ঞিরে তস্মাত্তস্মাজ্জাতা অজাবয়ঃ।। ১০।
যৎপুরুষং ব্যদধুঃ কতিধা ব্যকল্পয়ন্ ।
মুখং কিমস্য কৌ বাহূ কা ঊরূ পাদা উচ্যেতে।। ১১।
ব্রাহ্মণোহস্য মুখমাসীদ্বাহূ রাজন্যঃ কৃতঃ।
ঊরূ তদস্য যদ্বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রো অজায়ত।। ১২।
চন্দ্রমা মনসো জাতশ্চক্ষোঃ সূর্যো অজায়ত।
মুখাদিন্দ্রশ্চাগ্মিশ্চ প্রাণাদ্বায়ুরজায়ত।। ১৩।
নাভ্যা আসীদন্তরিক্ষং শীর্ষ্ণো দ্যৌঃ সমবর্তত।
পদ্ভ্যাং ভূমির্দিশঃ শ্রোত্রাত্তথা লোকা অকল্পয়ন্ ।। ১৪।
সপ্তাস্যাসন্ পরিধিয়স্ত্রিঃ সপ্ত সমিধঃ কৃতাঃ।
দেবা যদ্যজ্ঞং তন্বানা অবধ্নন্ পুরুষং পশুম্ ।। ১৫।
যজ্ঞেন যজ্ঞমযজন্ত দেবাস্তানি ধর্মাণি প্রথমান্যাসন্ ।
তে হ নাকং মহিমানঃ সচন্ত যত্র পূর্বে সাধ্যাঃ সন্তি দেবাঃ।। ১৬।
অর্থাৎ :
১। পুরুষের সহস্র মস্তক, সহস্র চক্ষু ও সহস্র চরণ। তিনি পৃথিবীকে সর্বত্র ব্যাপ্ত করে দশ অঙ্গুলি পরিমাণ অতিরিক্ত হয়ে অবস্থিত থাকেন।  ২। যা হয়েছে অথবা যা হবে সকলই সে পুরুষ। তিনি অমরত্বলাভে অধিকারী হন, কেননা তিনি অন্নদ্বারা অতিরোহণ করেন।  ৩। তাঁর এরূপ মহিমা, তিনি কিন্তু এ অপেক্ষাও বৃহত্তর। বিশ্বজীবসমূহ তাঁর একপাদ মাত্র, আকাশে অমর অংশ তাঁর তিন পাদ।  ৪। পুরুষ আপনার তিন পাদ (বা অংশ) নিয়ে উপরে উঠলেন। তাঁর চতুর্থ অংশ এ স্থানে রইলো। তিনি তদনন্তর ভোজনকারী ও ভোজনরহিত ( চেতন ও অবচেতন) সকল বস্তুতে ব্যাপ্ত হলেন।  ৫। তিনি হতে বিরাট জন্মিলেন এবং বিরাট হতে সে পুরুষ জন্মিলেন। তিনি জন্মগ্রহণপূর্বক পশ্চাদ্ভাগে ও পুরোভাগে পৃথিবীকে অতিক্রম করলেন।  ৬। যখন পুরুষকে হব্য রূপে গ্রহণ করে দেবতারা যজ্ঞ আরম্ভ করলেন, তখন বসন্ত ঘৃত হলো, গ্রীষ্ম কাষ্ঠ হলো, শরৎ হব্য হলো।  ৭। যিনি সকলের অগ্রে জন্মেছিলেন, সে পুরুষকে যজ্ঞীয় পশুস্বরূপে সে বহ্নিতে পূজা দেওয়া হলো। দেবতারা ও সাধ্যবর্গ এবং ঋষিগণ তা দ্বারা যজ্ঞ করলেন।  ৮। সে সর্ব হোমযুক্ত যজ্ঞ হতে দধি ও ঘৃত উৎপন্ন হলো। তিনি সে বায়ব্য পশু নির্মাণ করলেন, তারা বন্য এবং গ্রাম্য।  ৯। সে সর্ব হোম-সম্বলিত যজ্ঞ হতে ঋক ও সামসমূহ উৎপন্ন হলো, ছন্দ সকল তথা হতে আবির্ভূত হলো, যজু তা হতে জন্ম গ্রহণ করলো।  ১০। ঘোটকগণ এবং অন্যান্য দন্ত পঙক্তিদ্বয়ধারী পশুগণ জন্মিল। তা হতে গাভীগণ ও ছাগ ও মেষগণ জন্মিল।  ১১। পুরুষকে খণ্ড খণ্ড করা হলো, কয় খণ্ড করা হয়েছিলো ? এর মুখ কী হলো, দু হস্ত, দু উরু, দু চরণ কী হলো ?  ১২। এর মুখ ব্রাহ্মণ হলো, দু বাহু রাজন্য হলো, যা উরু ছিলো তা বৈশ্য হলো, দু চরণ হতে শূদ্র হলো।  ১৩। মন হতে চন্দ্র হলেন, চক্ষু হতে সূর্য, মুখ হতে ইন্দ্র ও অগ্নি, প্রাণ হতে বায়ু।  ১৪। নাভি হতে আকাশ, মস্তক হতে স্বর্গ, দু চরণ হতে ভূমি, কর্ণ হতে দিক ও ভূবন সকল নির্মাণ করা হলো।  ১৫। দেবতারা যজ্ঞ সম্পাদন কালে পুরুষস্বরূপ পশুকে যখন বন্ধন করলেন তখন সাতটি পরিধি অর্থাৎ বেদী নির্মাণ করা হলো এবং তিনসপ্ত সংখ্যক যজ্ঞকাষ্ঠ হলো।  ১৬। দেবতারা যজ্ঞ দ্বারা যজ্ঞ সম্পাদন করলেন, তাই সর্ব প্রথম ধর্মানুষ্ঠান। যে স্বর্গলোকে প্রধান প্রধান দেবতা ও সাধ্যেরা আছেন, মহিমান্বিত দেবতাবর্গ সে স্বর্গধাম প্রতিষ্ঠা করলেন।


এই পুরুষ-সূক্তটির বিশেষ উল্লেখযোগ্যতা হলো, বেদের টীকাকারের মতে, ঋগ্বেদের অন্য কোনো অংশে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চার জাতির উল্লেখ নেই। এই সূক্তটিকে অপেক্ষাকৃত আধুনিক বলে বিদ্বানেরা অভিমত ব্যক্ত করেন, কেননা ঋগ্বেদ রচনাকালে আর্যদের মধ্যে জাতি বিভাগ ছিলো না। এবং বিশ্বজগতের নিয়ন্তাকে বলিস্বরূপ অর্পণ করার যে অনুভব এটিও ঋগ্বেদের সময়ের নয়, এমনকি ঋগ্বেদে আর কোথাও তা পাওয়া যায় না। তাছাড়া ব্যাকরণবিদ পণ্ডিতদের সুস্পষ্ট অভিমত হলো, এই পুরুষসূক্তের ভাষা বৈদিক ভাষা নয়, অপেক্ষাকৃত আধুনিক সংস্কৃত।
অর্থাৎ, বেদ সংকলনকালীন সময়ে উপনিষদীয় চিন্তাজগত থেকে উদ্ভূত ধারণাই পরবর্তীকালে ঋগ্বেদে অর্বাচীন হিসেবে উভয় সূক্তই সংযোজিত হয়েছে বলেই বেদবিদেরা মনে করেন।

ঋগ্বেদে বাক্-দেবী ছাড়া আর একজন মাত্র দেবীকে নিয়ে পুরো একটি সূক্ত রচিত হয়েছে, সেই দেবী হলেন রাত্রী-দেবী। এটিও বেদের অর্বাচীন অংশে। রাত্রী’র উদ্দেশ্যে রচিত এই সূক্তটি (ঋগ্বেদ-১০/১২৭) হলো-

‘রাত্রী ব্যখ্যদায়তী পুরুত্রা দেব্যক্ষভিঃ। বিশ্বা অধি শ্রিয়োহধিত।। ১
ওর্বপ্রা অমর্ত্যা নিবতো দেব্যুদ্বতঃ। জ্যোতিষা বাধতে তমঃ।। ২
নিরু স্বসারমস্কৃতোষসং দেব্যায়তী। অপেদু হাসতে তমঃ।। ৩
সা নো অদ্য যস্যা বয়ং নি তে যামন্নবিক্ষèহি। বৃক্ষে ন বসতিং বয়ঃ।। ৪
নি গ্রামাসো অবিক্ষত নি পদ্বন্তো নি পক্ষিণঃ। নি শ্যেনাসশ্চিদর্থিনঃ।। ৫
যাবয়া বৃক্যং বৃকং যবয় স্তেনমূর্ম্যে। অথা নঃ সুতরা ভব।। ৬
উপ মা পেপিশত্তমঃ কৃষ্ণং ব্যক্তমস্থিত। উষ ঋণেব যাতয়।। ৭
উপ তে গা ইবাকরং বৃণীষ্ব দুহিতর্দিবঃ। রাত্রি স্তোমং ন জিগ্যুষে’।। ৮
অর্থাৎ :
১। রাত্রিদেবী আগমনপূর্বক চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি নক্ষত্রসমূহের দ্বারা অশেষ প্রকার শোভা সম্পাদন করেছেন।  ২। দেবরূপিণী রাত্রিদেবী অতি বিস্তার লাভ করেছেন, যাঁরা নীচে থাকেন, কি যাঁরা উর্ধ্বে থাকেন, সকলকেই তিনি আচ্ছন্ন করলেন। তিনি আলোকের দ্বারা অন্ধকারকে নষ্ট করেছেন।  ৩। রাত্রিদেবী এসে ঊষাকে আপন ভগিনীর ন্যায় পরিগ্রহ করলেন, তিনি অন্ধকার দূরীভূত করলেন।  ৪। পক্ষীরা যেমন বৃক্ষে বাস গ্রহণ করে, সেরূপ যাঁর আগমনে আমরা শয়ন করেছি, সে রাত্রি আমাদের শুভকরী হোন।  ৫। গ্রামসমূহ নিস্তব্ধ হয়েছে, পাদচারীরা, পক্ষীরা, শীঘ্রগামী শ্যেনগণ, সকলেই নিস্তব্ধ হয়ে শয়ন করেছে।  ৬। হে রাত্রি! বৃকী ও বৃককে আমাদের নিকট হতে দূরে নিয়ে যাও, চোরকে দূরে নিয়ে যাও। আমাদের পক্ষে বিশিষ্টরূপে শুভকরী হও।  ৭। কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকার স্পষ্ট লক্ষ্য হয়ে দেখা দিয়েছে, আমার নিকট পর্যন্ত আচ্ছন্ন করেছে। হে ঊষাদেবি! আমার ঋণকে যেমন পরিশোধপূর্বক নষ্ট কর সেরূপ অন্ধকারকে নষ্ট কর।  ৮। হে আকাশের কন্যা রাত্রি! তুমি যাচ্ছ, তোমাকে গাভীর ন্যায় এ সমস্ত স্তব অর্পণ করলাম, তুমি গ্রহণ কর।


বৈদিক সমাজ যে পুরুষপ্রধান এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই, ফলে বৈদিক সাহিত্যে বৈদিক দেবলোকও পুরুষপ্রধানই হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হচ্ছে-
বস্তুত বৈদিক দেবলোক যে পুরুষপ্রধান- বা ঋগ্বেদে দেবীমাহাত্ম্য যে নেহাতই গৌণ বা অপ্রধান- এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানেরা এত বার এত সুস্পষ্ট মন্তব্য করেছেন যে তার পুনরুল্লেখ প্রায় নিষ্প্রয়োজন। ঋগ্বেদের প্রধানতম দেবতা বলতে ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি ইত্যাদি। সকলেই পুরুষ এবং এই সব পুরুষ দেবতাদের মাহাত্ম্যেই প্রায় সমগ্র ঋগ্বেদ ভরপুর। দেবীরা শুধু যে সংখ্যায় নগন্য তাই নয়, গৌরবেও একান্তই গৌণ। অনেক সময় তাঁদের সত্তাটুকুও সুস্পষ্ট নয়। যেমন ইন্দ্রাণী, বরুণানী প্রভৃতি ‘আনী’-প্রত্যয়যুক্ত দেবীরা ইন্দ্র, বরুণ, প্রভৃতির সঙ্গিনীমাত্র; তাছাড়া তাঁদের আর কোনো পরিচয় নেই। ‘রাত্রী’ ও ‘বাক্’-এর উদ্দেশ্যে একটি করে পুরো সূক্ত থাকলেও উভয় সূক্তই ঋগ্বেদের অর্বাচীন অংশভুক্ত এবং দেবী হিসেবে উল্লিখিত হলেও এঁদের সত্তা অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট। পুরমধি, ধীষণা এবং ইলা সম্বন্ধেও একই কথা, যদিও দেবী হিসেবে এঁদের পরিচয় আরও অস্পষ্ট। অবশ্য ঋগ্বেদের পঞ্চম মণ্ডলেও পৃথিবীর উদ্দেশ্যে একটি সংক্ষিপ্ত সুক্ত পাওয়া যায়; কিন্তু অন্যত্র কোথাওই তাঁর পরিচয় দেবতা দ্যৌ নিরপেক্ষ নয়। এ-ছাড়া বৃহদ্দিবা, রাকা প্রভৃতি দেবীরা ঋগ্বেদে এমনই নগন্য স্থান অধিকার করেছেন যে তাঁদের কথা স্বতন্ত্রভাবে আলোচনাই নিষ্প্রয়োজন।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৬)

উদাহরণস্বরূপ, ঋগ্বেদে ইন্দ্রাণী, বরুণানী প্রভৃতি দেবপত্নীদের উদ্দেশ্যে রচিত ঋক যেমন-

‘আ গ্না অগ্ন ইহাবসে হোত্রাং যবিষ্ট ভরতীম্ । বরূত্রীং ধিষণাং বহ’।। (ঋগ্বেদ-১/২২/১০)
‘ইহেন্দ্রাণীমুপ হ্বয়ে বরুণানীং স্বস্তয়ে। অগ্নায়ীং সোমপীতয়ে।। (ঋগ্বেদ-১/২২/১২)
‘উত গ্না ব্যশ্তু দেবপত্নীরিন্দ্রাণ্যগ্নায্যশ্বিনী রাট্ ।
আরোদসী বরুণানী শৃণোতু ব্যন্তু দেবীর্য ঋতুর্জনীনাম্’।। (ঋগ্বেদ-৫/৪৬/৮)
অর্থাৎ :
হে অগ্নি! আমাদের রক্ষার্থে দেবপত্নীদের এ যজ্ঞে আন। হে যবিষ্ঠ! হোত্রা, ভারতী ও বরণীয়া ধিষণাকে আন (ঋক-১/২২/১০)।  আমাদের মঙ্গলের নিমিত্ত সোমপানার্থে ইন্দ্রাণী, বরুণানী ও অগ্নায়ীকে আহ্বান করি (ঋক-১/২২/১২)।  দেবগণের ভার্যা, দেবীগণ হব্য ভোজন করুন। ইন্দ্রাণী, অগ্নায়ী, দীপ্তিমতী অশ্বিনী, রোদসী, বরুণানী এঁরা প্রত্যেকে আমাদের স্তোত্র শুনুন। দেবীগণ হব্য ভোজন করুন; দেবপত্নীগণের মধ্যে যারা ঋতু সকলের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা তারা স্তোত্র শ্রবণ ও হব্য ভক্ষণ করুন (ঋক-৫/৪৬/৮)।

এবং পৃথিবীর উদ্দেশ্যে ঋগ্বেদের সংক্ষিপ্ত সূক্তটি (ঋগ্বেদ-৫/৮৪) হলো-

‘বলিত্থা পর্বতানাং খিদ্রং বিভর্ষি পৃথিবি।
প্র যা ভূমিং প্রবত্বতি মহ্না জিনোষি মহিনি।। ১
স্তোমাসস্ত্বা বিচারিণি প্রতি ষ্টোভন্ত্যক্তুভিঃ।
প্র যা বাজং ন হেষন্তং পেরুমস্যস্যর্জুনি।। ২
দৃড়্হা চিদ্যা বনস্পতীন্ ক্ষয়া দর্ধর্য্যােজসা।
যত্তে অভ্রস্য বিদ্যুতো দিবি বর্ষন্তি বৃষ্টয়ঃ’।। ৩
অর্থাৎ :
১। হে পৃথিবী! ফলতঃ এস্থলে তুমি পর্বত সকলের খণ্ড ধারণ করছ। তুমি বলশালী ও শ্রেষ্ঠ কারণ তুমি মাহাত্ম্যদ্বারা পৃথিবীর প্রীতি বিধান কর।  ২। হে বিচিত্রগমনশালিনী পৃথিবী! স্তোতৃবর্গ গমনশীল স্তোত্রদ্বারা তোমার স্তব করেন। হে অর্জুনি! তুমি শব্দায়মান অশ্বের ন্যায় বারিপূর্ণ মেঘকে উৎক্ষিপ্ত কর।  ৩। যে সময় দীপ্তিশালী অন্তরীক্ষ হতে তোমার মেঘের বৃষ্টি পতিত হয়, সে সময় তুমি দৃঢ় পৃথিবীর সাথে বৃক্ষ সকলকে বলপূর্বক ধারণ করে রাখ।


এখানে উল্লেখ্য যে, বেদের ব্যাখ্যাকার সায়ণাচার্য এই সূক্তে উল্লিখিত পৃথিবী শব্দের অর্থ করেছেন অন্তরীক্ষ। এই সূক্তটি ছাড়া ঋগ্বেদের অন্যত্র ছয়টি সূক্তে দেবী পৃথিবী মহান দেবতা দ্যৌ-এর সাথে সম্পর্কিত। পৃথিবী ‘অবম’ অর্থাৎ সর্বনিম্ন লোক এবং দ্যৌ পরম বা সর্বোচ্চ লোক। ঋগ্বেদে তাঁরা দুজন বিশ্বের পিতামাতা রূপে কল্পিত। দ্যৌ-এর সাথে সম্পর্কিত হয়ে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে রচিত কিছু ঋক যেমন-

‘মহী দ্যৌঃ পৃথিবী চ ন ইমং যজ্ঞং মিমিক্ষতাম্ । পিপৃতাং নো ভরীমভিঃ’।। (ঋক-১/২২/১৩)
‘তয়োরিদ্ধৃতবৎপয়ো বিপ্রা রিহন্তি ধীতিভিঃ। গন্ধর্বসা ধ্রুবে পদে’।। (ঋক-১/২২/১৪)
অর্থাৎ :
মহৎ দ্যৌ ও পৃথিবী আমাদের এ যজ্ঞ রসে সিক্ত করুন এবং পুষ্টি দ্বারা আমাদের পূর্ণ করুন (ঋক-১/২২/১৩)।  মেধাবীরা নিজ কর্মগুণে সে দ্যৌ ও পৃথিবীর মধ্যে গন্ধর্বের নিবাস স্থানে অর্থাৎ অন্তরীক্ষে ঘৃতবৎ জল লেহন করেন (ঋক-১/২২/১৪)।


তবে ঋগ্বেদে প্রকৃত উল্লেখযোগ্য দেবী বলতে অদিতি এবং ঊষা। অদিতির উদ্দেশ্যে কোনো স্বতন্ত্র সূক্ত না থাকলেও ঋগ্বেদে তাঁর নাম অন্তত ৮০ বার উল্লিখিত হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রায় সর্বত্রই তিনি আদিত্যদের সঙ্গে এবং আদিত্যজননী হিসেবেই উল্লিখিত; স্বতন্ত্রভাবে তাঁর কথা মাত্র দু-একবারই পাওয়া যায়। যেমন-

‘ইমা গির আদিত্যেভ্যো ঘৃতস্নুঃ সনাদ্রাজভ্যো জুহ্বা জুহোমি।
শৃণোতু মিত্রো অর্যমা ভগো নস্তুবিজাতো বরুণো দক্ষো অংশঃ’।। (ঋক-২/২৭/১)
‘পিপর্তু অদিতী রাজপুত্রাতি দ্বেষাংস্যর্যমা সুগেভিঃ।
বৃহন্মিত্রস্য বরুণস্য শর্মোপ স্যাম পুরুবীরা অরিষ্টাঃ’।। (ঋক-২/২৭/৭)
অর্থাৎ :
আমি জুহুদ্বারা সর্বদা শোভমান আদিত্যগণের উদ্দেশে ঘৃতস্রাবী স্তুতি অর্পণ করছি। মিত্র, অর্যমা, ভগ, বহুব্যাপী বরুণ, দক্ষ ও অংশ আমার স্তুতি শুনুন (ঋক-২/২৭/১)।  রাজমাতা অদিতি শত্রুগণকে অতিক্রম করে আমাদের অন্যদেশে নিয়ে যান, অর্যমা সুগমপথে আমাদের নিয়ে যান। আমরা বহুবীরবিশিষ্ট এবং হিংসারহিত হয়ে মিত্র ও বরুণের সুখ লাভ করব (ঋক-২/২৭/৭)।


আদিত্য নামের দেবগোষ্ঠির তালিকা ঋগ্বেদে সর্বত্র অভিন্ন নয়, কোথাও ছয়, কোথাও সাত আবার কোথাও আটজন আদিত্যের উল্লেখ রয়েছে। তবে মিত্র বরুণ প্রভৃতি প্রাচীন দেবতারা তার অন্তর্ভুক্ত। এমনকি ইন্দ্রও কখনো কখনো আদিত্য বলে উল্লিখিত হয়েছেন। যেমন-

‘আপশ্চিদ্ধি স্বযশসঃ সদঃসু দেবীরিন্দ্রং বরুণং দেবতা ধুঃ।
কৃষ্টীরন্যো ধারয়তি প্রবিক্তা বৃত্রাণ্যন্যো অপ্রতীনি হন্তি’।। (ঋক-৭/৮৫/৩)
‘স সুক্রতুর্ঋতচিদস্তু হোতা য আদিত্য শবসা বাং নমস্বান্ ।
আববর্তদবসে বাং হবিষ্মানসদিৎস সুবিতায় প্রযস্বান্’।। (ঋক-৭/৮৫/৪)
অর্থাৎ :
সোম সকল আয়ত্ত, যশোবিশিষ্ট ও দ্যুতিমান হয়ে সদনে ইন্দ্র ও বরুণ এ উভয় দেবতাকে ধারণ করেন। এঁদের একজন প্রজাগণকে পৃথক পৃথক করে ধারণ করেন, অন্যজন অপ্রতিগত শত্রুগণকে বিনাশ করেন (ঋক-৭/৮৫/৩)।  হে আদিত্যদ্বয়! তোমরা বলশালী, যে নমস্কারযুক্ত হয়ে তোমাদের পরিচর্যা করে, সে শোভনকর্মবিশিষ্ট হোতা ঋতজ্ঞ হোন। যে হব্যযুক্ত ব্যক্তি তৃপ্তির জন্য তোমাদের আবর্তিত করে, সে অন্নবান হয়ে একান্ত প্রাপ্তব্য ফল লাভ করে (ঋক-৭/৮৫/৪)।


অতএব ওই দেবজননী অদিতিকে অত্যন্ত প্রাচীনই বলতে হবে। দেবীপ্রসাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৭), ‘হয়তো খুব সুপ্রাচীন কালে– অর্থাৎ ঋগ্বেদের প্রাচীনতর অংশ রচিত হবারও আগে, প্রাচীনতম কবিদের সুদূর স্মৃতিতে– এই আদি-জননীর কথা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন গৌরবে প্রতিষ্ঠিত ছিলো।  কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঋগ্বেদের রচনাকালেই তা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কেননা, বৈদিক কবিদের একান্ত পুরুষ-প্রধান ধ্যানলোকে এই আদি-জননীর গৌরব বহুলাংশেই ক্ষুণ্ন ও খর্ব হয়েছে। তাই আদিত্যেদের কথা বাদ দিয়ে তাঁর স্বতন্ত্র উল্লেখ একান্তই দুর্লভ। শুধু তাই নয়, ঋগ্বেদের বর্ণনা অনুসারে দেবী অদিতি বারবার ইন্দ্রের স্তুতিতে নিযুক্ত।’ যেমন-

‘বৃষ্ণে যত্তে বৃষণো অর্কমর্চানিন্দ্র গ্রাবাণো অদিতিঃ সজোষাঃ।
অনশ্বাসো যে পবয়োহরথা ইন্দ্রেষিতা অভ্যবর্তন্ত দস্যূন্’।। (ঋক-৫/৩১/৫)
অর্থাৎ :
হে ইন্দ্র! তুমি অভীষ্টবর্ষী; যখন কল্যাণবর্ষী অদিতি স্তবদ্বারা তোমার পূজা করেছিলেন এবং পাষাণ সকল সোমচূর্ণ করতে আনন্দিত হয়েছিল তখন অশ্বহীন ও রথহীন ইন্দ্র প্রেরিত আদিত্য মরুতগণ গিয়ে দস্যুদের পরাজিত করেছিলেন (ঋক-৫/৩১/৫)।


অতএব, অদিতির আদি-গৌরব সংক্রান্ত যে-কথাই কল্পনা করা হোক না কেন, তাঁর নজির থেকে অন্তত ঋগ্বেদের যুগে কোন রকম দেবী প্রাধান্য প্রমাণ হয় না।
বাকি থাকে ঊষার কথা। ঋগ্বেদের অন্তত ২০টি সূক্ত তাঁর স্তুতিতে রচিত এবং তাঁর উল্লেখ রয়েছে ৩০০ বারেরও বেশি। অতএব ঊষাকে কোনভাবেই অপ্রধানা বা তুচ্ছ মনে করবার কোন কারণ নেই। উদাহরণস্বরূপ, ঊষাস্তুতির অন্যতম একটি সূক্ত (ঋগ্বেদ-৫/৮০) যেমন-

‘দ্যুতদ্যামানং বৃহতীমৃতেন ঋতাবরীমরুণপ্সুং বিভাতীম্ ।
দেবীমুষসং স্বরাবহন্তীং প্রতি বিপ্রাসো মতিভি র্জরন্তে।। ১
এষা জনং দর্শতা বোধয়ন্তী সুগান্ পথঃ কৃণ্বতি যাত্যগ্রে।
বৃহদ্রথা বৃহতী বিশ্বমিন্বোষা জ্যোতির্যচ্ছত্যগ্রে অহ্নাম্ ।। ২
এষা গোভিররুণেভির্যুজানা স্রেধন্তী রয়িমপ্রায়ু চক্রে।
পথো রদন্তি সুবিতায় দেবী পুরুষ্টুতা বিশ্ববারা বি ভাতি।। ৩
এষা ব্যেনী ভবতি দ্বিবর্হা আবিষ্কৃণ্বানা তন্বং পুরস্তাৎ।
ঋতস্য পন্থামন্বেতি সাধু প্রজানতীব ন দিশো মিনাতি।। ৪
এষা শুভ্রা ন তন্বো বিদানোর্ধ্বেব স্নাতী দৃশয়ে নো অস্থাৎ।
অপ দ্বেষো বাধমানা তমাংস্যুষা দিবো দুহিতা জ্যোতিষাগাৎ।। ৫
এষা প্রতীচী দুহিতা দিবো নৃন্যোষেব ভদ্রা নি রিণীতে অপ্সঃ।
ব্যূর্ণ্বতী দাশুষে বার্যাণি পুনর্জ্যােতি র্যুবতিঃ পূর্বথাকঃ’।। ৬
অর্থাৎ :
১। জ্ঞানী ঋত্বিকগণ স্তোত্রদ্বারা সমুজ্জ্বল রথে আরূঢ়া, সর্বব্যাপিনী, যজ্ঞে সম্যক পূজিতা, অরুণবর্ণা, সূর্যের পুরোবর্তিনী, দীপ্তিমতী ঊষার স্তব করছেন।  ২। মনোহারিণী ঊষা মনুষ্যকে প্রবোধিত ও পথ সকল সুগম করে আরোহণপূর্বক সূর্যের অগ্রে যাচ্ছেন। মহতী বিশ্বব্যাপিনী ঊষা দিবসের আরম্ভে দীপ্তি বিস্তার করেছেন।  ৩। রথে অরুণবর্ণ বলীবর্দ যোজনা করে তিনি অবিশ্রান্ত ধন সকল অবিচলিত করছেন। সর্বপূজিত, বিশ্ববাঞ্ছিত, দীপ্তিমতী ঊষা সন্মার্গ সকল প্রকাশিত করে বিরাজ করছেন।  ৪। দু প্রদেশে অর্থাৎ উর্ধ্ব ও মধ্য অন্তরীক্ষে অবস্থান করে এবং পূর্বদিক হতে নিজমূর্তি প্রকাশিত করে নিরতিশয় শুভ্রাকৃতি ঊষা সম্প্রতি ব্রহ্মাণ্ডকে প্রবোধিত করে সম্যকরূপে আদিত্যের অনুসরণ করছেন এবং দিক সকলের কোন হিংসা করছেন না।  ৫। তিনি সুবেশা রমণীর ন্যায় নিজ মূর্তি প্রকাশিত করে এবং যেন স্নান হতে উত্থিত হয়ে আমাদের নেত্র সমীপে উদিত হচ্ছেন। স্বর্গ কন্যা ঊষা দ্বেষভাজন তমোরাশি বিদূরিত করে দীপ্তিসহকারে আসছেন।  ৬। স্বর্গ কন্যা ঊষা পশ্চিমাভিমুখী হয়ে হব্যদাতাকে বাঞ্ছিত ধন প্রদানপূর্বক সুবেশা কামিনীর ন্যায় নিজ সৌন্দর্য বিস্তার করছেন। স্থিরযৌবনা ঊষা পূর্বকালের ন্যায় নিজ-দীপ্তি প্রকাশ করছেন।


এই সূক্তে ঊষাদেবীর আকর্ষণীয় ও মনোহারিনী রূপ ও গুণের স্তুতিই প্রকাশ পায়। ঊষার উদ্দেশে এরকম আরো বেশ কিছু স্তুতি-সূক্ত ঋগ্বেদে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁর নজির থেকে মাতৃ-উপাসনার প্রতি ঠিক কোন্ বৈদিক মনোভাব প্রমাণিত হয়?
উত্তরে কোশাম্বী অত্যন্ত বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছেন : ঊষা অবশ্যই মাতৃদেবী, কিন্তু তাঁর স্থান প্রকৃত বৈদিক দেবলোকে নয়- বরং তাঁকে বৈদিক মানুষ বিধ্বস্ত সিন্ধু-সভ্যতার মাতৃদেবী বলেই সনাক্ত করতে হবে।’ ‘প্রমাণ কী? চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায় ঋগ্বেদের চতুর্থ মণ্ডলের একটি সূক্তে।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৭)

এখানে যে সূক্তটির কথা বলা হচ্ছে সেটি প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্ববহ সূক্ত। বেশ দীর্ঘ এই সূক্তটি ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে এবং ইন্দ্রের মহিমা বর্ণনায় রচিত হলেও ইতিহাস ও নৃতত্ত্ববিদদের বিবেচনায় সূক্তটি খুবই তাৎপর্যময়, কেননা এটি অনার্য অসুরদের সাথে আর্যশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রের বীরত্ববাহী যুদ্ধের কিছু অপার কৌতুহলোদ্দীপক কীর্তি-সমৃদ্ধ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূক্ত (ঋগ্বেদ-৪/৩০)-

‘নকিরিন্দ্র ত্বদুত্তরো ন জ্যাযাঁ অস্তি বৃত্রহন্ । নাকিরেবা যথা ত্বম্ ।। ১
সত্রা তে অনু কৃষ্টয়ো বিশ্বা চক্রেব বাবৃতুঃ। সত্রা মহাঁ অসি শ্রূতঃ।। ২
বিশ্বে চনেদনা ত্বা দেবাস ইন্দ্র যূযুধুঃ। যদহা নক্তমাতিরঃ।। ৩
যত্রোত বাধিতেভ্যশ্চক্রং কুৎসায় যুধ্যতে। মুষায় ইন্দ্র সূর্যম্ ।। ৪
বত্র দেবাঁ ঋৃঘায়তো বিশ্বা অযুধ্য এক ইৎ। ত্বমিন্দ্র বনূঁরহন্ ।। ৫
যত্রোত মর্ত্যায় কমরিণা ইন্দ্র সূর্যম্ । প্রাবঃ শচীভিরেতশম্ ।। ৬
কিমাদুতাসি বৃত্রহন্মঘন্নন্যুমত্তমঃ। অত্রাহ দানুমাতিরঃ।। ৭
এতৎ ঘেদুত বীর্যমিন্দ্র চকর্থ পৌংস্যম্ ।
স্ত্রিয়ং যদ্দুর্হণায়ুবং বধীর্দুহিতরং দিবঃ।। ৮
দিবশ্চিদঘা দুহিতরং মহান্মহীয়মানাম্ । ঊষাসমিন্দ্র সং পিণক্ ।। ৯
অপোষা অনসঃ সরৎ সংপিষ্টাদহ বিভ্যুষী। নি যৎসীং শিশ্নথদ্বৃষা।। ১০
এতদস্যা অনঃ শয়ে সুসংপিষ্টং বিপাশ্যা। সসার সীং পরাবতঃ।। ১১
উত সিংধুং বিবাল্যং বিতস্থানামধি ক্ষমি। পরিষ্ঠা ইন্দ্র মায়য়া।। ১২
উত শুষ্ণস্য ধৃষ্ণুয়া প্র মুক্ষ্যে অভি বেদনম্ । পুরো যদস্য সংপিণক্ ।। ১৩
উত দাসং কৌলিতরং বৃহতঃ পর্বতাদধি। অবাহন্নিন্দ্র শম্বরম্ ।। ১৪
উত দাসস্য বর্চিনঃ সহস্রাণি শতাবধীঃ। অধি পঞ্চ প্রধীঁরিব।। ১৫
উত ত্যং পুত্রমগ্রুবঃ পরাবৃক্তং শত্রক্রুতুঃ। উকথেষ্বিন্দ্র আভজৎ।। ১৬
উত ত্যা তুর্বশায়দু অস্নাতারা শচীপতিঃ। ইন্দ্রো বিদ্বাঁ অপারয়ৎ।। ১৭
উত ত্যা সদ্য আর্যা সরয়োরিন্দ্র পারতঃ। অর্ণাচিত্ররথাবধীঃ।। ১৮
অনু দ্বা জহিতা নয়োহন্ধং শ্রোণং চ বৃত্রহন্ । ন তত্তে সুম্নমষ্টবে।। ১৯
শতমশ্মন্ময়ীনাং পুরামিন্দ্রো ব্যাস্যৎ। দিবোদাসায় দাশুষে।। ২০
অস্বাপয়দ্দভীতয়ে সহস্রা ত্রিংশতং হথৈঃ। দাসানামিন্দ্রো মায়য়া।। ২১
স ঘেদুতাসি বৃত্রহন্ত্সমান ইন্দ্র গোপতিঃ। যস্তা বিশ্বানি চিচ্যুষে।। ২২
উত নূনং যদিন্দ্রিয়ং করিষ্যা ইন্দ্র পৌংস্যং। অদ্য নকিষ্টদা মিনৎ।। ২৩
বামং বামং ত আদুরে দেবো দদাত্বর্ষমা।
বামং পূষা বামং ভগো বামং দেবঃ করূলতী।। ২৪
অর্থাৎ :
১। হে বৃত্রনাশক ইন্দ্র! তোমার চেয়ে উৎকৃষ্টতর কেউ নাই, তোমার চেয়ে প্রশস্যতর কেউ নাই, তুমি যেরূপ সেরূপ কেউই নয়।  ২। হে ইন্দ্র! সমস্ত চক্র যেভাবে শকটকে অনুবর্তন করে, সেভাবে লোকে তোমাকে অনুবর্তন করে। তুমি সত্যই মহান ও প্রখ্যাত।  ৩। হে ইন্দ্র! সমস্ত দেবগণ তোমাকে বলস্বরূপে গ্রহণ করে যুদ্ধ করেছিল। যেহেতু তুমি দিবারাত্রি শত্রুগণকে বধ করছিলে।  ৪। হে ইন্দ্র! যে যুদ্ধে তুমি যুদ্ধকারী কুৎস এবং তার সহকারিগণের জন্য সূর্যের রথচক্র অপহরণ করেছিলে।  ৫। হে ইন্দ্র! যে যুদ্ধে তুমি একাকী দেবগণের বাধাকারী সকলের সাথে যুদ্ধ করেছিলে এবং হিংসকদের বধ করেছিলে।  ৬। হে ইন্দ্র! যে যুদ্ধে তুমি মনুষ্যের জন্য সূর্যকে হিংসা করেছিলে এবং যুদ্ধ কর্ম দ্বারা এতশকে রক্ষা করেছিলে।  ৭। হে বৃত্রহন্তা মঘবা! তারপরে তুমি কি অন্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলে? তুমি এ অন্তরীক্ষে দিবসেই দনুর পুত্রকে বধ করেছিলে।  ৮। হে ইন্দ্র! তুমি যে বীর্য ও বল প্রদর্শন করেছিলে, তার দ্বারা দ্যুলোকের দুহিতা দুষ্ট হননাভিলাষিণী স্ত্রীকে (ঊষাকে) বধ করেছিলে।  ৯। হে মহান ইন্দ্র! তুমি দ্যৌ বা দ্যুলোকের কন্যা সকলের পুজনীয় ঊষাকে সংপিষ্ট করেছিলে।  ১০। অভীষ্টবর্ষী বৃষরূপ ইন্দ্র যখন উষাকে শিশ্নপ্রয়োগে পিষ্ট করেছিলেন, তখন ভীতা উষা ভগ্ন শকটের নিকট থেকে পলায়ন করলেন।  ১১। সেই উষা চূর্ণীকৃত শকট হতে পলায়ন করে বিপাশা নদীর তীরে শয়ন করলেন।  ১২। এবং সম্পূর্ণজলা সিন্ধুর চারদিকের মাটিতে ইন্দ্র মায়ার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন।  ১৩।  আরও, হে ধর্ষণকারী ইন্দ্র! তুমি শুষ্ণের ধন চারদিক থেকে অবরুদ্ধ ও লুণ্ঠন করেছিলে, তার নগরগুলি ধ্বংস করেছিলে।  ১৪। আরও, হে ইন্দ্র! তুমি কুলিতরের অপত্য দাস শম্বরকে (জনৈক অসুরকে : সায়ণ) বৃহৎ পর্বতের উপর পরাজিত করে নিহত করেছিলে।  ১৫। আরও, হে ইন্দ্র! চক্রের চতুর্দিকস্থিত শঙ্কুর ন্যায় দাস বর্চির (জনৈক অসুরের : সায়ণ) চতুর্দিকস্থিত পাঁচশত এবং শতসহস্র অনুচরদেরকে সম্পূর্ণরূপে বধ করেছিলে।  ১৬। আরও, শতক্রতু ইন্দ্র সে অগ্রুর পুত্র পরাবৃত্তকে স্তোত্রভাগী করেছিলে।  ১৭। যজ্ঞপতি বিদ্বান ইন্দ্র অনভিষিক্ত সে তুর্বশ ও যদুকে অভিষেকের যোগ্য করেছিলে।  ১৮। হে ইন্দ্র! তুমি তৎক্ষণাৎ সরযু নদীর (সরযু পাঞ্জাবের এক নদী, আধুনিক সরযু নয়) পারে আর্য অর্ণ ও চিত্ররথকে বধ করেছিলে।  ১৯। হে বৃত্রহন্তা! তুমি বন্ধুগণ কর্তৃক ত্যক্ত অন্ধ ও পঙ্গুকে অনুনীত করেছিলে, তোমার দত্ত সুখ কেউ অতিক্রম করতে সমর্থ নয়।  ২০। ইন্দ্র শম্বরের প্রস্তরনির্মিত শত সংখ্যক পুরী হব্যদাতা দিবোদাসকে প্রদান করেছিলেন।  ২১। ইন্দ্র, দভীতিতির জন্য মায়াবলে ত্রিশ সহস্র সংখ্যক দাসকে হনন করেছিলেন।  ২২। হে ইন্দ্র! তুমি এ সমস্ত শত্রুদের বিনাশ করেছ। হে বৃত্রহন্তা! তুমি গাভী সকলের পালক, তুমি সকল যজমানের নিকট সমান।  ২৩। হে ইন্দ্র! যেহেতু তুমি তোমার বলকে সামর্থ্যযুক্ত করেছিলে, অতএব অধুনাতন কোনও ব্যক্তি একে হিংসা করতে পারে না।  ২৪। হে শত্রুবিনাশক ইন্দ্র! অর্যমাদেব তোমার সে মনোহর ধন দান করুন, পূষা সে মনোহর ধন দান করুন, ভগ সে মনোহর ধন দান করুন। করুলতী দেব সে মনোহর ধন দান করুন।


এই সূক্তটির উল্লেখযোগ্যতা হলো, এখানে ইন্দ্রের কীর্তি হিসেবে (৮, ৯, ১০ ও ১১ ঋকে) বলা হচ্ছে, ইন্দ্র ঊষার শকট চূর্ণ করছেন, ঊষাকে শিশ্নপ্রয়োগ অর্থাৎ ধর্ষণ করছেন, এবং ভীতা ঊষা ভয়ে বিপাশার তীরে পলায়ন করছেন। কিন্তু ঊষা যদি বৈদিক দেবলোকের মাতৃদেবীই হয়ে থাকেন তাহলে ঊষার উপর ইন্দ্রের এই আক্রমণ কেন? আলোচ্য সূক্তটিতে তার কোনো সুস্পষ্ট কারণ নির্দিষ্ট হয়নি। তবে ঊষার উপর ইন্দ্রের এই আক্রমণ কোথায় ঘটেছিলো সে-বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় পরবর্তী ঋকগুলিতে। সিন্ধু এবং তার আশপাশ অঞ্চলে ইন্দ্র মায়া ও বীর্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কারণ সিন্ধু, বিপাশা বা পাঞ্জাবের সরযুর শুধু উল্লেখই নয়, শম্বর নামক অনার্য অসুরকে হত্যা করা, প্রস্তরনির্মিত একশত নগর দিবোদাসকে দান করা, শুষ্ণকে পরাজিত করা প্রভৃতির বিবরণও এই সূক্তেই পাওয়া যায়। আধুনিক বিদ্বানেরা ঋগ্বেদের এ-জাতীয় সাক্ষ্য থেকেই আর্য-আক্রমণে সিন্ধু-সভ্যতা ধ্বংস হওয়ার কথা অনুমান করেছেন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, একই সূক্তে ঊষার উপর ইন্দ্রের আক্রমণ বর্ণনা।

অপরপক্ষে এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ঊষা ছিলেন কোনো এক পূজনীয়া প্রাচীন মাতৃদেবী। কিন্তু কাদের মাতৃদেবী? তাঁর প্রতি ইন্দ্রের ওই আক্রোশ থেকে স্বভাবতই অনুমান হয়, ঊষা বৈদিক মানুষদের মাতৃদেবী নন- ‘এর একমাত্র ব্যাখ্যা হল ধর্মবিশ্বাসের সংঘাত- বিপাশা নদীর তীরে পুরুষ-প্রধান আক্রমণকারীদের যুদ্ধদেবতা ইন্দ্র প্রাচীন মাতৃদেবীকে ধ্বংস করছেন।
তাছাড়া ইন্দ্রের পক্ষে ঊষার উপর আক্রমণ যে অস্বাভাবিক উৎসাহের পরিচায়ক নয় তার অনুমান হয় ঋগ্বেদে বারবার তার বর্ণনা থেকে। যেমন-

‘সোদঞ্চং সিন্ধুমরিণান্মহিত্বা বজ্রেগান উষসঃ সং পিপেষ।
অৎবসো জবিনীভির্বিবৃশ্চন্ত সোমস্য তা মদ ইন্দ্রশ্চকার’।। (ঋক-২/১৫/৬)
‘সনামানা চিদ্ধোসয়ো ন্যস্মা অবাহন্নিন্দ্র উষসো যথানঃ।
ঋৃষ্বৈরগচ্ছঃ সখিভির্নিকামৈঃ সাকং প্রতিষ্ঠা হৃদ্যা জঘন্থ’।। (ঋক-১০/৭৩/৬)
অর্থাৎ :
ইন্দ্র নিজ শক্তি মহিমায় সিন্ধুকে উত্তরদিকে অবস্থিত করেছিলেন, বেগবান সেনাদ্বারা দুর্বল সেনা ভেদ করে বজ্রের দ্বারা ঊষার শকট পিষ্ট করেছিলেন। সোমজনিত হর্ষ উপস্থিত হলে ইন্দ্র এ সকল কর্ম করেছিলেন (ঋক-২/১৫/৬)।  ইন্দ্র যেমন ঊষার শকট ধ্বংস করেছিলেন সেইরূপ তুল্যনামধারী শত্রু ধ্বংস করেন। উৎসাহযুক্ত ও মহাবল পরাক্রান্ত বন্ধুস্বরূপ মরুৎগণের সাথে তিনি বিপক্ষের উত্তম উত্তম আবাস স্থান ধ্বংস করলেন (ঋক-১০/৭৩/৬)।


নিঃসন্দেহে সিন্ধু-সভ্যতার ধর্মবিশ্বাস মাতৃ-প্রধান, অন্যদিকে বৈদিক ধর্মবিশ্বাস পুরুষপ্রধান। ‘তাই বৈদিক দেবলোকে দেবী-মাহাত্ম্য নেহাতই গৌণ- দেবীরা সংখ্যায় নগন্য, গৌরবে অকিঞ্চিৎ। এ মন্তব্যে একমাত্র আপাত ব্যতিক্রম প্রাচীন পূজনীয়া ঊষা। কিন্তু তাঁর নজির থেকেও বৈদিক ধর্মবিশ্বাসে কোনোরকম দেবী-মাহাত্ম্য নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয় না। কেন না এ বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই যে ঋগ্বেদের অন্তত স্থান বিশেষে পুরুষ প্রধান-বৈদিক দেবলোকের নায়ক ইন্দ্র ওই ঊষাকে আক্রমণ ও বিধ্বস্ত করছেন এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য থেকে অনুমিত হয় এক্ষেত্রে ঊষা হলেন প্রাচীন সিন্ধু-সভ্যতার মাতৃদেবীই। অতএব অনুমান হয়, সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলি যেমন বৈদিক আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছিল সম্ভবত সেই ভাবেই পুরুষ-প্রধান ধর্মবিশ্বাসের পক্ষ থেকে সিন্ধু-সভ্যতার প্রাচীন মাতৃপ্রধান ধর্মবিশ্বাসকে ধূলিস্যাৎ করার আয়োজন হয়েছিল। বৈদিক কবিদের কল্পনায় তাই ইন্দ্র-আক্রমণে ঊষার শকট চূর্ণ হচ্ছে এবং ভীতা ঊষা বিপাশার তীরে পলায়ন করছেন।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৯)

তাছাড়া আরেকটি সংশয় এখানে অমূলক হবে কিনা জানি না, কেননা কোন বিদ্বানকেই এযাবৎ এই তীর্যক পর্যবেক্ষণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে দেখা যায়নি। সেটি হলো, ঊষাকে নিয়ে ঋগ্বেদেই বিপরীতমুখী দুই দৃষ্টিভঙ্গি। একদিকে যুদ্ধবাজ ইন্দ্র কর্তৃক সিন্ধু-ধারণার মাতৃদেবী ঊষা আক্রান্ত ও সংপিষ্ট হওয়া, অন্যদিকে বৈদিক কবিকল্পনায় দেবলোক কন্যা হিসেবে ঊষার মনোহারী রূপ ও গুণ প্রকাশক বিভিন্ন স্তুতিসূক্ত। এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে? তবে কি ঊষা হচ্ছেন প্রাচীন সেই মাতৃদেবী কিংবা অনার্য সিন্ধু-কন্যার প্রতীকী বা জাতি-নাম? যাঁরা কিনা যুদ্ধবাজ বৈদিক আর্য শিকারি কর্তৃক আক্রান্ত সংপিষ্ট ও বন্দীত্ব বরণের মাধ্যমে বীর-ভোগ্যা দেব-ভোগ্যা অপ্সরাসদৃশ কোন মনোলোভী দেবীর প্রাধান্যহীন মহিমায় বৈদিক কবিকল্পনায় আরোপিত হয়েছেন?

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : সিন্ধু-সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস- শক্তি সাধনা] [*] [পরের পর্ব : প্রকৃতি উপাসনা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 214,160 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 88 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: