h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৫ : সিন্ধু-সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস- শক্তি সাধনা|

Posted on: 03/07/2015


11403278_10153011642277843_5391545931654713716_n

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৫ : সিন্ধু-সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস- শক্তি সাধনা|
রণদীপম বসু

২.৭ : সিন্ধু-সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস

সিন্ধু সভ্যতার পরিকল্পিত নাগরিক জীবন থেকে প্রমাণ হয় এখানে একটি দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো। আবিষ্কৃত সীলগুলো প্রমাণ করে রাজ্য পরিচালনায় শাসক রাজা ছিলেন প্রধান। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে মন্দির বা উপাসনা গৃহের অনুপস্থিতি, লিপি পাঠোদ্ধার না হওয়ায় সিন্ধু সভ্যতার ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না।


এখানে উল্লেখ্য, সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ন-নিদর্শন হিসেবে আবিষ্কৃত ২৫০০ টি সীলে যে চিত্রধর্মী লিপি পাওয়া গেছে, এ লিপির সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করা আজও সম্ভব হয়নি।
সর্বপ্রথম স্বরূপবিষ্ণু নামের একজন গবেষক ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধুলিপি পাঠের চেষ্টা করেন। পরে অনেকেই এ চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু খুব একটা সাফল্য আসেনি। অনেকের মতে দ্রাবিড় ভাষা থেকে সিন্ধুলিপির উদ্ভব। কেউ কেউ সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। তবে কোনটি নিশ্চিত করার উপায় নেই। এদিক থেকে কিছুটা চেষ্টা নিয়েছিলেন একজন রুশ পণ্ডিত। তিনি প্রথম কম্পিউটারে সিন্ধুলিপির চিহ্নগুলো শ্রেণীবদ্ধ করেন। এরপরে সংস্কৃত ও দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেন। সবশেষে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে সিন্ধু লিপির সঙ্গে দ্রাবিড় ভাষার ঘনিষ্ঠতাই বেশি। আবার অনেক পণ্ডিত মিশরের হায়ারোগ্লিফিক এবং মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম-এর সঙ্গে এই লিপির কিছুটা সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তবে এসব মতের কোনটাই তেমনভাবে প্রমাণিত নয়।’
‘সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে মিশর বা মেমোপটেমিয়া লিপির মতো প্যাপিরাস বা শিলায় সিন্ধু লিপি লাইনের পর লাইন লিখিতভাবে পাওয়া যায়নি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু সীলে সামান্য বর্ণবিন্যাস রয়েছে। তাই পাঠোদ্ধার হয়ে পড়েছে প্রায় অসম্ভব।’- (এ কে এম শাহনাওয়াজ / ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৪৭)

তবে সিন্ধু লিপি পাঠোদ্ধার না হলেও আবিষ্কৃত সীল, পোড়ামাটির এবং পাথরের কিছু মূর্তি ও অন্যান্য প্রত্ন-নিদর্শন থেকে সে যুগের অধিবাসীদের ধর্মীয় ধারণা সম্পর্কে বেশ কিছু সাক্ষ্য পাওয়া যায়। এখানে উল্লেখ্য-
সিন্ধু-সভ্যতার যে নিদর্শনগুলিকে সাধারণত সীল বলে উল্লেখ করা হয় সেগুলি যে সত্যিই ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে শীলমোহর হিসেবে ব্যবহৃত হতো তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অর্থাৎ, সীল শব্দের ব্যবহার নেহাতই প্রথাগত।’ ‘বরং অধিকাংশ সীলের পিছনে সুতা পরাবার ব্যবস্থা থেকে অনুমান হয় তখনকার লোকেরা এগুলি তাবিজ হিসেবেই অঙ্গে ধারণ করত। অতএব প্রস্তাব হয়েছে, সীল না বলে এগুলিকে সীল-তাবিজ বলাই বাঞ্ছনীয়।’ ‘অন্তত এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে সীলগুলির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল। অধিকাংশ সীলের উপরেই কোনো-না-কোনো চিত্র এবং কিছু লেখা আছে। লেখাটুকু মন্ত্র ধরণের কিছু হতে পারে’, ‘যদিও লিপি-পাঠের অভাবে কোনো কথাই খুব বেশি জোর করে বলা যায় না। অতএব এই তথাকথিত সীলগুলির সঙ্গে সেকালের ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক অনুমিত হলেও সে-ধর্মবিশ্বাসের বৈশিষ্ট্য অনুমান করবার পক্ষে সীলের উপর অঙ্কিত চিত্রাবলীর উপরই নির্ভর করা সম্ভব। স্বভাবতই শুধুমাত্র এই ছবিগুলি বিচার করে সিন্ধু-ধর্মের কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য ধারণায় উপনীত হওয়া সম্ভব নয় : অজস্র সীলের উপর অজস্র ছবি, সেগুলিকে অবলম্বন করে অজস্র কথা কল্পনা করা যায়। তবুও সিন্ধু-ধর্মের সূত্র হিসেবে সীলগুলি মূল্যবান। কেননা অন্যান্য নিদর্শনের ভিত্তিতে সিন্ধু-ধর্ম সংক্রান্ত যে-কথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় তার উপর এই চিত্রাবলী মূল্যবান আলোকপাত করতে পারে। একথা স্বীকার করলে মানতে হবে, আমাদের জ্ঞানের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত অজস্র সীলের মধ্যে মাত্র কয়েকটি নির্বাচিত সীলই সিন্ধু-ধর্মের পরিচায়ক হিসেবে প্রাসঙ্গিক হবে। অপরপর সীলের চিত্রাবলীতে হয়তো সেকালে নানা রকম পৌরাণিক কাহিনী আঁকা আছে; কিন্তু এখনো তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬০)

পোড়ামাটির মূর্তিগুলোর অধিকাংশই ছিল নারী প্রতিকৃতি। এ থেকে মনে করা হয় সিন্ধু সভ্যতায় মাতৃপূজার প্রচলন ছিল। পুরুষ দেবতা হিসাবে শিবের পূজা করা হতো। একটি সীলে তিন মুখবিশিষ্ট পুরুষ দেবতার মূর্তি ছিল। দেবতা সিংহাসনে আসন গেড়ে বসেছিলেন। তাঁর মাথায় ছিল শিং। দেবতার চারপাশে ছিল মহিষ, বাঘ, হাতি ও গণ্ডার। আসনের নিচে ছিল একটি হরিণ। দেবতার হাতে পরা ছিল অনেকগুলো বাজুবন্দ। আর তাঁর গায়ে ছিল বিচিত্র পোশাক। এই দেবতা বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছেন। যেমন ‘ত্রিমুখা’, ‘যোগেশওয়ারা’, ‘মহাযোগী’ অথবা ‘পশুপতি’। তবে অনেকেই এই দেবতাকে শিব বলে চিহ্নিত করেছেন। সীলের ছবি থেকে ধারণা করা হয় সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা পশু, বৃক্ষ ও পাখির পূজা করতো। এ যুগে কবরে মৃতের ব্যবহার্য দ্রব্যাদি রাখা হতো। এতে মনে করা হয় সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিল।’- (এ কে এম শাহনাওয়াজ/ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৪৭)

শক্তি-সাধনা :
তবে সিন্ধু-যুগের দেবীপ্রধান বা মাতৃপ্রধান ধর্ম-বিশ্বাসে সিন্ধুবাসীরা যে মাতৃ-প্রকৃতির শক্তি-সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন তা নির্ভরযোগ্য প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসবিদদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা থেকেও অবগত হওয়া যায়। এ প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থের ‘সিন্ধু-যুগের ধ্যানধারণা’ অধ্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি-প্রমাণ সহযোগে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আমরা সে-আলোচনার কিছুটা সহায়তা নিতে পারি।

মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ মন্তব্য করেছেন, ‘প্রাচীন সংস্কৃতিগুলি অনুসন্ধান করলে দেখা যায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ভারতবর্ষেও শাক্ত-সম্প্রদায়ের ইতিহাস বহুকালের পুরানো। খুব সম্ভব প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু-সভ্যতার যুগ থেকেই শৈব ও পাশুপত সম্প্রদায়ের সঙ্গেই আমাদের দেশে তা প্রচলিত ছিলো।
মহামহোপাধ্যায় আরও বলেছেন, ‘সামগ্রিকভাবে ভারতীয় চিন্তাধারার উপর শাক্ত-সম্প্রদায়ের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ভারতবর্ষের ভৌগলিক পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, এ-দেশে অসংখ্য শক্তি-সাধনার কেন্দ্র ছড়িয়ে আছে। অতীতে এ-সাধনার প্রভাব ব্যাপক ছিলো এবং আজকের দিন পর্যন্ত তা অবিচ্ছিন্নভাবে চলে এসেছে।
অতএব এই ‘শাক্ত-তান্ত্রিক’ সংস্কৃতির ইতিহাসকে তিনি তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করতে চেয়েছেন- (১) প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে প্রচলিত প্রাচীন প্রাক্-বৌদ্ধ পর্যায়। (২) খ্রিস্টীয় ১২০০ পর্যন্ত বুদ্ধ-পরবর্তী বা খ্রিস্ট পরবর্তী মধ্যযুগীয় পর্যায়। (৩) খ্রিস্টীয় ১৩০০ থেকে আজ পর্যন্ত আধুনিক পর্যায়। আর শাক্ত-সম্প্রদায়ের গ্রন্থাবলী বলতে ওই দ্বিতীয় বা মধ্যযুগীয় পর্যায়েরই অবদান। যদিও প্রাচীন পর্যায়ের কোনো গ্রন্থ পাওয়া যায়নি, তবু অনুমান হয়, মধ্যযুগীয় গ্রন্থাবলীও প্রাচীন ঐতিহ্যের উপরই নির্ভরশীল।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক পর্যায়টির পরিচায়ক কোনো গ্রন্থাবলী পাওয়া না গেলেও অন্য কোন্ ধরণের নিদর্শনের উপর নির্ভর করে তার সংবাদ পাওয়া সম্ভব?  এর একমাত্র উত্তর হলো- শক্তি-সাধনার প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক পর্যায়ের পরিচায়ক বলতেই প্রত্নতত্ত্বলব্ধ সিন্ধু-সভ্যতার স্মারক।
এই স্মারক হলো মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, চানহুদারো এবং সিন্ধু-প্রদেশ ও বেলুচিস্থানের নানা জায়গা থেকে বহুল পরিমাণে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ছোট ছোট নারী-মূর্তি। অঙ্গসৌষ্ঠব ও নির্মাণভঙ্গির দিক থেকে সিন্ধু-উপত্যকা ও বেলুচিস্থানে পাওয়া মূর্তিগুলির মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এগুলিকে প্রাচীন শক্তি-সাধনার নির্দেশক মাতৃকা বা মহামাতৃকা বা বসুমাতা মূর্তি বলেই সনাক্ত করেছেন। তবে এবিষয়ে প্রায় সমস্ত প্রত্নতত্ত্ববিদের মূল বক্তব্য প্রধানতই স্যার জন মার্শালের যুক্তি ও বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেছেন।

তাহলে মার্শালের যুক্তি-বিশ্লেষণ কী? মার্শাল বলছেন, মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা থেকে পাওয়া পোড়ামাটির মূর্তিগুলির মধ্যে কয়েকটি খেলার পুতুল হতে পারে। অর্থাৎ এগুলির সঙ্গে হয়তো কোনো রকম ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক নেই। যেমন মেয়েরা ময়দা মাখছে বা খাবারের থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। অপর কয়েকটি- যেমন শিশুক্রোড়ে মাতা বা অন্তঃসত্ত্বা নারী- মানত-মূলক উপচার হতে পারে; সন্তানকামনায় এ জাতীয় মূর্তি মানত করবার দৃষ্টান্ত আজও বিরল নয়। কিন্তু এগুলির কথা বাদ দিলে বেশির ভাগ মূর্তিকারই সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে, প্রায় নিরাবরণ নারী-মূর্তি, কোমরে এক টুকরো কটিবাস বা মেখলা, মাথায় বড় মুকুট ধরনের শিরোভূষণ, তা ছাড়া প্রায়ই জমকালো কণ্ঠহার, রত্নমালা প্রভৃতিও বেলুচিস্তানের মূর্তিকাগুলির সঙ্গে এগুলির পার্থক্য।

প্রশ্ন হলো হরপ্পা-সংস্কৃতির এই মূর্তিকাগুলি কেন দেবী-মূর্তি বা মাতৃ-মূর্তি বলে বিবেচিত হতে বাধ্য? এ-বিষয়ে মার্শাল সুদীর্ঘ যুক্তির অবতারণা করেছেন। তবে তার আগে এই মূর্তিকাগুলির আরো কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মর্টিমার হুইলারের পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য। ১৯৪৬ সালের হরপ্পা-উৎখননের ভিত্তিতে মর্টিমার হুইলার বলছেন- ‘পোড়ামাটির এই নারী-মূর্তিকাগুলির মুকুট প্রায়ই পেখমের মতো ছড়ানো; তার দুদিকে সাধারণত দুটি করে ছোট্ট বাটির মতো। ভালো করে পরীক্ষা করলে সাধারণত এই বাটির মতো অংশগুলিতে কালো পোড়া-দাগ চোখে পড়ে।
পোড়া-দাগ কেন? হুইলার অনমান করছেন, হয় এগুলি প্রদীপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো আর না হয় তো এগুলিতে ধূপ-ধুনো ধরনের কিছু পোড়ানো হতো। তা হলে খেলার পুতুল নয়, মূর্তিকাগুলির সঙ্গে ধর্মানুষ্ঠানের সম্পর্ক-সূচক মূর্ত প্রমাণ রয়েছে বলা যায়।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক কালে যে-রকম প্রতিমার গায়ে সিঁদুর মাখাবার প্রথা আছে হরপ্পা-সংস্কৃতির মূর্তিকাগুলির গায়েও সেইভাবে- এবং অবশ্য একই উদ্দেশ্যে- লাল রঙ মাখানো হতো বলেই অনুমান হয়।

এ প্রেক্ষিতে প্রত্নতত্ত্ববিদ ভাট্স্ বলছেন, হরপ্পায় পাওয়া মূর্তিকাগুলির মধ্যে অন্তত তিন ভাগের গায়ে কোনো রকম রঙ ব্যবহার করা হতো বলে মনে হয় না, যদিও মহেঞ্জোদারোর মূর্তিগুলিতে আধুনিক কালের সিঁদুর মাখাবার মতোই কোনো এক-রকম প্রথা ছিলো। তবে অন্তত মহেঞ্জোদারো মূর্তিকাগুলির গায়ে সিঁদুর-রঙ মাখানো সুস্পষ্ট প্রমাণ চোখে পড়ে এবং তাঁর মতেও এ-থেকে মূর্তিকাগুলির সঙ্গে ধর্মানুষ্ঠানের সম্পর্কই প্রমাণিত হয়।
অন্যদিকে আরেক প্রত্ন-ইতিহাসবিদ ম্যাকে মন্তব্য করেছেন, সুদীর্ঘ কাল ধরে নোনা মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকবার ফলে মূর্তিকাগুলির গায়ে মাখানো সিঁদুর রঙ এমনই অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক যে আজকের দিনে তা সহজে চোখে পড়বার কথা নয়। তাই এ-কথা খুব জোর করে বলা সম্ভব নয় যে হরপ্পা-সংস্কৃতির বেশিরভাগ মূর্তিকার গায়ে সিঁদুর-রঙ দেবার প্রথা ছিলো না। এবং ম্যাকে আরও বলেছেন, নারী-মূর্তিকার গায়ে এ-জাতীয় ধর্মানুষ্ঠানগত সিঁদুর-রঙ মাখাবার দৃষ্টান্ত শুধু মাত্র প্রাচীন ও আধুনিক ভারতবর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মিশর, সাইপ্রাস, মালটা এবং দানিউব সংস্কৃতির কেন্দ্রেও একই প্রথার পরিচয় পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা যায়, ‘ভিলেন্ডর্ফের ভেনাস’ নামের প্রত্নতত্ত্বলব্ধ সর্বপ্রাচীন মাতৃমূর্তিকার দৃষ্টান্তেও এই প্রথারই চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে।

হরপ্পা-সংস্কৃতির নারী-মূর্তিকাগুলির সঙ্গে যে ধর্মানুষ্ঠানের সম্পর্ক ছিলো এ বিষয়ে উপরিউক্ত আলোচনায় বিষয়টির মূর্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। এবার হরপ্পা-সংস্কৃতির এই মূর্তিকাগুলি কেন দেবী-মূর্তি বা মাতৃ-মূর্তি বলে বিবেচিত হতে বাধ্য, এ-বিষয়ে স্যার জন মার্শালের সুদীর্ঘ যুক্তি-বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় অংশ-বিশেষ দেবীপ্রসাদের তর্জমায় উদ্ধৃত করা যেতে পারে। স্যার মার্শাল বলছেন-

‘এ-কথা অবশ্যই সুবিদিত যে সিন্ধু-উপত্যকা এবং বেলুচিস্তান থেকে পাওয়া নারী-মূর্তিকাগুলির মতোই অজস্র মূর্তিকা পার্সিয়া থেকে ইজিয়ান পর্যন্ত সুবিস্তীর্ণ এলাকা থেকে- বিশেষত ইলাম্, মেসোপটেমিয়া, ট্রান্সকাস্পিয়া, এশিয়া মাইনর, সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন, সাইপ্রাস, ক্রীট, সাইক্লেড্স্, বলকান ও মিশরের নানা কেন্দ্র থেকে- সংগৃহীত হয়েছে। কোনো কোনো দেশে এ জাতীয় মূর্তিকা হয়তো অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের, কোথাও বা এগুলির পরিচয় কিছুটা খাপছাড়া, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ওই সব ধর্মগোষ্ঠিগুলির উৎস অভিন্ন হোক আর নাই হোক অন্তত যে সব দেশের এগুলির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে সেখানের সর্বত্র সমজাতীয় ধর্মবিশ্বাস প্রচলিত ছিল। এ-বিষয়ে সাধারণ মত হলো, মূর্তিকাগুলি মাতৃকা বা প্রকৃতি-দেবীরই প্রতীক। আনাতোলিয়ায় তার পূজার সূত্রপাত হয়, তারপর ক্রমশ তা সমগ্র পশ্চিম-এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এই মূর্তিকাগুলির সঙ্গে সিন্ধু-নদের কিনারায় পাওয়া মূর্তিকাগুলির নিকট সাদৃশ্য থেকে এ-সিদ্ধান্ত সংবরণ করা কঠিন যে সিন্ধু-উপত্যকাতেও এগুলি মাতৃকা বা প্রকৃতি-দেবীরই প্রতীক ছিল এবং পশ্চিমাঞ্চলের সমজাতীয় মূর্তিকাগুলির মতোই এগুলিও একই উদ্দেশ্য সাধন করত। অর্থাৎ, হয় এগুলি ছিল মানতমূলক উপচার, আর না-হয় তো সাধারণ লোকের বাড়িতে ঠাকুর-ঘরের বিগ্রহ, যদিও দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল। এখন দেখা যাচ্ছে, সিন্ধু-নদ থেকে নীল-নদ পর্যন্ত সারা পথ শুধু ভৌগোলিকভাবেই অবিচ্ছিন্ন নয়, তাম্র-প্রস্তর যুগে পুরো এলাকাটি একই সংস্কৃতি-বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এই পরিস্থিতি থেকে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ়-প্রতিষ্ঠই হয়েছে। কিন্তু পশ্চিম-এশিয়ার সঙ্গে তুলনা যদি বাদ দেইও মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা এবং বেলুচিস্তানের নিদর্শনগুলিকে মাতৃ-দেবী বা তারই কোনো স্থানীয় রূপ বলে সনাক্ত করবার অন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। কেননা আর কোনো দেশেই মাতৃদেবীর উপাসনা ভারতবর্ষের মতো বিস্মৃত অতীত থেকে এমন দৃঢ়প্রতিষ্ট ও ব্যাপক নয়। তাঁকে ‘মাতা’ বা ‘মহামাতা’ বলা হয়, তিনিই হলেন প্রকৃতি-র প্রতিরূপ এবং এই প্রকৃতির ধারণা থেকে ক্রমশ শক্তির ধারণা উদ্ভূত হয়েছিল। তাঁরই প্রতিনিধি বলতে আজকের গ্রামদেবতা- এই দেবীর অসংখ্য নাম এবং স্থানীয় লক্ষণের নানা বৈচিত্র্য সত্ত্বেও প্রত্যেকেই ওই ‘প্রকৃতি’-র মূর্ত মানবী-রূপ। প্রতি গ্রামেরই একটি করে নিজস্ব বিশিষ্ট দেবী আছে, গ্রামের ধনী-দরিদ্র সকলেই তাঁর রক্ষায় রক্ষিত এবং প্রায়ই দেখা যায় তাঁর পূজা সমগ্র পূজা-উপাসনার স্থান গ্রহণ করেছে।… আজকাল সাধারণত তাঁর মূর্ত বিগ্রহ গড়া হয়; কিন্তু কখনও শুধু-একটি শিলাখণ্ডই তাঁর প্রতীক, কখনও বা তাঁর দেউলটি শূন্য- কোনো মূর্তি নেই। এ-কথা অনুমান করা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত যে পশ্চিম-এশিয়ার মাতৃদেবীর মতো এগুলিও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায় উদ্ভূত হয়েছিল। কিন্তু সে-বিষয়ে সিদ্ধান্ত যাই হোক-না-কেন, অন্তত একটি কথায় সন্দেহের অবকাশ নেই, স্থানীয় অনার্যদের দেবলোকে প্রধানা বলতে এই গ্রামদেবতাই। এ-বিষয়ে নানা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আদিম উপজাতিদের মধ্যে আজও এই গ্রামদেবতার ধর্মানুষ্ঠানই টিকে রয়েছে এবং সে-অনুষ্ঠানে প্রধান অংশ গ্রহণ করে অচ্ছুতরই, –ব্রাহ্মণ পূজারী নয়। এই অচ্ছুত বলতে প্রাচীন উপজাতির প্রতিনিধিই- মানুষের কামনা কীভাবে দেবীর শ্রুতিগোচর করা যায় এ-রহস্য শুধু তাদেরই জানা আছে। কোনো কোনো উপজাতি কখনোই হিন্দুধর্মের (বৈদিক বা আর্যধর্মের) আওতায় আসেনি, তাদের মধ্যেই মাতৃদেবী বা বসুমাতার উপাসনা সবচেয়ে প্রবল। বস্তুত, ভারতবর্ষে বা অন্যত্র কোথাওই আর্যদের মধ্যে নারী-দেবতার পক্ষে মহামাতার মতো সর্বোচ্চ স্তরে প্রতিষ্ঠিত হবার দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। বেদের পৌরাণিক কল্পনায় দেবীরা অপ্রধান, দেবলোকে প্রধান বলতে পুরুষেরাই- দেবীদের যেটুকু বা গৌরব তা ওই পুরুষের সঙ্গিনী হিসেবেই।’


উপরিউক্ত তথ্য এবং যুক্তি-থেকেই মার্শাল সিন্ধু-সভ্যতার শক্তি-সাধনার প্রচলন অনুমান করেছেন এভাবে-

‘প্রথমেই সুস্পষ্টভাবে বলে রাখতে চাই, মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পার শাক্ত ধর্মের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। প্রমাণ বলতে যেটুকু তা নেহাতই ইঙ্গিতমূলক। ভারতবর্ষে শাক্ত-ধর্ম অত্যন্ত প্রাচীন- মাতৃদেবীর সাধনা থেকেই তার উদ্ভব এবং তার সঙ্গে শৈব-সাধনার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। তা ছাড়া পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি ধর্মের সঙ্গে তার সাদৃশ্য এমনই যে তা নীরবে উপেক্ষা করা যায় না।… আদিম মাতৃ-উপাসনার বিকাশের এই পর্যায়টিতে দেবী নারী-শক্তির প্রতীকে (‘শক্তি’) এবং সৃষ্টির সনাতন তত্ত্বে (‘প্রকৃতি’) পরিণত হয়েছেন, সনাতন পুরুষ-তত্ত্বের (‘পুরুষ’) সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তিনি বিশ্বের আদিকারণ মা জন্মদায়িনী (‘জগৎ-মাতা’ বা ‘জগদম্বা’) রূপে পরিকল্পিত। তাঁর চূড়ান্ত অভিব্যক্তি হলো শিব-সঙ্গিনী ‘মহাদেবী’-র রূপ। আগেই বলেছি, শাক্ত-ধর্ম শৈব-ধর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িত। তবুও এই শক্তিই শিবেরও স্রষ্টা এবং প্রাধান্য বলে পরিকল্পিত। তাঁর অপেক্ষাকৃত গৌণ বিকাশগুলির সঙ্গে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং অন্যান্য সমস্ত দেবতার শক্তি সমন্বিত হয়েছে এবং পরবর্তীকালের শিব-উপাসকেরা যেমন তাঁকেই শ্রেষ্ঠ দেব বা ‘মহাদেব’ রূপে গ্রহণ করেছেন তেমনি তাঁর এই নারী-সঙ্গিনীটি শক্তি দেবলোকে প্রধানা রূপেই পূজিত- তাঁরই মধ্যে দেবলোকের সমগ্র নারী-শক্তি প্রতিবিম্বিত। শিবের মতোই তাঁরও স্বভাব দ্বিবিধ। তাঁরই শক্তিতে সৃষ্টি হয়, প্রলয় হয়; তাঁরই গর্ভে নিখিল বিশ্বের জন্ম, নিখিল বিশ্বের লয়।… শাক্ত-ধর্মের অনেক তত্ত্ব ও অনুষ্ঠান অবশ্যই পরবর্তীকালের হিন্দুধর্ম থেকে গৃহীত এবং তা আর্য প্রভাবের পরিণাম। কিন্তু তার মূল উপাদান অবশ্যই আর্য-পূর্ব এবং তা স্ত্রী-পুরুষমূলক দ্বৈতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত- এই দ্বৈতবাদ, এম্, বার্থ যেমন বলছেন, ভারতবর্ষের মতোই পুরানো।’


মার্শাল আরও বলেছেন,-

‘নিকট প্রাচ্যের কয়েকটি আর্য-পূর্ব ধর্মের সঙ্গে ভারতীয় শাক্ত-ধর্মের আশ্চর্য সাদৃশ্য চোখে পড়ে। এশিয়া মাইনর ও ভূমধ্যসাগরের কিনারায় নানা জায়গায় প্রকৃতি-দেবী বা মাতৃ-দেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল– দেবীর সঙ্গে একটি তরুণ ও অপ্রধান দেবতাও সংযুক্ত। পিউনিক আফ্রিকায় তিনি স্ব-পুত্রের সঙ্গিনী তানিট দেবী, মিশরে হেরাস্-এর সঙ্গিনী আইসিস্, ফিনিসিয়ায় অ্যাডোনিস্-সঙ্গিনী আস্টারোখ্, এশিয়া মাইনরে অ্যাট্রিস-সঙ্গিনী সিবেলী, গ্রীসে তরুণ জিউস-এর সঙ্গিনী রিহিয়া। দেবী সর্বত্রই কুমারী; প্রথমে বিশুদ্ধ গর্ভধারণের ফলে তিনি ওই সঙ্গীর জন্ম দিচ্ছেন এবং তারপর তাঁরই আলিঙ্গনে সমস্ত দেবলোক ও জীবলোক উৎপাদন করছেন।… বলাই বাহুল্য এই সব ধর্মের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য স্থানীয় কয়েকটি অপেক্ষাকৃত পরবর্তী যুগের অবদান। তবুও মূল ধ্যানধারণার দিক থেকে এগুলির সঙ্গে ভারতীয় শাক্ত-ধর্মের সাদৃশ্য সুস্পষ্ট। প্রতিটির কেন্দ্রই কোনো মহামাতা বা প্রকৃতি-দেবী;… শাক্তদের মহামাতার মতোই তিনি একাধারে কল্যাণময়ী ও ভীষণা, অকল্যাণের ধ্বংসকারিণী কিন্তু স্বয়ং আতঙ্ক-সঞ্চারিনী; তিনিই সমস্ত কামনা-বাসনা ও জাদু-শক্তির অধিষ্ঠাত্রী; তাঁর ধর্মানুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে প্রায়ই নির্বিচার মিলন ও রুধির-বাহুল্য দেখা যায়। ভারতীয় শাক্ত-ধর্মের সঙ্গে এগুলির সাদৃশ্য অনেকদিন থেকেই পরিলক্ষিত হয়েছে এবং অনেকেই এ-বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। ধরে নেওয়া হয়েছে, সমস্ত দৃষ্টান্তেই ধর্মগুলি সমতুল্য (মাতৃতান্ত্রিক) সমাজ-ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত– প্রাক্-আর্য যুগে ভারতবর্ষ ও নিকট-প্রাচ্যে এই সমাজ-ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।’


এ প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেন-
যে-কথা আগে বোঝা যায় নি– হরপ্পা এবং  মোহেনজো-দাড়ো আবিষ্কারের পরই প্রথম বোঝা গেল– তা এই যে তাম্র-প্রস্তর যুগে ভারতবর্ষ ও পশ্চিম এশিয়া একই সভ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এই নতুন জ্ঞানের আলোয় আজ প্রশ্ন তোলবার সময় হয়েছে : ঐহিক সংস্কৃতির দিক থেকে দেশগুলি যে-ভাবে পরস্পর-দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকেও তা হয়ে থাকা সম্ভব কিনা? আর্যরা যদি ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে ধর্ম-বিস্তার করতে পেরে থাকে তা হলে আর্য-পূর্বদের পক্ষেই বা তা অসম্ভব কেন হবে?
পরবর্তী গবেষণার ফলে মার্শালের অন্যান্য কয়েকটি বক্তব্যের মতোই সিন্ধু সভ্যতায় শাক্ত-ধর্মের উদ্ভব সংক্রান্ত উপরোক্ত মন্তব্যও অংশ-বিশেষে সংশোধনসাপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো, এ-বিষয়ে তাঁর মূল প্রতিপাদ্যটুকু পরবর্তী প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রায় একবাক্যেই স্বীকার করেছেন– পোড়া-মাটির ওই জাতীয় নারী-মূর্তিকাগুলিকে সকলেই মহামাতা বা বসুমাতার প্রতিকৃতি বলে গ্রহণ করেছেন। সুবিস্তীর্ণ সিন্ধু-সাম্রাজ্যের বহু কেন্দ্র থেকে যদি এ-জাতীয় মূর্তিকা আবিষ্কৃত হয়ে থাকে তা হলে স্বীকার করতে হবে, সিন্ধু-সাম্রাজ্যের প্রধানতম ধর্ম বলতে এই মহামাতা বা বসুমাতার উপাসনাই।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৫)

প্রত্নতত্ত্বলব্ধ পোড়ামাটির মূর্তিকা বলতে যদিও প্রধানতই মাতৃকা-দেবীরূপী নারী-মূর্তি, তবুও সংখ্যায় তুলনামূলক নগন্য হলেও কিছু কিছু পুরুষ-মূর্তিও আবিষ্কৃত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এগুলির ব্যাখ্যা কী হবে? নির্মাণকুশলতার দিক থেকে এগুলি এমনই স্থূল- এমনই আনাড়ি হাতের কাজ যে, প্রত্নতত্ত্ববিদ ম্যাকে’র মতে এগুলিকে শিশুদের হাতে গড়া খেলনাই মনে হয়েছে। আর অন্য প্রত্নতত্ত্ববিদ ভাট্স্-এর বক্তব্য হচ্ছে, অনেকগুলি পুরুষ-মূর্তি দেখলে মনে হয় যেন হাত-জোড় করে উপাসনা করছে। অতএব এগুলিকে উপাস্য দেবতার মূর্তি মনে করবার কারণ নেই। তার বদলে বরং এগুলি উপাসকের প্রতিকৃতি হওয়াই সম্ভব। হরপ্পা-সংস্কৃতির কোনো কোনো সীলেও প্রায় একই রকম উপাসনার ভঙ্গি দেখা যায়।

সিন্ধু-যুগের ধর্ম বিশ্বাস যে দেবীপ্রধান বা মাতৃপ্রধান ছিলো এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ বা ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিমত নেই, কেননা প্রত্নতত্ত্বলব্ধ পোড়ামাটির নারী-মূর্তিকাগুলি থেকেই তা প্রমাণ হয়। এ-কথা স্বীকার করেও কোনো কোনো বিদ্বান তর্ক তুলেছেন, তবুও বৈদিক ধর্মের সঙ্গে সিন্ধু-সভ্যতার ধর্মের কোনো মৌলিক প্রভেদ প্রমাণ হয় না। তাদের যুক্তি হলো, বৈদিক সাহিত্যেও মাতৃ-উপাসনার পরিচয় পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে ধারণা করা যায়, এই তর্ক উত্থাপনের গূঢ় উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়- আর্য-সংস্কৃতিকেই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনতম উৎস-মুখ হিসেবে সাবেকি ধারণা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। তাই এ বিষয়ে বৈদিক সাহিত্যের নজির বিচার করা আবশ্যক বৈকি।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : সিন্ধু-সভ্যতার নগর-পরিকল্পনা, ভাস্কর্য ও শিল্পকলা এবং অর্থনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থা] [*] [পরের পর্ব : বৈদিক-সাহিত্যের দেবীস্তুতি প্রসঙ্গে]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 176,298 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: