h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০২ : সিন্ধু-সভ্যতা, তার আবিষ্কার ও বিস্তৃতি|

Posted on: 01/07/2015


1970719_797339626946923_1204339611_n

| প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-০২ : সিন্ধু-সভ্যতা, তার আবিষ্কার ও বিস্তৃতি |
রণদীপম বসু

২.০    : সিন্ধু সভ্যতা

শুরুতে এ সভ্যতা সিন্ধু নদ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বলে সভ্যতাটির নাম রাখা হয় ‘সিন্ধু-সভ্যতা’। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর মধ্যে প্রথম হরপ্পায় খননকার্য হয় বলে অনেকে একে ‘হরপ্পা-সভ্যতা’ বলেন। যদিও এ সভ্যতা শুধু সিন্ধু নদ কিংবা হরপ্পায় সীমাবদ্ধ ছিলো না। তবে সিন্ধু নদের তীরে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বিবেচনায় অনেক দিন থেকেই অনুসন্ধান চলছিলো। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম হরপ্পা অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন করা হয়। পশ্চিম পাঞ্জাবের মন্টোগোমারি জেলার ইরাবতি নদীর পূর্ব উপকূলে হরপ্পার অবস্থান। পরের বছর উৎখনন করা হয় মহেঞ্জোদারো অঞ্চলে। পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলার খয়েরপুর বিভাগে মহেঞ্জোদারোর অবস্থান। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর দূরত্ব প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার। এর পর থেকে ক্রমাগত খনন কাজ চলতে থাকে। এভাবে ক্রমে বেরিয়ে আসে এই সভ্যতার চমৎকার সব নিদর্শন। এই প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে প্রমাণ হতে থাকে যে সিন্ধু সভ্যতা শুধুমাত্র হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারো নগর দুটোকে ঘিরে বেড়ে ওঠেনি। দূরবর্তী আরও অনেক অঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটেছিলো।


২.১ : সভ্যতার আবিষ্কার
বহুসংখ্যক প্রত্নস্থান আবিষ্কার হওয়ায় বর্তমান ভারত ও পাকিস্তানের বিশাল এলাকা জুড়ে এ সভ্যতার বিস্তৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিংশ শতাব্দির তৃতীয় দশকের শুরুতে সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হলেও এ অঞ্চলে পুরাকীর্তি প্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো আরও প্রায় এক শতাব্দি আগে। জানা যায়-

আনুমানিক ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে চার্লস ম্যাসন (Charles Masson) পাঞ্জাবে মহারাজা রণজিৎসিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের দিক থেকে একটি সম্ভাবনাময় ঢিবি দেখেছিলেন হরপ্পায়। অতঃপর ভারতের প্রত্নতত্ত্ববিভাগের প্রধান এবং ভারতে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার পথ প্রদর্শক মেজর জেনারেল কানিংহাম (Sir Alexander Cunningham) ১৮৫৩ থেকে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কয়েকবার জায়গাটি পরিদর্শন করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি সচিত্র রিপোর্টও প্রকাশ করেছিলেন। রিপোর্টে সিন্ধু সভ্যতার সুপরিচিত সীল সহ কিছু ছুরির ফলার ছবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কানিংহামের এই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রথম পর্যায়ে গবেষকদের তেমন আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি। এই ঘটনার প্রায় অর্ধশত বৎসর পর মহেঞ্জোদারো অঞ্চলে আবার প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চলে। এখানেও পাওয়া যায় একই ধরনের সীল। এবার এই নিদর্শনসমূহ বিখ্যাত পত্রিকা ‘ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজে’ প্রকাশিত হয়। এতে সাড়া পড়ে যায় চারদিকে। প্রত্নতত্ত্বে উৎসাহী বিশেষজ্ঞগণ ছুটে আসেন ভারতে। ইতোমধ্যে মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া সীলসমূহ সবার নিকট পরিচিত হয়ে উঠেছিল। পণ্ডিতগণ হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া সীলগুলোর সঙ্গে এর কিছুটা মিল খুঁজে পেলেন।
সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারে প্রথম ভূমিকা রাখেন বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বহুকাল আগেই মহেঞ্জোদারোর প্রাচীন ঢিবিকে তিনি অনুমান করেছিলেন কোন বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলে। এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে তিনি খননকার্য পরিচালনা করেন ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু মাটির গভীর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মৃৎপাত্র আর পাথরের শিল্পকর্ম। তিনি সহজেই অনুমান করেন সঠিক উৎখনন কার্য চালাতে পারলে নিশ্চয়ই প্রাচীন কোন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাবে। প্রায় একই সময়ে (১৯২১ খ্রিস্টাব্দে) মহেঞ্জোদারো থেকে প্রায় সাড়ে ছয়শত কিলোমিটার দূরে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন কার্য পরিচালনা করেছিলেন পণ্ডিত দয়ারাম সাহনি। এই অঞ্চল থেকেও একই প্রকার প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হয়। এবার ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। এই বিভাগের প্রধান স্যার জন মার্শাল (Sir John Marshall) খনন কার্য চালাতে থাকেন মহেঞ্জোদারোতে। কয়েক বৎসর পর আর্ণেস্ট ম্যাকে (Arnest Mackey) তাঁর সঙ্গে এসে যোগ দেন। হরপ্পায় খননকার্য চালাতে থাকেন এম, এস, ভাট (M.S.Vat)। এ পর্যায়ে মহেঞ্জোদারোতে কাজ চলে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, আর হরপ্পাতে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ‘আর্কিওলোজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার’ নতুন মহাপরিচালক স্যার মরটিমার হুইলার (Mortimer Wheelir) দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৪৬-৪৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি মহেঞ্জোদারোতে খননকার্য পরিচালনা করেন। এভাবে অব্যাহত খননকার্যের ফলে মহেঞ্জোদারোতে কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরের সন্ধান মেলে। এক একটি স্তরে পাওয়া যায় সিন্ধু সভ্যতার এক এক পর্যায়ের সংস্কৃতির নিদর্শন।
হরপ্পায় এম, এস, ভাট খনন কার্য চালান ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে। পরে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে এখানেও যোগ দেন মরটিমার হুইলার। বোঝা যায় মহেঞ্জোদারোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শনের ভাণ্ডার রয়েছে হরপ্পাতে। নিশ্চিত হওয়া যায় মহেঞ্জোদারোর চেয়ে আরও প্রাচীন ছিল হরপ্পার সংস্কৃতি।
হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা আবিষ্কৃত হওয়ার পর দুই নগরীর অবস্থানগত গুরুত্ব অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে। দুটো নগরীতেই বিভিন্ন পর্যায়ে মনুষ্য বসতি হয়েছে। তাই মাটির বিভিন্ন স্তরে-স্তর বিন্যাস স্পষ্ট। মহেঞ্জোদারোতে যে কয়টি স্তর উৎখনন করা হয়েছে তার মধ্যে কালের ব্যবধান হচ্ছে মাত্র ৬০০ বৎসর। সবচেয়ে নীচের স্তরের বয়স হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ১৯৬৩ অব্দ আর একেবারে উপরের স্তরের বয়স হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ১৬৫০ অব্দ। অন্যদিকে হরপ্পা নগরীর সবচেয়ে নীচের স্তর গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব ২২৪৫ অব্দে। এই নগরীর একেবারে উপরের স্তরের বয়স হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ১৯৬০ অব্দে। তবে দুই নগরীকে একীভূত করে সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্যার জন মার্শাল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে সিন্ধু সভ্যতার সর্বাপেক্ষা প্রাচীন অবস্থান ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ অব্দের মধ্যে। মার্শালের এই পিছিয়ে যাবার প্রধান কারণ হচ্ছে ভূতত্ত্ববিদগণের অনুমান। কারণ তাঁরা মনে করেন প্রাপ্ত মাটির স্তরের নীচে আরও স্তর ছিল যাকে নিম্নস্তরের পানি গ্রাস করেছে। প্রাপ্ত অনেক প্রত্নবস্তু এই অনুমানকে সমর্থন করে।- সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপরে উল্লিখিত প্রত্নতাত্ত্বিকগণের সঙ্গে কাশীনাথ দীক্ষিত এবং ননীগোপাল মজুমদারের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’- (এ কে এম শাহনাওয়াজ / ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৩৩-৩৪)।

২.২ : সিন্ধু-সভ্যতার বিস্তৃতি
আবিষ্কারের শুরুর দিকে অনুমান করা হয়েছিলো সিন্ধু উপত্যকাকে ঘিরেই সিন্ধু-সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিলো। সে কারণেই এই সভ্যতার নামকরণ হয়েছিলো সিন্ধু-সভ্যতা। কিন্তু ক্রমে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য বৃদ্ধি পেলে ধীরে ধীরে এ ধারণা পাল্টাতে থাকে। পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন অংশে উৎখননের ফলে আরও অনেক প্রত্নক্ষেত্রের সন্ধান মিলেছে। এসমস্ত অঞ্চলের বস্তু সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সংস্কৃতির সঙ্গে ছিলো অভিন্ন। এ কারণে সিন্ধু সভ্যতার পরিধি ও বিস্তৃতি অনেক ব্যাপক হয়েছে। সিন্ধু সভ্যতা যে অনেক বিস্তৃত হতে পারে তা ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে স্যার জন মার্শাল অনুমান করেছিলেন।’- (এ কে এম শাহনাওয়াজ / ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৩৫)।

১৯৪৭-এ হুইলার মন্তব্য করেন, আরব্য-উপসাগরের কিনারা থেকে সিমলা পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত হাজার মাইল ব্যবধানের মধ্যে অন্তত ৩৭টি জায়গায় হরপ্পাসংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত প্রত্নতত্ত্ব-লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে পিগট বলেন, মাক্রান-কিনারা থেকে কাথিওয়াড় পর্যন্ত এবং উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত ৯৫০×৭০০×৫০০ মাইল মাপের মোটামুটি একটি ত্রিভুজের মতো এলাকা জুড়ে প্রায় চল্লিশটি গ্রাম ও নগরের ধ্বংসাবশেষ থেকে হুবহু একই রকমের প্রত্নতত্ত্বমূলক নানা নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। ১৯৫৪ সালে চাইল্ড মন্তব্য করেন, হরপ্পা-যুগের সিন্ধু সভ্যতার পরিধি বলতে ‘প্রাচীন সাম্রাজ্য’-যুগের মিশর-সভ্যতার অন্তত দ্বিগুণ এবং সুমের ও আক্কাদ এর সম্ভবত চারগুণ মনে করা যায়।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় / ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৪৬)।

উৎখননের রিপোর্ট থেকে জানা যায় কমপক্ষে ৭০টি অঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার ছিল। মনে করা হয় সিন্ধু সভ্যতা আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূলে অবস্থিত সুতকাজেনদোর অঞ্চলের প্রত্নস্থল এর সাক্ষ্য দেয়। সিন্ধু ও পাঞ্জাব ছাড়াও ভারত উপমহাদেশের আরও অনেক অঞ্চলেই সিন্ধু সভ্যতার অনুরূপ সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়ায় এ সমস্ত অঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার ঘটেছিল বলে বর্তমানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রত্নস্থলসমূহ হচ্ছে গুজরাটের লোথাল, দেশলপার, রাজস্থানের কালিবঙ্গান, শতদ্রু নদীর তীরে রূপার, উত্তর-প্রদেশের মীরাট জেলায় অবস্থিত আলমগীরপুর, হরিয়ানার বানাওয়ালি, মিতথাল প্রভৃতি। পাকিস্তানের বেশ কিছু অঞ্চলে (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো ছাড়া) সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সরাইখোলা, গুমলা, মুন্ডিগাক, রানাঘুনতাই, ডাবরকোট, ডামরসাদাত, ভাবলপুর, কোটদিজি, চানহুদারো, কুল্লি, বালাকোট, আল্লাহদিন, আমরি, কোয়েটা, মেহের গড়, নওশাহরো, পিরক, দেরাওয়ার, ঝুকার ইত্যাদি।
সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃত অঞ্চলের অনেক জায়গায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল বেশ প্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক কালপর্ব থেকে এ সমস্ত অঞ্চলে মানব বসতি ছিল এবং সভ্যতা গড়ায় এ সমস্ত অঞ্চলের মানুষ ভূমিকা রেখেছে। এরকম আদি সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে বেলুচিস্তানের কিলিগুল মুহম্মদ নামক স্থানে। এখানে প্রাপ্ত প্রত্ন নিদর্শনসমূহ ৩৬৮৮ থেকে ৩৭১২ বছরের পুরোনো। এই অঞ্চলের মানুষেরা রোদে শুকানো ইট দিয়ে ঘর বানাতো এবং গরু, ছাগল ও মেষ পালন করতো। পাথরে তৈরি কিছু দ্রব্যাদিও পাওয়া গিয়েছে। এ অঞ্চলের অধিবাসীরা হাতে তৈরি মৃৎপাত্র ব্যবহার করতো। পরবর্তী সময়ে কুমোরের চাকায় মসৃণ মৃৎপাত্র তৈরি করা হয় এবং এর উপরে লাল ও কালো রঙের জ্যামিতিক নকশা অঙ্কন করা হয়। ধারণা করা হয় সিন্ধু সভ্যতার পত্তন ঘটার পূর্বে এখানে নবোপলীয় যুগের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল।’
‘আমরি, কোটদিজি, হরপ্পা ও কালিবঙ্গানে সিন্ধু সভ্যতার প্রস্তুতি পর্বের সংস্কৃতি লক্ষ করা গিয়েছে। আমরি অঞ্চলে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালান ননীগোপাল মজুমদার। এখানে নিম্নতম স্তরে পাওয়া গিয়েছে নানা আকারের মৃৎপাত্র, পাথরের তৈরি ছুরির ফলা এবং কিছু তামা ও ব্রোঞ্জের টুকরো। উপরের দিকের স্তরে পাওয়া গিয়েছে রোদে শুকানো ইট ও পাথরে তৈরি ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। চাকায় তৈরি মসৃণ ও নকশা কাটা মৃৎপাত্রও পাওয়া গিয়েছে। প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে জানা যায় আমরি অঞ্চলের মানষেরা পশুপালন ও কৃষিজীবনে অভ্যস্ত ছিল। আমরি থেকে দেড়শ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে কোটদিজির অবস্থান। এখানে ১৯৫৫-৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন করেন ড. এফ.এ. খান। আমরির মতোই সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে এখানে। ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২৬০৫ অব্দে এখানে মানব বসতি ছিল। পরে এখানে একটি মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। কোটদিজি থেকে প্রায় সাড়ে চারশত কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে কালিবঙ্গানের অবস্থান। এখানে উৎখনন করা হয় ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে। আমরি ও কোটদিজির মতো এখানেও পাকা ঘরবাড়ি পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন ব্যবহার্য দ্রব্য এবং মাটির গুটিকায় তৈরি গলার হার। এখানে সংখ্যায় অল্প হলেও ধাতুর তৈরি অলঙ্কার ও কুঠার পাওয়া গিয়েছে। কালিবঙ্গানে কালো ও লাল রঙের অনেক মৃৎপাত্রের সন্ধান মিলেছে। কালিবঙ্গান সিন্ধুসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের মধ্যে।’- (এ কে এম শাহনাওয়াজ / ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৩৬)।

এভাবে দেখা যায় যে, উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে ক্যাম্বে উপসাগর, আরব সাগর এবং পশ্চিমে ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে পূর্বে ভারতের উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিলো সিন্ধু-সভ্যতার পরিধি। এর মোট আয়তন প্রায় তের লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন।

(চলবে…)

[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীন ধারা] [*] [পরের পর্ব : সিন্ধু-সভ্যতার স্রষ্টা]

[ চার্বাকের খোঁজে- অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,672 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: