h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৩ : সিন্ধু-সভ্যতার স্রষ্টা|

Posted on: 02/07/2015


553719_108808575930041_1224432025_n

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০৩ : সিন্ধু-সভ্যতার স্রষ্টা|
রণদীপম বসু

২.৩ : সিন্ধু-সভ্যতার স্রষ্টা

একটি উন্নত নগর সভ্যতা হিসেবে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে কোন্ সময়ে এ সভ্যতার উৎপত্তি ঘটেছিলো এবং কিভাবে তা বিকশিত হয়েছিলো। প্রথম দিকে ধারণা করা হতো এ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলো আর্যরা, এরা বাইরে থেকে ভারতে এসেছে, সুতরাং হরপ্পা সংস্কৃতি আর্যদেরই দান। কিন্তু কোন কোন প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন মেসোপটেমিয়া ও সুমেরিয়রা এসে সিন্ধু অঞ্চলে সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো। আবার কারো মতে সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা দ্রাবিড়রা। এবং কেউ কেউ বলেন সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা আসলে মিশ্র জাতিগোষ্ঠী। অর্থাৎ সিন্ধু-সভ্যতার স্রষ্টা কারা এ নিয়ে আজো কোন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। ফলে এ সম্পর্কে প্রধানত চারটি মতবাদ প্রচলিত আছে।


(ক) আর্য সৃষ্ট মতবাদ :

সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হওয়ার বেশ আগেই আর্যদের গড়া বৈদিক সভ্যতা আবিষ্কৃত হওয়ায় ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা হিসেবে বৈদিক সভ্যতাকেই তখন বিবেচনা করা হতো। এই মতে মনে করা হতো আর্যরা বহিরাগত নয়, এই ভূখণ্ডেই তাদের উৎসভূমি ছিলো। এই ধারণার মধ্য দিয়েই এই মতের সপক্ষে অন্য সব যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে। পরে সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হওয়ার পরও বেশ কিছুকাল পর্যন্ত এই সভ্যতাটি আর্যদেরই গড়া বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে হরপ্পা সভ্যতার প্রত্ন নিদর্শনসমূহ বিশ্লেষণ করে এই মতামতের সপক্ষে তেমন যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। এই মতের সপক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিগুলি হলো-
প্রথমত, সিন্ধু-সভ্যতায় আর্য জাতির মানুষদের কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বৈদিক যুগের নারীদের পরিধেয় অলংকার ও খোঁপা বাঁধার রীতির সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার নারীদের অলংকার ও খোঁপার মিল রয়েছে। তৃতীয়ত, প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে বোঝা যায় সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের খাদ্য ও পোশাকের সঙ্গে বৈদিক সভ্যতার মানুষদের খাদ্য ও পোশাকের মিল রয়েছে। চতুর্থত, সিন্ধু সভ্যতায় পাওয়া সীলে এবং টেরাকোটায় যে সমস্ত পশু চিত্র বা পশু মূর্তি পাওয়া যায় আর্য সভ্যতায়ও অনুরূপ পশুর অস্তিত্ব ছিলো। পঞ্চমত, আর্য যুগের মতো সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলিতেও বস্ত্রবয়ন শিল্প গড়ে উঠেছিলো। ষষ্ঠত, প্রথম পর্যায়ের গবেষণা থেকে অনুমান করা হয়েছে যে ভারতের প্রাচীন ব্রাহ্মীলিপির সঙ্গে সিন্ধু লিপির মিল রয়েছে- যার পরিণত রূপ পাওয়া যায় আর্য সভ্যতায়।

কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার উপর বিস্তৃত গবেষণার পর সর্বপ্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার জন মার্শাল উপরিউক্ত মতগুলির বিরোধিতা করে স্পষ্টতই দেখিয়েছেন যে, সিন্ধু সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতা একেবারেই পৃথক। ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন পরিবেশে এবং স্বতন্ত্র উপাদানে তা গড়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত যুক্তিগুলি হলো-
প্রথমত, আর্য সভ্যতা ছিলো গ্রামকেন্দ্রিক। নগর জীবনের পরিচয় বৈদিক সংস্কৃতিতে পাওয়া যায় না। কিন্তু সিন্ধুবাসীরা গড়ে তুলেছিলো উন্নত নগর সভ্যতা। বৈদিক সাহিত্যের সূত্রে আর্যদের বলা হতো নগর ধ্বংসকারী। দ্বিতীয়ত, সিন্ধু সভ্যতায় লোহার ব্যবহার ছিলো না। নগর সভ্যতার চূড়ান্ত বিকাশের শেষপর্বে লোহার আবিষ্কার হয়েছিলো। তাই সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ন নিদর্শনের মধ্যে তামা পাওয়া গেলেও লোহা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ের সভ্যতা বলেই বৈদিক সংস্কৃতিতে তামা ও ব্রোঞ্জের পাশাপাশি লোহার ব্যবহার লক্ষ করা গেছে।  তৃতীয়ত, নগর সভ্যতার ধারক সিন্ধু সভ্যতায় ইটের তৈরি বহুতল বাড়ি তৈরি হয়েছিলো। অন্যদিকে বৈদিক যুগে আর্যরা বাড়ি বানাতো মাটি, বাঁশ ও খড় দিয়ে। চতুর্থত, সিন্ধু সভ্যতায় যেসব পশুর নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে অনুমান করা হয় সিন্ধু-সভ্যতায় ঘোড়ার ব্যবহার হতো না কিংবা ঘোড়ার সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিলো না। অথচ আর্যদের যুদ্ধের প্রধান বাহন ছিলো ঘোড়া। বৈদিক সভ্যতায় ঘোড়া টানা রথেরও প্রচলন ছিলো।  পঞ্চমত, নগর সভ্যতা গড়ে তোলার কারণে অনুমান করা সহজ হয়েছে যে সিন্ধুবাসীরা স্থায়ী জীবন বা বসতি গড়েছিলো। কিন্তু পশুপালক আর্যরা অনেকাংশে ছিলো অস্থায়ী যাযাবর। ষষ্ঠত, ধর্মীয় ক্ষেত্রে উভয় সভ্যতার মানুষের মধ্যে যথেষ্ট অমিল ছিলো। সিন্ধু সভ্যতায় ধর্মীয় বিশ্বাস, মাতৃপূজা, লিঙ্গ পূজা, শিব পূজা, বৃক্ষ পূজা প্রচলিত থাকলেও আর্য ধর্মে এগুলির তেমন গুরুত্ব নেই। মার্শালের সিদ্ধান্ত মতে ষাঁড় ছিলো সিন্ধুবাসীদের পূজ্য দেবতা। অন্যদিকে আর্যদের মধ্যে ছিলো গাভী পূজার প্রচলন। আর্যরা লিঙ্গ পূজাকে নিন্দা করতো। আর্য সভ্যতায় পুরুষ দেবতার প্রাধান্য ছিলো, কিন্তু সিন্ধু সভ্যতায় প্রাধান্য বিস্তার করেছিলো মাতৃদেবী তথা নারীদেবী। আর্যদের ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ পূজা, যজ্ঞ প্রথা সিন্ধু সভ্যতায় অনুপস্থিত ছিলো। সপ্তমত, সিন্ধু লিপি প্রমাণ করে সিন্ধুবাসীরা লিখতে জানতো। কিন্তু আর্যরা লিখন পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেনি। অষ্টমত, সবচেয়ে বড়ো যুক্তি হলো, কাল নির্ণয় করে সিদ্ধান্ত নেয়া গেছে যে আর্যরা ভারতে আগমন করেছিলো দেড় থেকে দুই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার উদ্ভব ঘটেছিলো তার থেকেও দেড় হাজার বছর আগে অন্তত তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এসব যুক্তির কারণে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল, বাসাম প্রমুখরা আর্যরা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা এ মতবাদ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

(খ) সুমেরীয় সৃষ্ট মতবাদ :

বৃটিশ ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার মর্টিমার হুইলার ও গর্ডন চাইল্ড সুমেরীয়দেরকে সিন্ধু সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁরা মনে করেন মেসোপটেমিয়া ও সুমেরের নগরগুলি থেকে এক সময় অভিবাসনকারীরা এসে সিন্ধু অঞ্চলে সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো। গর্ডন চাইল্ড অবশ্য একথাও বলেছেন যে, সুমেরীয় ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তবুও নগর বিন্যাস ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে এই দুই অঞ্চলের মধ্যে মিলের পরিমাণও যথেষ্ট। মর্টিমার হুইলার সরাসরি হরপ্পা সংস্কৃতি সুমেরীয় সংস্কৃতির নিকট ঋণী বলে মন্তব্য করেছেন। গবেষকদের মধ্যে যাঁরা মনে করেন সুমেরীয়রাই সিন্ধু সভ্যতা গড়ে তুলেছেন তাঁদের যুক্তিগুলি হলো-
প্রথমত, মেসোপটেমিয়ার মতোই সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলি গড়ে উঠেছিলো নদীর তীরে। দ্বিতীয়ত, পাঠোদ্ধার করা না গেলেও মেসোপটেমিয়ার মতো সিন্ধু সভ্যতায়ও লিখন পদ্ধতির প্রচলন ছিলো। তৃতীয়ত, সুমেরীয়দের মতো সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরাও মাতৃপূজা করতো। চতুর্থত, মেসোপটেমিয়ার মতো সিন্ধু সভ্যতাতেও কুমোরের চাকার মাধ্যমে মসৃণ মৃৎপাত্র তৈরি করা হতো। পঞ্চমত, মেসোপটেমিয়ার কয়েকটি নগরে নগরদেবতার অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এর প্রতিফলন সিন্ধু সভ্যতার সীলে উপস্থিত ছিলো।
একই প্রসঙ্গে যুক্তি উপস্থাপন করে বলা হয় যে, হরপ্পার উৎখননের পর দেখা গেছে মাটির নিম্নতম স্তরেও উন্নত নগর সভ্যতার নিদর্শন ছিলো। যদি স্থানীয় মানুষ এই সভ্যতা গড়ে তুলতো তবে প্রথম পর্যায়েই তাদের পক্ষে এমন দক্ষতার সঙ্গে নগর গড়া সম্ভব হতো না।

এছাড়া সুমেরীয়রা সিন্ধু সভ্যতা গড়ে না তুললেও মরটিমার হুইলার প্রমুখ পণ্ডিতগণ এই সভ্যতা সুমেরীয়দের নিকট অনেকাংশে ঋণী বলে অথবা উভয় সভ্যতার মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিলো বলে যে মন্তব্য করেছেন তার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণ হলো-
ক. হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া সীল সুমেরের উর এবং এর আশেপাশে পাওয়া সীলের সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। অগ্রবর্তী সভ্যতা হিসেবে মনে করা হয় সুমের এই সীল নির্মাণে সিন্ধু সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে।
খ. ধারণা করা হয় উভয় সভ্যতার মধ্যে সমুদ্র পথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিলো। জানা যায় সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলো থেকে সূতিবস্ত্র রপ্তানি হতো সুমেরে। বাণিজ্যিক সূত্র ধরে পারস্পরিক প্রভাব বিস্তারের পথ সুগম হয়েছিলো।

তবে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে তুলতে সুমেরীয় সভ্যতার যে তেমন কোন প্রভাব ছিলো না তা প্রতিষ্ঠিত করতেও কিছু যুক্তি উপস্থাপিত হয়। কারণ এই দুই সভ্যতার মধ্যে স্পষ্ট কিছু বৈসাদৃশ্য ছিলো, যেমন-
প্রথমত, সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত পোড়ামাটির শিল্প অর্থাৎ টেরাকোটার সঙ্গে মেসোপটেমীয় সভ্যতায় পাওয়া টেরাকোটার তেমন কোন মিল পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, উভয় সভ্যতার সীলে মিল থাকলেও নান্দনিক দৃৃষ্টিতে সুস্পষ্ট অমিলও লক্ষ্যণীয়। যদিও সিন্ধু সভ্যতার সীলে উৎকীর্ণ লিপি পাঠ করা যায়নি, তবুও বোঝা যায় যে এই লিপি মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম লিপি থেকে পৃথক ছিলো। তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনা বিশেষ করে ইমারত, নর্দমা, পয়ঃপ্রণালীর ক্ষেত্রে তেমন কোন মিল উভয় সভ্যতায় নেই। শস্যাগার, বৃহৎ স্নানাগারের অস্তিত্ব সুমেরীয় সভ্যতায় পাওয়া যায়নি। চতুর্থত, পোশাক-পরিচ্ছদ, কবর দেয়ার প্রথার ক্ষেত্রেও অনেক অমিল ছিলো। পঞ্চমত, দুই সভ্যতার মধ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ অমিলের দিকে ডি.ডি. কোশাম্বী প্রথম দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছেন তা হলো কৃষিক্ষেত্রের সেচ ব্যবস্থা। কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির ওপরই প্রাচীন নগর সভ্যতাসমূহ দাঁড়িয়েছিলো। কোশাম্বী স্পষ্টতই দেখিয়েছেন যে কৃষি ভূমিতে জলসেচের ক্ষেত্রে দুই সভ্যতা দুটো ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলো। অর্থাৎ দুই সভ্যতার অভিজ্ঞতাই ছিলো ভিন্ন। তাই সুমেরীয়রা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা এ মতও গ্রহণযোগ্য হয়নি।

(গ) মিশ্র জাতি মতবাদ : 

আধুনিককালের কোন কোন গবেষক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বাইরের কোন প্রভাবে নয় ভারত উপমহাদেশের ভিতর থেকেই এক স্বকীয় ধারায় সিন্ধু সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিলো। এখানকার স্থানীয় মানুষেরাই দীর্ঘদিন ধরে এই ধারার সৃষ্টি করেছিলো। আধুনিক এ মতের প্রবক্তা হলেন প্রত্নতাত্ত্বিক এ, এল, ব্যাসাম। তাঁকে সমর্থন করেছেন খ্যাতিমান পুরাতাত্ত্বিক এফ, আর, অলচিন। তাঁর মতে, এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি একটি নগর সভ্যতা গড়ে তোলার পথ সৃষ্টি করেছিলো।
বেলুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশে খননকার্যের ফলে জানা গেছে যে চার থেকে তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই অঞ্চলে কৃষি ভিত্তিক সভ্যতার অস্তিত্ব ছিলো। এ কারণে গর্ডন চাইল্ডের ভাষ্য হলো, সিন্ধু অঞ্চলে নগর সভ্যতা সৃষ্টি ও বিস্তারের পূর্বে এই সংস্কৃতি প্রাথমিক অবস্থায় ছিলো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের আবিষ্কার গর্ডন চাইল্ডের ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ এটা স্বীকৃত হয়েছে যে বেলুচিস্তান ও সিন্ধু অঞ্চলের কৃষি ভিত্তিক সংস্কৃতির ধারকদের সরাসরি যোগাযোগ ছিলো সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের সাথে।
এটা ঠিক যে, ‘হরপ্পা সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলি একই সঙ্গে গড়ে ওঠেনি। একটি বিশেষ অঞ্চলে প্রথম নগর জীবনের সূত্রপাত হয়েছিলো। পরে এ অঞ্চলের অভ্যস্ত মানুষ সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছিলো চারদিকে। এ বিষয়টি সিন্ধুর আমরি অঞ্চলে খননকার্য পরিচালনাকারী ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ ‘কাসাল’ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। দেখা গেছে মূল হরপ্পা সংস্কৃতির পাশাপাশি আমরিরও একটি নিজস্ব সংস্কৃতি ছিলো। তাই কাসাল মনে করেছেন হরপ্পা সংস্কৃতি ধীরে ধীরে আমরির উপর প্রভাব ফেলেছিলো। হরপ্পার নগর দেয়ালের নীচে আমরি সংস্কৃতির মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। আবার মহেঞ্জোদারো সভ্যতার নিম্ন স্তরে বেলুচিস্তান-সংস্কৃতির মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। এসব থেকে অনুমান করা হয় সিন্ধু উপত্যকার সঙ্গে সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের কৃষি সভ্যতার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো।

কোন কোন পণ্ডিতদের মতে, ‘স্থানীয় মানুষ সিন্ধু সভ্যতা সৃষ্টি করলেও এর পেছনে বিদেশী সভ্যতার প্রচ্ছন্ন অনুপ্রেরণা ছিলো। উৎখনন থেকে ধারণা করা যায় পূর্বতন তেমন অভিজ্ঞতার উৎস ছাড়াই হঠাৎ করে যেন এই নগর সভ্যতাটি পরিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছিলো। বিভিন্ন পর্বে উন্নয়নের বিষয়টি তাঁরা তেমন গুরুত্ব দেননি। এ পর্যায়ের গবেষকদের বিচারে বিদেশী সভ্যতার সক্রিয় প্রভাব ছিলো সিন্ধু সভ্যতার উপর। এই ধারণার সপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা বলেছেন, সিন্ধু সভ্যতায় পাওয়া সীলে সিংহের সঙ্গে যুদ্ধরত সম্পূর্ণ নগ্নদেহ বীরের চিত্র খোদিত ছিলো। এই নগ্নতা ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলে না। শিল্পের এই ধারা বিদেশী ঐতিহ্য থেকেই এসেছে। বিশেষ করে প্যালেস্টাইন ও আনাতোলিয়ার ঐতিহ্যের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।’- (ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৩৯ / এ কে এম শাহনাওয়াজ)

তাছাড়া নৃতত্ত্ববিদ ‘ড. গুহ মনে করেন সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা মিশ্র জাতিগোষ্ঠি। নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সাহায্যে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় প্রাপ্ত নরকঙ্কাল, মাথার খুলি ও চোয়ালের পরীক্ষার ভিত্তিতে এ মত প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। এ মতের সমর্থকরা এসব নিদর্শন থেকে সিন্ধু সভ্যতা অন্তত তিনটি মানবগোষ্ঠির দ্বারা গঠিত বলে মনে করেন। এ মানবগোষ্ঠি হচ্ছে প্রোটো-অস্ট্রালয়েড (চ্যাপ্টা নাক, পুরু ঠোঁট, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত), মেডিটারেনিয়ান (ভূমধ্যসাগরীয় জাতি) এবং মঙ্গোলীয় গোত্রের আলপাইন। আলপাইনরা সম্ভবত নেপাল, আসাম ও চীন থেকে সিন্ধুতে এসেছিলো। যদিও দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে এখনো প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ও মেডিটারেনিয়ান জাতির মিশ্রণ দেখা যায়।
তবে এই তিন জাতিগোষ্ঠিই সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা শুধু কঙ্কাল, খুলির ভিত্তিতে তা প্রমাণ করা যায় না। ড. ডি.কে. সেন কোন জাতি গোষ্ঠির নাম উল্লেখ না করে মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, চানহুদারো ও লোথালের কয়েকটি কঙ্কাল পরীক্ষা করে একটি জাতিগোষ্ঠি দ্বারা এ সভ্যতা গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন।’- (সূত্র: সভ্যতার ইতিহাস প্রাচীন ও মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা-১৯৭ / ড. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও মোঃ আব্দুল কুদ্দুস সিকদার)।

(ঘ) দ্রাবিড় সৃষ্ট মতবাদ :

সার্বিক দিক মূল্যায়ন করে আর. ডি. ব্যানার্জি, ফাদার হেরাস, জন মার্শাল সহ  অধিকাংশ ইতিহাসবিদের সিদ্ধান্ত দ্রাবিড় ভাষাভাষী জাতিই সিন্ধু সভ্যতার প্রকৃত স্রষ্টা। এ মতের সপক্ষে তাদের যুক্তি হলো-
প্রথমত, আর্য-পূর্ব যুগে ভারত উপমহাদেশে উত্তর, পশ্চিম এবং সিন্ধু সভ্যতার মুখ্য অঞ্চল উত্তর-পশ্চিম ভারতও দ্রাবিড়দেরই আধিপত্যভুক্ত ছিলো। এর জীবন্ত সাক্ষ্য বর্তমানে বেলুচিস্তানের পাহাড়ি ব্রাহুই উপজাতিরা এখনও দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে। সিন্ধু সভ্যতার মানুষের ভাষার সঙ্গে দ্রাবিড় ভাষারও মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। সিন্ধু লিপির গবেষক ফাদার হেরাস এ ব্যাপারে এক প্রকার নিশ্চিত। দ্বিতীয়ত, সিন্ধুবাসীদের ধর্মীয় আচরণের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিড় সংস্কৃতির মিল পাওয়া গেছে। দুই সংস্কৃতির মানুষ শৈব ও শাক্ত ধর্মে অনুরাগী ছিলো। উভয়ের মধ্যেই বিশেষ করে দেবী পূজা, লিঙ্গ ও শিব লিঙ্গের পূজার প্রচলন থাকায় উভয় সভ্যতা এক গোত্রীয় বলে সিদ্ধান্ত করা হয়। তৃতীয়ত, আর্যরা অনার্যদের পরাজিত করেছিলো বলে ঋগ্বেদে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই অনার্যরাই হচ্ছে দ্রাবিড়। আর্য-পূর্ব ভারতের প্রাচীন জনগোষ্ঠির মধ্যে মুণ্ডা ও দ্রাবিড়দের অবস্থানের কথা নিশ্চিত করেছেন ইতিহাসবিদগণ। এদের মধ্যে ব্যবসা ও বাণিজ্যে পারদর্শী ও উন্নত সংস্কৃতির ধারক ছিলো দ্রাবিড়গণ। সিন্ধু সভ্যতায়ও এ সকল বৈশিষ্ট্য ছিলো। একারণে দ্রাবিড়দের দ্বারা সিন্ধু সভ্যতা গড়ে তোলার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চতুর্থত, দ্রাবিড়দের আদিভূমি দক্ষিণ ভারতের মানুষদের দেহগত নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার আদিবাসীদের মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। সিন্ধুর বিভিন্ন নগরে যে সকল নরকঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে তার সঙ্গে ভারতীয় মুণ্ডা ও দ্রাবিড়দের কঙ্কালের মিল পাওয়া যায়। মুণ্ডাদের চেয়ে দ্রাবিড়দের সঙ্গে বেশি মিলের কারণে প্রাক-আর্য এ সভ্যতাকেই সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা বলে মনে করা হয়।

তবে দ্রাবিড়রাই যে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো এটা নিশ্চিতভাবে বলায় সমস্যা রয়েছে। কারণ দ্রাবিড় সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই সিন্ধুবাসীদের গড়ে তোলা সংস্কৃতির অনুরূপ ছিলো না। এমন কয়েকটি নির্ণীত বৈসাদৃশ্য হচ্ছে-
প্রথমত, দ্রাবিড়দের আদিবাস ছিলো নর্মদা নদীর দক্ষিণে। কিন্তু দক্ষিণ তীরের ভূভাগে কোথাও সিন্ধু সভ্যতার সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার উৎস ও বিস্তার ঘটেছিলো নর্মদা নদীর উত্তর তীরে। দ্বিতীয়ত, মৃতদেহ সমাহিত করা বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পদ্ধতিতে দুই সংস্কৃতির মদ্যে যথেষ্ট অমিল ছিলো। তৃতীয়ত, কারও কারও মতে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে ওঠার অনেককাল পরে ভারতে দ্রাবিড়রা এসেছিলো। তাদের মতে দ্রাবিড়রা ভারতের আগন্তুক জাতি। এই মতের সপক্ষে বড় প্রমাণ ভারতে দ্রাবিড়দের প্রধান আবাসভূমি দক্ষিণ ভারতে পাওয়া দ্রাবিড়দের তৈরি পাথরের স্থাপত্যিক নিদর্শন। এগুলো বড়জোর এক হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৈরি বলে মনে করা হয়। চতুর্থত, বেলুচিস্তানের ব্রাহুই জাতি দ্রাবিড় ভাষায় কথা বললেও তারা তুর্কি-ইরানি মিশ্রিত উপজাতি, প্রকৃত দ্রাবিড় ভাষী নয়। তাই ভাষার মিলের ভিত্তিতেও ব্রাহুই জাতিকে সিন্ধু সভ্যতার নির্মাতা বলা যায় না।

তবে ‘আধুনিককালে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উৎখননের ফলে সিন্ধু সভ্যতার উৎপত্তি সম্বন্ধে বেশ কিছু নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে। এসব বিচারে মনে করা হয় তিনটি ভিন্ন স্তরে হরপ্পা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিলো। প্রথমটি প্রাক্-হরপ্পা পর্যায়, দ্বিতীয়টি হরপ্পা পর্যায়ের প্রথম পর্ব এবং তৃতীয়টি হরপ্পা সংস্কৃতির চূড়ান্ত বিকাশ পর্ব। প্রাক্-হরপ্পা পর্যায়ে নবোপলীয় গ্রাম সংস্কৃতির অবসানের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নগর সভ্যতার সূচনা ঘটেছিলো। পরে হরপ্পা সংস্কৃতির যখন বিকাশ ঘটেছিলো তখন পাশাপাশি কোথাও গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারা লক্ষ করা গিয়েছে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হরপ্পা সংস্কৃতি বিকাশের চূড়ান্তে পৌঁছে।’- (ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৪০ / এ কে এম শাহনাওয়াজ)।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : সিন্ধু-সভ্যতা, তার আবিষ্কার ও বিস্তৃতি] [*] [পরের পর্ব : সিন্ধু-সভ্যতার নগর-পরিকল্পনা, ভাস্কর্য ও শিল্পকলা এবং অর্থনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,672 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: