h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|চার্বাকের খোঁজে-০৪ : ভারতীয় বিভিন্ন দর্শন-সম্প্রদায়|

Posted on: 19/06/2015


images_12

|চার্বাকের খোঁজে-০৪ : ভারতীয় বিভিন্ন দর্শন-সম্প্রদায়|
রণদীপম বসু

৪.০ : বিভিন্ন দর্শন-সম্পদায়

প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায়গুলিকে যে দুটি পঙক্তিতে তালিকাভুক্ত করা হয় তা হলো- (ক) নাস্তিক দর্শন-সম্প্রদায় ও (খ) আস্তিক দর্শন-সম্প্রদায়।

নাস্তিক দর্শন-সম্প্রদায়ের অগ্রভাগেই আছে চার্বাক-দর্শন; বিভিন্ন দার্শনিক-সাহিত্যে চার্বাককে নাস্তিক-শিরোমণি হিসেবেও আখ্যায়িত করতে দেখা যায়। চার্বাক ছাড়া বাকি দুটি নাস্তিক সম্প্রদায় হলো- জৈন-দর্শন ও বৌদ্ধ-দর্শন।
অন্যদিকে প্রচলিত মতে বেদবিহিত অর্থাৎ বৈদিক-সংস্কৃতির অনুসারী আস্তিক দর্শন-সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত দর্শন ছয়টি বলে এগুলি একসাথে ষড়্দর্শন নামেও বহুল পরিচিত। এই ষড়দর্শনের অন্তর্ভুক্ত দর্শনগুলি হলো- ন্যায়-দর্শন, বৈশেষিক-দর্শন, সাংখ্য-দর্শন, যোগ-দর্শন, পূর্ব-মীমাংসা বা মীমাংসা-দর্শন এবং উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্ত দর্শন।
ভারতীয় দর্শনের এই বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলির অতি সংক্ষিপ্ত কিছুটা পরিচয় জেনে রাখলে আমাদের পরবর্তী আলোচনা আত্মস্থ করতে অনেকটা সুবিধাজনক ও চিত্তাকর্ষক হবে।

(ক) নাস্তিক দর্শন সম্প্রদায় :
যেহেতু আমাদের লক্ষ্যই হলো চার্বাকের খোঁজ করা, তাই বর্তমান গ্রন্থে আমাদের এখনকার ও পরবর্তী যাবতীয় উদ্যোগের মূল কেন্দ্রই হচ্ছে চার্বাক-মতের একটা যৌক্তিক রূপরেখা প্রণয়ন-প্রত্যাশা। সেক্ষেত্রে চার্বাক-দর্শনের আগাম পরিচয় উপস্থাপন অতি-স্বাভাবিক কারণেই প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ইতিহাস ঐতিহ্য দৃষ্টান্ত সহ সন্তোষজনক কোন ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনার অপেক্ষা রাখে। তবু আমরা প্রচলিত চিন্তাধারায় চার্বাক-দর্শনের প্রাথমিক পরিচয়সহ বাকি সম্প্রদায়গুলির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জেনে নিতে পারি।

চার্বাক-দর্শন
চার্বাকের মূল তত্ত্বগুলির সংক্ষিপ্ত-সার আগেই বলা হয়েছে। তবু আরেকটু যদি বলতে হয়, চার্বাককেই নামান্তরে লোকায়ত বা বার্হস্পত্য দর্শন বলে উল্লেখ করার নজির আছে। বার্হস্পত্য মানে বৃহস্পতি-প্রতিষ্ঠিত দর্শন। বৌদ্ধশাস্ত্র, মহাভারত, মনুস্মৃতি প্রভৃতির নজির থেকে অনায়াসেই অনুমান করা যায়, সম্প্রদায়টির ইতিহাস সুপ্রাচীন। কিন্তু এ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব কোন রচনা আবিষ্কৃত হয়নি এবং হবার সম্ভাবনাও নেই বলে মনে হয়। অথচ এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে এককালে এ-জাতীয় রচনা সত্যিই প্রচলিত ছিলো। আর তাই সন্দেহ প্রযুক্ত হয় যে হয়তো বা বিপক্ষ-মতাবলম্বীরা স্বেচ্ছায় তা ধ্বংস করেছিলেন। কিন্তু এ-সন্দেহ প্রমাণসাপেক্ষ হোক আর নাই হোক, মোটের উপর আজকের দিনে অন্যান্য বিপক্ষ-সম্প্রদায়ের রচনা সম্ভার থেকেই এই সম্প্রদায়টির পরিচয় সংগ্রহ করতে বাধ্য হতে হয়। অর্থাৎ, অন্যান্য সম্প্রদায়ের দার্শনিকরা চার্বাক বা লোকায়ত-মতের খণ্ডন-প্রসঙ্গে যে-সব উক্তি করেছেন তা থেকেই ওই সুপ্রাচীন সম্প্রদায়টির প্রকৃতরূপ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা নিতে হয়। স্বভাবতই এ-প্রচেষ্টা সমস্যা-কণ্টকিত। কেননা প্রথমত, এ-জাতীয় বিপক্ষ-উক্তিগুলি খণ্ড ও বিক্ষিপ্ত- বিভিন্ন সমস্যার আলোচনা-প্রসঙ্গে পূর্বপক্ষ হিসেবে চার্বাক বা লোকায়ত মতের যে উল্লেখ রয়েছে, এ-জাতীয় উল্লেখের মধ্যে সব সময় খুব সুস্পষ্ট সঙ্গতিও নেই। দ্বিতীয়ত, এই উল্লেখগুলি অত্যন্ত প্রকটভাবেই বিরুদ্ধ ও বিরূপ মনোভাবের পরিচায়ক যে, অনেক সময় এমনকি ওই প্রাচীন সম্প্রদায়টিকে নেহাতই উপহাস-পরিহাসের বিষয় বলে প্রতিপন্ন করবার প্রচেষ্টাই হয়েছে। তাই বিপক্ষ-সম্প্রদায়ের এ-জাতীয় বিরুদ্ধ-সাক্ষ্যগুলির উপর নির্বিচারে নির্ভর করা যায় না। তৃতীয়ত, প্রাচীনতর নিদর্শনগুলির মধ্যে আলোচ্য সম্প্রদায়টি সম্বন্ধে যেটুকু উল্লেখ তাও অনেকাংশে পৌরাণিক কল্পনায় আচ্ছন্ন হতে দেখা যায়; তা থেকে প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ধার করা খুবই সযত্ন-প্রচেষ্টা-সাপেক্ষ।

এ-জাতীয় নানা সমস্যা সত্ত্বেও এটুকু অন্তত নিঃসন্দেহে বলা যায়, চার্বাক বা লোকায়ত বলতে প্রাচীনকালের কোনো এক বস্তুবাদী বা জড়বাদী দার্শনিক সম্প্রদায় বোঝাতো। আধুনিক যুগের বস্তুবাদের সঙ্গে ওই প্রাক্-বৌদ্ধ যুগের সুপ্রাচীন বস্তুবাদের অভিন্নত্ব প্রত্যাশা করা যায় না অবশ্যই। তবু নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, এই সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা আত্মা নামক ইন্দ্রিয়াতীত সত্তা অস্বীকার করে জড়দেহকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করেছিলেন এবং তাঁদের মতে ঈশ্বর ও পরলোকের কথা কল্পনামাত্র। তাঁরা এও দাবি করেছেন, বেদ বা শ্রুতির কোনো প্রামাণ্য নেই, এবং বৈদিক যাগযজ্ঞ শুধু অর্থহীনই নয়- প্রবঞ্চনামূলকও। তাছাড়া এটাও ধারণা করা হয় যে, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে এই চার্বাকেরাই যুক্তিবিদ্যা বা তর্কবিদ্যার প্রবর্তন করেছিলেন, যদিও এ-বিষয়ে তাঁদের প্রকৃত বক্তব্যের প্রায়ই এক বিকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নীতিবোধ সম্বন্ধেও বহু কুৎসা প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও চার্বাক বা লোকায়তিকদের কোনো এক সুস্থ নীতিবোধের ইঙ্গিত উদ্ধার করা অসম্ভব নয় বলে আধুনিককালের বিদ্বান গবেষকেরা মনে করেন।

জৈন-দর্শন
ভারতের প্রাচীনতম অসনাতন নাস্তিক্য ধর্মদর্শনের অন্যতম হচ্ছে জৈনদর্শন। ‘জিন’ শব্দ থেকে জৈন শব্দের উৎপত্তি। ‘জিন’ অর্থ বিজয়ী। যিনি ষড়রিপুকে জয় করেছেন, তিনিই জিন। জৈনদের মতে, যথার্থ সাধনার বলে রাগ, দ্বেষ, কামনা বাসনা জয় করে যাঁরা মুক্তি বা মোক্ষলাভ করেছেন তাঁরাই জিন। জৈন ঐতিহ্যে এজাতীয় চব্বিশজন মুক্ত পুরুষের পারম্পর্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, যাঁদেরকে তীর্থঙ্কর বলা হয়। এই পরম্পরায় চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মধ্যে সর্বপ্রথম হলেন ঋষভদেব এবং সর্বশেষ হলেন বর্ধমান বা মহাবীর। মহাবীর ছিলেন গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক। তাই জৈন ঐতিহ্যের ওই চব্বিশজন তীর্থঙ্করের পারম্পর্য ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলে জৈনধর্মকে অত্যন্ত প্রাচীন বলে স্বীকার করতে হবে।

জৈনরা বেদও মানেন না, ঈশ্বরও নয়। প্রত্যেক জীবই জিনদের পন্থা অনুসরণ করে বন্ধনমুক্ত হতে পারে বলে তাঁদের বিশ্বাস। দার্শনিক দৃষ্টিতে জৈনদের নিজেদের মধ্যে কোন ভেদ না থাকলেও পরবর্তীকালে জৈনধর্ম দু’টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যায় আচারগত দৃষ্টিতে কিছুটা ভিন্নতা সৃষ্টি হওয়ায়। জৈনমতের এই দু’টি অবান্তর ভেদ হচ্ছে- শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর।
দিগম্বর সম্প্রদায়ের যতি বা সন্ন্যাসীরা নিজ শরীরের আচ্ছাদনের জন্য বস্ত্রের উপযোগ গ্রহণ করেন না, তাঁরা সর্বদা নগ্ন থাকেন। কিন্তু শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের যতিরা সাদা বস্ত্র পরিধান করেন। আচারগত ধর্মানুষ্ঠানের খুঁটিনাটি ভিন্নতা ছাড়া উভয় সম্প্রদায়ের মূল ধর্মসূত্র অভিন্ন।

জৈনদর্শনের মূল কথা হলো, সাধারণ অভিজ্ঞতায় আমরা জগতকে যেভাবে জানি তাই সত্য ও যথার্থ। জগতে বস্তুর অস্তিত্ব আছে, অতএব কোনো এক বা অদ্বিতীয় পরমসত্তার কল্পনা করা নিরর্থক। এই বস্তুসমূহ প্রধানত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত, জীব এবং অজীব। দেহ যেমনই হোক না কেন, প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুর মধ্যেই জীব বা আত্মা আছে। এই আত্মা অবিনাশী, কিন্তু ঈশ্বরের সৃষ্ট নয়। জীবন্ত প্রাণী হত্যা না করা তথা সমস্ত জীবের প্রতি ঐকান্তিক অহিংসাই জৈনধর্মের অপরিহার্য মূলনীতি। জৈনরা বেদ ও উপনিষদে বিবৃত কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয়। যেমন তাঁরা পুনর্জন্মবাদ ও কর্মবাদে বিশ্বাস করতেন এবং মেনে নিয়েছিলেন যে কৃতকর্মের ফল অনুযায়ী জীবের জন্ম হয়। জন্মান্তরে আত্মা ইতর প্রাণী, মানুষ, দেবতা কিংবা দৈত্যের দেহ ধারণ করতে পারে। এই মতে মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মের দাসত্ব হতে মুক্ত হয়ে উর্ধ্বগতি লাভ করতে পারে, পূর্ণ মুক্তি পেতে হলে দেবতারও মানুষের ঘরে পুনর্জন্ম লাভ করা দরকার। তবে সবকিছু ছাপিয়ে জৈনরা অহিংসাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

জৈনদর্শনে প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ ভেদে তিন প্রকার প্রমাণ স্বীকার করা হয়। প্রত্যক্ষ হচ্ছে সকলের স্বীকৃত প্রমাণ। লোকব্যবহারের দৃষ্টিতে জৈনরা অনুমানকে প্রামাণিক বলে স্বীকার করেন এবং তীর্থঙ্করদের উপদেশবাক্যকে শব্দ প্রমাণ বলে মনে করেন। শব্দের অন্য নাম হচ্ছে আগম।

দার্শনিক তত্ত্ব এবং এমনকি যুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রেও জৈনদের অহিংসা-নীতির প্রভাব চোখে পড়ে। কেননা দার্শনিক তত্ত্ব বিচারেও জৈনরা বিপক্ষ-মতের প্রতি এক অদ্ভূত সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের দর্শনের একটি মূল কথা হলো অনেকান্তবাদ। এই অনেকান্তবাদের ব্যাখ্যাটা এরকম,- সত্তা বহুমুখী, অতএব বিবিধভাবে তা বর্ণিত হতে পারে- তার মধ্যে কোনো বর্ণনাই মিথ্যা নয়, আবার কোনো বর্ণনাই একমাত্র সত্য নয়। তাঁদের তর্কবিদ্যার একটি মূলকথা হলো স্যাৎবাদ। এই স্যাৎবাদ কী? এই মতে, সত্তার বহুমুখী দিক সম্বন্ধে সামগ্রিক উক্তি একমাত্র পূর্ণজ্ঞানীর পক্ষেই সম্ভব। আমরা পূর্ণজ্ঞানী নই; অতএব প্রত্যেক বিষয়ে আমাদের প্রতিটি উক্তিই শেষ পর্যন্ত সম্ভাবনামূলক। এই সম্ভাবনার নির্দেশক শব্দ হলো স্যাৎ। স্যাৎ মানে কোনোভাবে সম্ভব। অতএব প্রত্যেক উক্তির সঙ্গে স্যাৎ শব্দ যোগ করা প্রয়োজন। তাছাড়াও, সমস্তরকম বিকল্প-সম্ভাবনার কথা মনে রাখাও প্রয়োজন। অতএব কোনো বিষয়ে শুধু অস্তি (=আছে) বা নাস্তি (=নাই) বলা ঠিক নয়। তার বদলে একই বিষয়ে বলতে হবে- স্যাৎ অস্তি (সম্ভবত আছে), স্যাৎ নাস্তি (সম্ভবত নাই), স্যাৎ অস্তি চ নাস্তি চ (সম্ভবত আছেও নেইও), স্যাৎ অব্যক্তম্ (সম্ভবত অবক্তব্য), স্যাৎ অস্তি চ অব্যক্তম্ চ (সম্ভবত আছেও অবক্তব্যও), স্যাৎ নাস্তি চ অব্যক্তম্ চ (সম্ভবত নেইও অবক্তব্যও), স্যাৎ অস্তি চ নাস্তি চ অব্যক্তম্ চ (সম্ভবত আছেও, নেইও, অবক্তব্যও)। স্যাৎ-বাদ বুঝাতে জৈনাচার্যগণ এই যে সাতটি পরামর্শ বা বাক্যের প্রয়োগ করেন, প্রত্যেক বাক্যকে এক একটি ‘ভঙ্গি’ নামে ডাকা হয় এবং সাত প্রকার বাক্যকে একত্রে সপ্তভঙ্গি বলা হয়। এর পূর্ণনাম ‘সপ্তভঙ্গিনয়’।

বলা বাহুল্য, অহিংসা নীতির প্রভাবে উদ্বুদ্ধ হলেও ভারতীয় দর্শনে এ জাতীয় তর্কবিদ্যার চিত্তাকর্ষক বিকাশ ঘটেছিলো। কোন কোন গবেষক অনুমান করেছেন, জৈনদের এই স্যাৎ-বাদের মধ্যেই আধুনিক স্ট্যাটিসটিকস বিজ্ঞানের মূলসূত্রের আভাস পাওয়া যায়।

বৌদ্ধ-দর্শন
ভারতীয় দর্শনের যে সকল সম্প্রদায় বেদভিত্তিক উপনিষদীয় চিন্তাধারার বিরোধিতা করেছেন, বৌদ্ধরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী সম্প্রদায়। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে যখন উপনিষদীয় চিন্তাধারা কর্মমীমাংসা ও ব্রহ্মমীমাংসার বিরোধে ধর্মসংকটের ন্যায় তত্ত্বসংকটের সম্মুখীন হয় তখন শাক্যবংশীয় রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের কঠোর তপস্যালব্ধ সত্যের অনুসারী এক বেদবিরোধী সম্পদায় দর্শনের আঙিনায় আবির্ভূত হন। এই সম্প্রদায়ই ‘বৌদ্ধ সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত। বুদ্ধ উপনিষদীয় কর্মকাণ্ড ও ব্রহ্মকাণ্ডের চুলচেরা যুক্তিতর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ না থেকে এবং জড়বাদ ও নাস্তিকতার দার্শনিক সমস্যায় মগ্ন না থেকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য এক আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন। এই আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা বেদভিত্তিক না হয়েও সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা নিবৃত্তির সহায়ক হয়েছিলো। ধীরে ধীরে এই চিন্তাধারার প্রভাব এতো বিস্তার লাভ করেছিলো যে ভারতের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি ধর্মজীবনকেও তা আলোড়িত করেছিলো। নিরীশ্বরবাদী হওয়া সত্ত্বেও উচ্চমানের আধ্যাত্মিকতার প্রচার বৌদ্ধ চিন্তাধারার প্রতি সাধারণ মানুষকে অতিমাত্রায় আকৃষ্ট করে। এই বৌদ্ধপ্রভাবকে প্রতিহত করার জন্যই পরবর্তীকালে উপনিষদভিত্তিক বেদান্তের নতুন করে ভাষ্য রচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। জনমানসে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছিলো বলেই বেদানুসারী হিন্দু দর্শনে এই মতবাদ খণ্ডনের জন্য বিশেষ যত্ন লক্ষ্য করা যায়।

সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের (৫৬৩-৪৮৩ খ্রিস্টপূর্ব) প্রচারিত মতবাদ থেকেই বৌদ্ধ দর্শন নামের সূত্রপাত। বুদ্ধ নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। অন্যান্য ধর্মের শাস্ত্র যেমন, বৌদ্ধ শাস্ত্রও তেমনি এককালে একজনের দ্বারা লিখিত হয়নি। বুদ্ধের দেহত্যাগের অল্পদিন পরেই প্রবীণ শিষ্যরা তাঁর উপদেশ ও শিক্ষাবলী আবৃত্তি করবার উদ্দেশ্যে রাজগৃহের সপ্তবর্ণী-গুহায় স্থবির মহাকাশ্যপের নেতৃত্বে মিলিত হন। এই সম্মেলন বৌদ্ধ সঙ্ঘ-ইতিহাসে প্রথম ধর্মসঙ্গীতি নামে পরিচিত। এই সময় থেকে বুদ্ধের বাণী সংগৃহীত ও মুখে মুখে বিস্তৃত হতে আরম্ভ করে। বুদ্ধের নির্বাণের প্রায় একশ বছর পরে অনুমান খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৩ অব্দে মহারাজ কালাশোকের রাজত্বকালে বৈশালীতে সঙ্ঘের দ্বিতীয় সম্মেলন হয়। ইতোমধ্যে বুদ্ধবাণীর অংশবিশেষ সম্ভবত বিধিবদ্ধ আকারে লিখিতও হয়েছিলো। সঙ্ঘের মধ্যে ধর্ম, দার্শনিক মত, আচার প্রভৃতি বিষয় সম্বন্ধে বহু মতভেদ বাড়তে বাড়তে অবশেষে অনুমান খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে সম্রাট কণিষ্কের রাজত্বকালে পাঞ্জাব অথবা কাশ্মীরের কোনও স্থানে চতুর্থ সম্মেলনের পর সঙ্ঘ মহাযান ও হীনযান নামে এই দুই প্রধান শাখায় পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে যায়।

এখানে উল্লেখ্য, মহাযান ও হীনযান নাম দুটি মহাযানীদেরই উদ্ভাবন। অতএব হীনযান নামটি বিদ্বেষসূচক বলেই প্রতীত হয়। বৌদ্ধধর্মের এই শাখাটিরই নামান্তর হলো থেরবাদ বা স্থবিরবাদ। থেরবাদী শাস্ত্র পালি ভাষায় লেখা এবং তৎকালীন সিংহল, বর্মা ও শ্যামদেশে তা সংরক্ষিত হয়েছে। মহাযানী শাস্ত্র সংস্কৃত ভাষায় লেখা এবং নেপাল, তিব্বত, চীন ও জাপানে এই শাখাটির প্রভাব দেখা যায়। তবে থেরবাদীদের পালি সাহিত্যই প্রাচীনতর। তিনটি প্রধান ভাগে এই সাহিত্য সংকলিত হয়েছিলো বলেই এর নাম ত্রিপিটক। পিটক মানে ঝুড়ি। এই তিনটি পিটক হলো- বিনয়পিটক, সূত্রপিটক ও অভিধম্মপিটক। ত্রিপিটকের বর্তমান রূপটি ঠিক কবে বিধিবদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছিলো সে-বিষয়ে সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত সম্ভব না হলেও বৌদ্ধধর্মের প্রাচীনতর রূপটির পরিচয় এর মধ্যেই পাওয়া যায়।
বিনয়পিটকে বৌদ্ধসঙ্ঘ বিষয়ক নির্দেশ এবং সঙ্ঘের পালনীয় বিধি ও অনুশাসন সংকলিত হয়েছে। সূত্রপিটকে মূলত বুদ্ধের বাণী, উপদেশ এবং শিষ্যদের সঙ্গে কথোপকথন স্থান পেয়েছে। অভিধম্মপিটক পরবর্তীকালের সংকলন। রাজা অশোকের পৃষ্ঠপোষকতার তৃতীয় মহাসঙ্গীতির পর এর আবির্ভাব ঘটে।

বুদ্ধ নিজে দর্শনচর্চা করেননি; বরং তিনি দর্শনচর্চার বিরোধীই ছিলেন। দার্শনিক সমস্যা সংক্রান্ত প্রশ্ন করলে তিনি নীরব থাকতেন। বুদ্ধ যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন তার মূল কথা চারটি। বলা হয়ে থাকে, চারটি আর্য বা শ্রেষ্ঠ সত্যের উদ্ঘাটন করায় শাক্যমুনি গৌতম বোধিলাভ করে ‘বুদ্ধ’ নামে অভিহিত হন। এই রহস্যের প্রকটিকরণই তাঁর আধ্যাত্মিক জাগরণের (বুদ্ধত্বের) সঙ্কেত দেয়। তাই বৌদ্ধধর্মের রহস্য জানার জন্য এই চার আর্য সত্যের জ্ঞান নিতান্ত আবশ্যক। বৌদ্ধদর্শনে যাকে বলা হয় চত্বারি আর্য সত্যানি বা চার আর্যসত্য। বুদ্ধের সমস্ত উপদেশের মূলে এই চারটি আর্যসত্য নিহিত রয়েছে। অধ্যাত্মবাদের গ্রন্থিমোচন না-করা হলেও ক্লেশবহুল প্রপঞ্চ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তথাগত বুদ্ধের আচারমার্গিক নির্দেশনা হলো এই চারটি আর্যসত্য। এগুলো হচ্ছে-
(১)     জগত দুঃখময়- সর্বং দুঃখম্ ।
(২)    দুঃখ সমুদয় বা দুঃখের হেতু আছে- দুঃখসমুদয়ঃ।
(৩)    দুঃখের নিরোধ বা নির্বাণ সম্ভব- দুঃখনিরোধঃ। এবং
(৪)    দুঃনিরোধের উপায় বা মার্গ আছে- দুঃখনিরোধগামিনী প্রতিপৎ।
অর্থাৎ চার আর্যসত্য হলো- দুঃখের বিদ্যমানতা, তার কারণের বিদ্যমানতা, তার নিরোধের সম্ভাব্যতা এবং তাতে সাফল্য লাভের পথ বা উপায়। সংক্ষেপে এদেরকে বলা হয়- দুঃখ, দুঃখ-সমুদয়, দুঃখ-নিরোধ ও দুঃখ-নিরোধমার্গ। এই চার আর্যসত্যকে বুদ্ধের চতুঃসূত্রীও বলা হয়।

এবং দুঃখ নিরোধের সুনির্দিষ্ট মার্গ আছে; তার নাম অষ্টাঙ্গিক-মার্গ- যথা- সম্যক্ দৃষ্টি, সম্যক্ সংকল্প, সম্যক্ বাক্য, সম্যক্ কর্ম, সম্যক্ জীবিকা, সম্যক্ ব্যায়াম, সম্যক্ স্মৃতি ও সম্যক্ সমাধি।

বৌদ্ধমতে সত্তা হচ্ছে প্রতিক্ষণে জন্ম ও অবলুপ্তির এক নিরবচ্ছিন্ন ধারা। এই ধারা কার্যকারণসম্বন্ধের নিয়মের অধীন, জগতে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই। সবকিছুই ক্ষণিক। এটিই বৌদ্ধমতে ক্ষণিকবাদ বা ক্ষণভঙ্গবাদ তত্ত্বের প্রতিপাদ্য। বুদ্ধ জগতের সব কিছুকে নিয়ত পরিবর্তনশীল অবস্থায় আছে বলে গণ্য করতেন। এই মতে, ধর্ম হচ্ছে মানুষের ইন্দ্রিয়বোধের অতীত সূক্ষ্ম কণাসমূহ যা নানারূপে সংযোগনিযোগের দরুণ বস্তুগত বা আত্মগত পদার্থসমূহে গঠন করে। এই ধর্ম হচ্ছে নিয়ত গতিশীল এবং অন্তহীন যোগবিয়োগের বিভিন্ন ছকমাত্র। নির্বাণপ্রাপ্তির অবস্থায় নিয়ত পরিবর্তনশীল ধর্মগুলির গতি রুদ্ধ হয়। ফলে সংসারের সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটে, অর্থাৎ এক শরীরী সত্তা থেকে অন্য সত্তায় সংক্রমণ বন্ধ হয় এবং জগতের সাথে বস্তুপদার্থের সংযোগ আর থাকে না।

আমরা কেন দুঃখ ভোগ করি ? এ প্রশ্নের উত্তরে বুদ্ধ বলেন, দুঃখের কারণ আছে। অর্থাৎ এ সত্যটি একটি কার্য-কারণ সম্বন্ধীয় নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বুদ্ধ এর নাম দিয়েছেন ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’ (The doctrine of Dependent Origination)। এই প্রতীত্যসমুৎপাদ অনুসারেই দুঃখের কারণকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন তিনি। এতে বলা হয়েছে, সংসারে অকারণ কোন বস্তু নেই, প্রত্যেক বিষয়ের কারণ থাকে। প্রতিটি ঘটনাই পূর্ববর্তী কোন ঘটনা থেকে উদ্ভূত হয়। দুঃখ একটি ঘটনা। সুতরাং দুঃখেরও কারণ আছে। কারণের অভাবে দুঃখের উৎপত্তি সম্ভব নয়। দুঃখের কারণটি জানা হলে আমরা দুঃখ নিবৃত্তির পথে এগিয়ে যেতে পারবো। কেননা কারণটিকে দূর করতে পারলেই কার্যটি আর ঘটবে না। সংসারে জরা ও মরণ দুঃখ দু’টি প্রধান। শরীর ধারণ করার দরুন জরা-মরণের দুঃখভোগ করতে হয়, যদি শরীর ধারণ না করতে হয় তবে দুঃখ দু’টি হতে রেহাই পাওয়া যায়।

বৌদ্ধ দর্শনে দুঃখের কারণ সম্পর্কে একটি বিশেষ সূত্র আছে। যা বৌদ্ধ দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রতিত্যসমুৎপাদ’ তত্ত্বের প্রতিপাদ্য বিষয়। এই সূত্র অনুসারে দুঃখ সৃষ্টির একই কারণ নয়। তাদের মধ্যে একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খলা রয়েছে। এই কারণ-শৃঙ্খলে বারোটি নিদান বা সংযোগসূত্র আছে। এগুলো হচ্ছে অবিদ্যা, সংস্কার, চেতনা বা বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা বা অনুভূতি, তৃষ্ণা বা ভোগবাসনা, উপাদান বা বিষয়ানুরাগ, ভব, জাতি ও জরামরণ। একে ‘দ্বাদশ নিদান’ও (twelve sources) বলা হয়। এই বারোটি নিদানের কার্যকারণের যে ব্যবস্থিত নিয়ম বা শৃঙ্খলা তা অস্তিত্বের বৃত্ত ‘ভবচক্রে’র বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ জন্মের সাথে সম্বন্ধ। প্রথম নিদান থেকে আরম্ভ করে কারণ খুঁজতে খুঁজতে অন্তিম নিদানে পৌছানো যায়, যার নাম হচ্ছে ‘অবিদ্যা’, দুঃখের সামগ্রিক কারণ।

স্পষ্টই বোঝা যায়, দর্শনচর্চায় বিরূপ হলেও বুদ্ধকেও তাঁর মূল বাণীর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কিছু কিছু দার্শনিক মত ব্যক্ত করতে হয়েছিলো। সেগুলিকে অবলম্বন করেই বৌদ্ধ-দর্শনের প্রাচীন রূপটির ব্যাখ্যা করা হয়।
কিন্তু পরবর্তী কালের বৌদ্ধ-দর্শনের প্রকৃতি অন্যরকম। আগেই বলা হয়েছে যে, বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধমতাবলম্বীদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত মহাযান ও হীনযান নামে বৌদ্ধধর্মের দুটি পরস্পরবিরোধী সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। কিন্তু এ হলো ধর্ম-সম্প্রদায়ের কথা। অন্যদিকে, বিভিন্ন দার্শনিক সমস্যা নিয়ে বিরোধের দিক থেকে পরবর্তীকালে বুদ্ধের অনুগামীদের মধ্যে অনেকগুলি সুস্পষ্ট দার্শনিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। তার মধ্যে প্রধানত চারটি সম্প্রদায় ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই প্রধান চারটি বৌদ্ধ দার্শনিক সম্প্রদায় হলো-

(১) বৈভাষিক সম্প্রদায় : এই মতে অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ উভয়েরই অস্তিত্ব আছে এবং প্রত্যক্ষভাবেই বহির্জগতের জ্ঞান হয়। এই মতবাদকে বলা হয় বাহ্যপ্রত্যক্ষবাদ।
(২) সৌত্রান্তিক সম্প্রদায় : এই মতেও অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ উভয়েরই অস্তিত্ব আছে, কিন্তু বহির্জগতের প্রত্যক্ষ জ্ঞান হয় না। বহির্জগতের মানস-প্রতিবিম্বকে অবলম্বন করে আমরা তার সত্তা অনুমান করতে পারি। এই মতবাদকে বলা হয় বাহ্যানুমেয়বাদ।
(৩) যোগাচার সম্প্রদায় : এই মতে বহির্জগতের কোনো অস্তিত্ব নেই; একমাত্র মনই সত্য এবং তথাকথিত বহির্জগৎ আসলে মনগড়া- মনের ধারণা। এই মতবাদকে বলা হয় বিজ্ঞানবাদ।
(৪) মাধ্যমিক সম্প্রদায় : এই মতে বহির্জগৎ বা অন্তর্জগৎ কিছুরই প্রকৃত সত্তা নেই- সবই শূন্য, শূন্যই চরম সত্য। এই মতবাদকে বলা হয় শূন্যবাদ।

বুদ্ধের মূল বাণীর সঙ্গে এইসব বিভিন্ন সম্প্রদায়-প্রতিপাদ্য দার্শনিক তত্ত্বের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় কিনা এটি স্বতন্ত্র প্রশ্ন হলেও একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, স্বয়ং বুদ্ধের মতোই এইসব সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা একান্তভাবেই বেদ-বিরোধী বা শ্রুতিবিরোধী ছিলেন। বস্তুত, পরবর্তীকালের বৈদিক শ্রুতির অনুগামী দার্শনিকেরা শ্রুতি-প্রতিপাদ্য তত্ত্বের সমর্থনে এবং বৌদ্ধমত বিরোধিতায় যে-সব যুক্তিতর্ক উদ্ভাবন করেছিলেন সেগুলির খণ্ডনই এই বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলির একটি প্রধান প্রচেষ্টা ছিলো। অতএব প্রচলিত শ্রেণীবিভাগ অনুসরণে এগুলিকে নাস্তিক সম্প্রদায় হিসেবে ভাবতে বাধা নেই।

তবে এই নাস্তিক সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি শেষ করার আগে সমকালীন প্রেক্ষিতে আজীবক নামে অন্য আরেকটি সম্প্রদায় সম্বন্ধে সামান্য কিছু বক্তব্য হয়তো বর্তমান আলোচনার সম্পুরক হিসেবে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

আজীবক-সম্প্রদায় :
ভারতীয় ইতিহাসে বর্ধমান মহাবীর (৫৪০-৪৬৮ খ্রিস্টপূর্ব) এবং গৌতম বুদ্ধের (৫৬৩-৪৮৩ খ্রিস্টপূর্ব) সময়কে এক মহত্ত্বপূর্ণ ধর্মসংস্কারের কাল বলে গণ্য করা হয়। এই সময়ে অনেক নতুন ধার্মিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিলো। তার মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধধর্মের কথা সকলে জানলেও অন্যান্য যে সকল ধর্মের উদ্ভব হয়েছিলো তাদের পরিচয় অজ্ঞাতপ্রায়ই হয়ে গেছে। এরকম এক সম্প্রদায়ের নাম ছিলো আজীবক-সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায়ের প্রবর্তক ছিলেন মখলিপুত্ত গোসাল বা মক্ষলি গোশাল। তবে এই সময়কার আজীবক সম্প্রদায়ের কোন গ্রন্থ পাওয়া যায় না। তাঁদের সম্বন্ধে যা কিছু জানা যায় তা জৈন ও বৌদ্ধদের সাহিত্য থেকে পাওয়া যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে- ‘বুদ্ধদেবের সময়ে ছয়টি ধর্ম প্রচার হইয়াছিল, তাহাদের নাম যথা, আজীবক- ইহা গোশালা মংখালি পুত্রের ধর্ম, নিগ্রন্থ- ইহা মহাবীরের ধর্ম, পূর্ণ কাশ্যপ একজন ধর্মপ্রবর্তক, অজিত কেশকম্বল একজন, সঙ্গয় একজন ও পোকুদ কত্ত্যায়ন একজন।‘-(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা-সংগ্রহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৯৮)

গোসাল অল্প বয়সে ভিক্ষু হয়েছিলেন। শীঘ্রই ‘কেবলিন্’ উপাধিপ্রাপ্ত নিজ মত প্রচারকালে মহাবীর বর্ধমানের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁদের উভয়ের আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র ও বিচারধারা অত্যন্ত ভিন্ন থাকায় ছয় বছর পর তাঁদের মধ্যে বিবাদ হলে তাঁরা পৃথক সম্প্রদায় স্থাপন করেন। পরবর্ত্তী আজীবক নামে গোসালের সম্প্রদায় প্রসিদ্ধ হয়। তিনি শ্রাবস্তীকে প্রধান কেন্দ্র বানিয়ে ছিলেন। শ্রাবস্তীর বাইরে এক কুমোড়ের স্ত্রীর অতিথি হয়ে তিনি বসবাস করতে থাকলে ধীরে ধীরে অনেক লোক তাঁর অনুসারী হয়।’- (বিশ্বরূপ সাহা, ভূমিকায় আজীবকদর্শন, নাস্তিকদর্শনপরিচয়ঃ)

পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের বর্ণনায়- ‘জৈন পিটক থেকে জানা যায়, প্রথমে তিনি জৈনবাদী সাধু ছিলেন, পরে সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কৃত হন। তাঁর যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তা এক ধর্মান্ধ, ঈর্ষাপরায়ণ, অত্যন্ত নীচ প্রকৃতির ব্যক্তির। তিনি মহাবীরকে (= জৈন-তীর্থঙ্কর, নিগণ্ঠ নাতপুত্ত) হত্যার চেষ্টা করেছিলেন; ব্রাহ্মণের দেবমূর্তির ওপর মল-মূত্র ত্যাগের ফলে প্রহৃত হয়েছিলেন, ইত্যাদি। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বৌদ্ধ পিটক তাঁকে বুদ্ধ-যুগীয় প্রসিদ্ধ ছয়জন আচার্যের একজন বলে গণ্য করেছেন। আজীবক সম্প্রদায়ের তিনজন আচার্যের একজন হলেন মক্ষলি গোশাল, অপর দু’জনের নাম হলো : নন্দ বাৎস্য এবং কৃশ সাংকৃত্য। (মজ্ঝিমনিকায়-২/৩/৬)। এখানে এমন কথাও আছে যে আজীবক আচার্য মক্ষলি গোশাল উলঙ্গ থাকতেন এবং কিছু সংযমও পালন করতেন। বুদ্ধের বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি কালেও আজীবক সম্প্রদায় ছিল (৫৩৭ খৃঃ.পূঃ.), কেন না, বুদ্ধগয়া থেকে যাত্রা শুরু করে বোধি ও গয়ার মধ্যবর্তী পথে তাঁর সঙ্গে উপক নামে এক আজীবকের সাক্ষাৎ হয়েছিল (মজ্ঝিমনিকায়)। এতে বোঝা যায়, গোশালের আগে নন্দ বাৎস্য এবং কতিপয় সাংকৃত্য ছিলেন আজীবক সম্প্রদায়ের আচার্য।
পালি ভাষায় মক্ষলি গোশাল নামের ব্যাখ্যা করারও চেষ্টা করা হয়েছে; মক্ষলি = মা খালি অর্থাৎ যার পতন নেই; এবং গোশাল = গোশালায় জাত। পাণিনির মতানুযায়ী মস্করী অর্থ গৃহত্যাগী। পালি ব্যাখ্যার পরিবর্তে পাণিনির ব্যাখ্যানুযায়ী এর অর্থ হবে ‘সাধু গোশাল’।’- (দর্শন-দিগদর্শন, পৃষ্ঠা-৭৫)।
অন্যদিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী- ‘মক্খলি, মংখলিপুত্ত গোশাল বা মস্করী গোশাল সিংহলি সূত্র অনুসারে গোশালায় এক দাসীর গর্ভে জন্মান। ২৪ বছর প্রব্রজ্যার প্রথম ৬ বছর মহাবীরের সঙ্গে ছিলেন, মতবিরোধ হওয়ায় মহাবীরকে ত্যাগ করে যান এবং আজীবক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। আজীবক সন্ন্যাসীরা নগ্ন থাকতেন, কঠোর নিয়ম-সংযম মেনে চলতেন। গোশাল অদৃষ্টবাদী দর্শন প্রচার করেন। উত্তর ও বিশেষভাবে দক্ষিণ-ভারতে দীর্ঘদিন গোশালের প্রভাব টিকে ছিল।‘-(হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর রচনা-সমগ্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৪)

দার্শনিক চিন্তাসূত্র অনুযায়ী মক্ষলি গোশালকে অকর্মন্যতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আজীবক সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত তার বিরোধী ধর্মশাস্ত্র হতে জানা যায়। এই সম্প্রদায়ের মুখ্য সিদ্ধান্ত নিয়তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। যা হবার তা হবে, যা হবার নয় তা হবে না। যদি ভাগ্যে না থাকে তবে আসন্ন বা ভাবী বস্তুও নষ্ট হয়। নিয়তির সামর্থ্যে শুভ বা অশুভ সকল কিছুই সঙ্ঘটিত হয়। মানুষ বহু চেষ্টা করেও যা হবার তাকে প্রতিরোধ বা পরিবর্তিত করতে পারে না। সেকারণে আজীবক পৌরুষ, কর্ম ও উত্থানের অপেক্ষায় নিয়তি বা ভাগ্যকে অধিক শক্তিমান মনে করেন। এই মতে বস্তুতে যে পরিবর্তন বা বিকার হয় তার কোন কারণ নেই। সংসারে কার্যকারণভাব কার্যকরি নয়, মানুষ নিজের পুরুষার্থকে পরিবর্তিত করতে পারে না।

আজীবক আরামে জীবনযাপনে পক্ষপাতী। মহাবীরের ঘোর তপস্যাময় জীবন তাঁরা পছন্দ করতেন না। সেকারণে গৌতম বুদ্ধও একস্থলে আজীবককে ব্রহ্মচর্যে উদাসীনরূপে উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়। তবে আজীবক ভিক্ষুর জীবন ছিলো অতি সরল। তাঁরা প্রায়শঃ হাতে রেখে ভোজন করতেন। মাছ, মাংস ও মদ্যসেবন তাঁরা ত্যাগ করতেন। তাঁরা দিনে একবার ভিক্ষায় ভোজন করতেন।

আজীবক সম্প্রদায় প্রথমদিকে বৌদ্ধদের প্রতিপক্ষরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। বৌদ্ধধর্মের অবিচল ও মৌলিক সমালোচনা দিয়ে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম হতে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে আজীবক ধর্মের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণরূপে ব্রাহ্মণধর্মের বিরোধকে উল্লেখ করা হয়। সমাজে জাতিভেদের কাঠামো ও ব্রাহ্মণদের কর্মবাদের ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে গোসাল প্রচারিত সমালোচনা কেবল সমাজের নীচুস্তরের মানুষকে আকর্ষণ করেনি, ববং কারুশিল্পী ও বণিকদের আকর্ষণ করেছিল। এই আজীবক ধর্ম সন্ন্যাসী হতে গৃহী-পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। পালি বৌদ্ধগ্রন্থে গোসালকে একজন জেলের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তিনি নদীর মোহনায় জাল ফেলে অসংখ্য মাছ ধরতেন। এ থেকে বুঝা যায় সে সময়ে আজীবক ধর্মের জনপ্রিয়তা ব্যাপক ছিল।

সম্রাট অশোকের শিলালেখে বলা হয়েছে যে, অনেক গুহানিবাস আজীবককে প্রদান করা হয়েছে। অশোকের পৌত্র দশরথৎ (১৮৪ খ্রী.পূ.) গয়ার নিকটে নাগার্জুন পাহাড়ের অনেক গুহা আজীবককে দান করেছেন। অশোক বিবিধ ধার্মিক সম্প্রদায়ের অবিরোধ সাধনের জন্য ‘ধর্মমহামাত্র’ নিযুক্ত করেছিলেন। এই আজীবক কয়েক শতাব্দী-পর্যন্ত পৃথগ্ভাবে প্রচলিত ছিল। পরবর্ত্তী কালে বৌদ্ধদের কাছে তাঁদের পরাজয় ঘটলে তাঁরা জৈনসম্প্রদায়ে মিশে যায়। মনুষ্যজীবনের তাৎপর্য, জগতে ও সমাজে তাদের সুনির্দ্দিষ্ট স্থান, ব্যক্তিগত প্রয়াসের মূল এবং কোন নীতি সঠিক আচরণের ভিত্তি হওয়া উচিত এই সকল বিষয় নিয়ে আজীবকের ধর্মশিক্ষায় সত্যিকারের কোন আলোচনা করা হয় নি, অথচ এই সমস্ত সমস্যা ও সমাধানে বৌদ্ধ ও জৈনগণ অবহিত ছিল। আজীবকের দর্শনে ‘সর্বব্যাপী পূর্বনির্ধারণ’ বা ‘নিয়তি’ নীতিগতভাবে এসকল সমস্যার সমাধানকে পরিহার করা হয়েছিল বলে জনপ্রিয়তা হারিয়ে অবলুপ্ত হয়।’- (বিশ্বরূপ সাহা, ভূমিকা, নাস্তিকদর্শনপরিচয়ঃ)।

আজীবক সম্প্রদায়ের দর্শন প্রসঙ্গে রাহুল সাংকৃত্যায়ন বলেন,-
গোশালের দর্শনের প্রসঙ্গ পালি ত্রিপিটকের কয়েক জায়গায় এসেছে, কিন্তু সর্বত্রই ঐ শব্দসমূহের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে (দীঘনিকায়-১/২)। “প্রাণীর সংক্লেশের (= চিত্ত মালিন্যের) কোনো হেতু (= প্রত্যয়) নেই। অকারণেই চিত্ত মলিন হয়। চিত্তবিশুদ্ধিরও কোনো কারণ নেই। …অহেতুকই …বিশুদ্ধতা প্রাপ্ত হয়। বল নেই, বীর্য…, দৃঢ়তা বা পুরুষকার নেই অর্থাৎ কাজে লাগে না। সব সত্তা, প্রাণী, জীব, জড় সকলেই বল-বীর্য ব্যতীতই ভবিতব্যতার বশীভূত হয়ে ছয় জন্মের সুখ-দুঃখ অনুভব করে। অন্যান্য ষাটশত এবং ছয়শত ছাড়াও চৌদ্দশত সহস্র প্রমুখ যোনি আছে। পাঁচশত কর্ম আছে, অন্যান্য পাঁচ কর্ম… তিন, এক এবং অর্ধ কর্ম। বাষট্টি মার্গ (= প্রতিপদ), বাষট্টি অন্তরকল্প, ছয় জন্ম, আট পুরুষ-ভূমি, উনিশ শত আজীবক, উনপঞ্চাশ পরিব্রাজক, উনপঞ্চাশ নাগা-বাস, কুড়িশত ইন্দ্রিয়, ত্রিশশত নরক, ছত্রিশ রজোধাতু সাত সংজ্ঞ-গর্ভ, সাত অচেতন গর্ভ, সাত নিগণ্ঠী গর্ভ, সাত দেব, সাত মনুষ্য, সাত পিশাচ, সাত স্বর, সাতশত সাত গ্রন্থি, সাতশত সাত প্রপাত, সাতশত সাত স্বপ্ন। …এবং আশি লক্ষ ক্ষুদ্র বৃহৎ কল্প আছে, যাকে মূর্খ-পণ্ডিত সকলেই জানতে এবং অনুগমন করে দুঃখের অন্ত করতে পারে। সেখানে শ্লীলতা ব্রহত জপ-তপ দ্বারা অপরিপক্ব কর্মকে পরিপক্ব করা যাবে এমন নয়। পরিপক্ব কর্মকে ভোগ করে তার সমাপ্তি করা যায়। সুখ ও দুঃখ নির্দিষ্ট মাপে পরিমিত। সংসারে ঘটনার উৎকর্ষ হয় না। সুতোর গোলা পড়ে গেলে যেমন ঘুরতে ঘুরতে খোলে, মূর্খ ও পণ্ডিত তেমন সুখের সন্ধানে ছুটাছুটি করেই দুঃখের সমাপ্তি করে।”
এতে বোঝা গেলো মক্ষলি গোশাল ছিলেন সম্পূর্ণ ভাগ্যবাদী। পুনর্জন্ম ও দেবতাকে মেনে তিনি বলেছেন : জীবনের রাস্তা তুলাদণ্ডের তুল্য, পাপ-পুণ্য তাতে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে না।’- (দর্শন-দিগদর্শন, পৃষ্ঠা-৭৬)।

(খ) আস্তিক দর্শন-সম্প্রদায় :

সাংখ্য-দর্শন
ভারতীয় ষড়দর্শনের অন্যতম সাংখ্যদর্শন বা সাংখ্যশাস্ত্রকে প্রাচীনতম ভারতীয় দর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মহর্ষি কপিল হচ্ছেন এই দর্শনের সূত্রকার। তাই সাংখ্যকে কখনও কখনও কপিল-মত বা কপিল-দর্শন নামেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, কপিলের শিষ্য ছিলেন আসুরি এবং আসুরির শিষ্য ছিলেন পঞ্চশিখ। কথিত আছে যে, মুনি কপিল দুঃখে জর্জরিত মানুষের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাঁর শিষ্য আসুরিকে পবিত্র ও সর্বোৎকৃষ্ট জ্ঞান সাংখ্যশাস্ত্র প্রদান করেছিলেন। আসুরি সেই জ্ঞান পঞ্চশিখকে প্রদান করেন। এরপর পঞ্চশিখ-এর দ্বারা সাংখ্যশাস্ত্র নানাভাবে বহু শিষ্যের মধ্যে প্রচার হয়েছিলো। পঞ্চশিখ-এর কাছ থেকে শিষ্যপরম্পরাক্রমে মুনি কপিল প্রণীত এই সাংখ্যশাস্ত্র ভালোভাবে জেনে ঈশ্বরকৃষ্ণ আর্য্যা ছন্দে ‘সাংখ্যকারিকা’ নামে যে গ্রন্থ রচনা করেন, তা-ই এখন পর্যন্ত সাংখ্য সম্প্রদায়ের প্রাপ্ত সর্বপ্রাচীন প্রামাণিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

সাংখ্যদর্শন কতোটা প্রাচীন তা নিয়ে বহুমত থাকলেও এর প্রাচীনত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদিতে সাংখ্য দর্শনের বহুল উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (আনুমানিক ২০০-১০০ খ্রিস্টপূর্ব) কপিল একজন খ্যাতনামা ঋষি এবং সেই উপনিষদে তাঁর দর্শনের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। ভাগবতে কপিল মুনিকে চব্বিশজন অবতারের একজন বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে তাঁর পিতার নাম কর্দম ঋষি এবং মাতার নাম দেবহুতি। আবার মহাভারতে কপিল ও আসুরির সাংখ্যমতের উল্লেখ পাওয়া যায় ভালোভাবেই। মহাভারতের শান্তিপর্বে আচারজ্ঞ পিতামহ ভীষ্মের জবানিতে সাংখ্যমত সম্পর্কিত দীর্ঘ উদ্ধৃতি রয়েছে। মহাভারতে সাংখ্যমতের বিস্তৃত আলোচনা থেকে এ দর্শনের প্রভাব ও প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায় অবশ্যই। অন্যদিকে আয়ুর্বেদশাস্ত্রের প্রাচীন সূত্রগ্রন্থ ‘চরক-সংহিতা’র দার্শনিক অনুক্রমে এই সাংখ্যশাস্ত্রেরই ভিত্তি পরিলক্ষিত হয়। বৈদিক সংস্কৃতিতে সকল শাস্ত্রের সার বলে কথিত প্রাচীন মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতায়ও সাংখ্যদর্শনের প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। মূলত মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের দার্শনিক প্রপঞ্চটাই সংখ্যদর্শন ভিত্তিক। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বিখ্যাত প্রামাণিক গ্রন্থ কৌটিল্য প্রণীত ‘অর্থশাস্ত্র’-এ সাংখ্যদর্শনের প্রশস্তি দেখা যায়। কৌটিল্য সাংখ্যশাস্ত্রকে অনুমোদিত বিদ্যাচতুষ্টয়ের অন্যতম আন্বীক্ষিকীর অন্তর্গত শাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন- সাংখ্য, যোগ ও লোকায়ত- এই তিনটি শাস্ত্র উক্ত আন্বীক্ষিকী-বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত।

এসব প্রাচীন সাহিত্যে সাংখ্যমতের বহুতর উল্লেখ থেকে অনুমান করাটা অসম্ভব নয় যে, অন্তত খ্রিস্টপূর্ব চারশ বছরের পূর্ব থেকেই ভারতীয় দর্শন জগতে সাংখ্যদর্শনের জোরালো উপস্থিতি ছিলো। এবং প্রাচীন পুঁথিপত্রে এ-দর্শনের প্রভাব এতো ব্যাপক ও বিশাল যে, সাংখ্যমতের পেছনে অতি সুদীর্ঘ যুগের ঐতিহ্য স্বীকার না করলে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না বলে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন। ফলে সাংখ্যদর্শনকে খুবই প্রাচীন বলে স্বীকার করা অমূলক হবে না। আধুনিক বিদ্বানদের কেউ কেউ সাংখ্যকে গৌতম বুদ্ধের চেয়ে অনেক প্রাচীন কালের দর্শন বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁদের মতে সাংখ্য-সম্প্রদায়ের প্রবর্তক কপিলের নাম থেকেই বুদ্ধের জন্মস্থান কপিলাবস্তুর নামকরণ হয়েছিলো। অতএব, মোটের উপর এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সাংখ্য-দর্শন অবশ্যই অত্যন্ত সুপ্রাচীন এবং তা যে ঠিক কতো পুরনো সে-বিষয়ে বর্তমানে খুব জোর করে কোন কথাই বলা যায় না।

সুপ্রাচীন কাল থেকে সাংখ্যদর্শনের এই যে সুবিস্তৃত প্রভাব, তা সত্ত্বেও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ দর্শনের মূল গ্রন্থ সংখ্যা যৎসামান্যই বলা যায়। মহর্ষি কপিলকে এ দর্শনের সূত্রকার বলা হলেও কপিল রচিত কোন সাংখ্যসূত্র গ্রন্থের খোঁজ পাওয়া যায় না। এছাড়া কপিলের শিষ্য আসুরি এবং আসুরির শিষ্য পঞ্চশিখের রচিত কোন গ্রন্থেরও সন্ধান পাওয়া যায় না। হতে পারে তাদের রচিত গ্রন্থ এখন বিলুপ্ত। তবে ঈশ্বরকৃষ্ণের ‘সাংখ্যকারিকা’য় পঞ্চশিখ প্রণীত কপিলের উপদেশসমূহের এক বৃহৎ সংগ্রহ ‘ষষ্ঠিতন্ত্র’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মূলত ঈশ্বরকৃষ্ণ প্রণীত ‘সাংখ্যকারিকা’-ই বর্তমানে সাংখ্যশাস্ত্রের প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। ষষ্ঠিতন্ত্র নামে যে বৃহৎ সংগ্রহ গ্রন্থ ছিলো, ঈশ্বরকৃষ্ণ সেই ষষ্ঠিতন্ত্রের কাহিনী ও প্রবাদসমূহ বর্জন করে দর্শনের আসল তত্ত্বকে সত্তরটি শ্লোকে গ্রথিত করেছেন।

তবে আধুনিক বিদ্বানদের মতে, এই সাংখ্য-কারিকাতেও সাংখ্য-দর্শনের আদি-অকৃত্রিম পরিচয় পাওয়া যায় কিনা- এ-প্রশ্নও অবান্তর নয়। বস্তুত আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই কারিকাপূর্ব সাংখ্যর রূপটি পুনর্গঠন করবার প্রয়াস করেছেন বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেছেন; কেননা তাঁদের মতে কারিকায় সাংখ্য-তত্ত্বের অবিকৃত ব্যাখ্যা নেই। এছাড়া, গীতা প্রভৃতিতে সাংখ্য নামে যে-দর্শনের ব্যাখ্যা করা হয়েছে তার মধ্যে প্রাচীন সাংখ্যের পরিভাষা এবং প্রাচীন সাংখ্যের দার্শনিক তত্ত্ব আংশিকভাবে স্বীকৃত হলেও মূল সাংখ্য-দর্শনের পরিচয় অবশ্যই নেই। অতএব স্পষ্টই বোঝা যায়, সাংখ্য-দর্শন যেমন প্রাচীন তার প্রকৃত রূপটি নির্ণয় করা তেমনই কঠিন। আদি-সাংখ্যের সাথে পরবর্তীকালের সাংখ্যমতের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে বলে বিদ্বান গবেষকেরা মনে করেন। আপাতত সংক্ষেপে সাংখ্য-দর্শনের কয়েকটি মূল বক্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে।

কার্য-কারণসম্পর্ক প্রসঙ্গে সাংখ্য-দর্শনে একটি সুনির্দিষ্ট মত আছে; তার নাম সৎকার্যবাদ বা পরিণামবাদ। এই মত অনুসারে কার্য একান্তভাবেই কারণের পরিণাম; কার্যের মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারে না যা কারণের মধ্যে- অবশ্যই অস্ফুট বা বীজাকারে- বর্তমান নয়। অতএব কার্যের মধ্যে যা বর্তমান কারণের মধ্যেও তার সত্তা অনুমেয়। পরিদৃশ্যমান জগৎ আসলে কার্য এবং তা জড়রূপ। অতএব তার কারণ হিসেবেও জড়রূপ কিছু অনুমেয়। সাংখ্যে এই জড়রূপ জগৎকারণকে প্রকৃতি বা প্রধান আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অতএব প্রকৃতিকে ‘primordial matter’ বলা হয়। প্রকৃতির উপাদান ত্রিবিধ : সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। এগুলিকে পারিভাষিক অর্থে ‘গুণ’ বলা হয়; অর্থাৎ চলতি কথায় আমরা গুণ বলতে যা বুঝি সাংখ্যে তা নয়। তিনটি গুণের মধ্যে সাম্যাবস্থা বিচ্যুত হলে প্রকৃতি থেকে ক্রমশ পরিদৃশ্যমান স্থূল জগতের উদ্ভব হয় : সাংখ্যে এই ক্রমবিকাশের সুবিস্তৃত আলোচনা আছে। ক্রমবিকাশ শুরু হবার আগে পর্যন্ত প্রকৃতির যে আদিম অবস্থা তার নাম অব্যক্ত। কিন্তু প্রকৃতি ছাড়াও সাংখ্যে পুরুষের কথা আছে। পুরুষ উদাসীন, অপ্রধান এবং বহু। সাংখ্যের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুসারে পুরুষ বলতে চেতন আত্মা বোঝায়। কিন্তু সাংখ্যের আদি অকৃত্রিম রূপটিতেও তাইই বুঝিয়েছিল কিনা- এ বিষয়ে নানা সমস্যা আছে। অতএব সাংখ্য দর্শনে ‘পুরুষ’-তত্ত্বের তাৎপর্য প্রসঙ্গে সুদীর্ঘ বিচার প্রয়োজন হবে। কিন্তু এখানে একটি কথা বলে রাখা যায়। তন্ত্র নামে পরিচিত সাধন-সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রকৃতি ও পুরুষ-তত্ত্বের বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়েছে। তাই তন্ত্রর সঙ্গে সাংখ্যের কোনো-না-কোনো সম্পর্ক অনুমান করা প্রয়োজন। আধুনিক বিদ্বানেরা এই সম্পর্কের ব্যাখ্যায় সাধারণত বলে থাকেন, তান্ত্রিকেরা সাংখ্য-দর্শন থেকে প্রকৃতি-পুরুষের তত্ত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু… তন্ত্রের ইতিহাস এমনই প্রাচীন- এবং তন্ত্রে ওই প্রকৃতি-পুরুষ-তত্ত্ব এমনই অনিবার্য- যে উক্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করায় বাধা ওঠে। তাহলে কি এমন প্রকল্পের সুযোগ থাকে যে আদিম তন্ত্রসাধনার অন্তর্নিহিত তত্ত্বগত দিকই কালক্রমে সাংখ্যে সুস্পষ্ট দার্শনিক রূপ গ্রহণ করেছিল?’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৫)।

প্রচলিত সাংখ্যমত অনুযায়ী, সাংখ্যকারিকায় দুঃখকে ত্রিবিধ অর্থাৎ তিন প্রকার বলা হলেও এর ব্যাখ্যা সাংখ্যকারিকায় পাওয়া যায় না। সাংখ্য শাস্ত্রকারদের মতে এই ত্রিবিধ দুঃখ বলতে এখানে দুঃখের সংখ্যা তিন- একথা বলা হয় নি। কারণ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালে স্থিত অসংখ্য প্রাণীর অসংখ্য দুঃখ। এই তিন কালে স্থিত অসংখ্য প্রাণীর অসংখ্য দুঃখ ঈশ্বরকৃষ্ণের মতে তিন প্রকার- এটাই বক্তব্য। কিন্তু কারিকায় এই তিন প্রকার দুঃখও চিহ্নিত না থাকায় বাচস্পতি মিশ্র তাঁর ‘সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী’ গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে- দুঃখসমূহের ত্রয় দুঃখত্রয় বা ত্রিবিধ দুঃখ। এই ত্রিবিধ দুঃখ হলো আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক।

সাংখ্যশাস্ত্র অনুসারে আন্তর উপায়ে অর্থাৎ শরীরের ভেতর থেকে উৎপন্ন রোগ জরাদি বা কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের অপ্রাপ্তি হেতু মানসিক দুঃখ-তাপসমূহ হলো আধ্যাত্মিক দুঃখ। এই আধ্যাত্মিক দুঃখ দুই প্রকার- শারীর ও মানস। বাত, পিত্ত ও শ্লেষ্মার তারতম্যের ফলে শারীর দুঃখ জন্মে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ভয়, ঈর্ষা, বিষাদ এবং কাঙ্ক্ষিত বিষয় না পাওয়ার ফলে মানস দুঃখ জন্মে।
অন্যদিকে আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক দুঃখ হলো বাহ্য উপায়ে সাধ্য অর্থাৎ শরীরের বাইরের কোন কারণ থেকে উৎপন্ন দুঃখ। মানুষ, পশু-পক্ষী, সরীসৃপ ও স্থাবর উৎস থেকে উৎপন্ন যে দুঃখ, তা হলো আধিভৌতিক দুঃখ। আর মহামারী, ভূমিকম্প, যক্ষ, রাক্ষস, বিনায়ক প্রভৃতি দৈব বা গ্রহাদির সংস্থান থেকে উৎপন্ন যে দুঃখ, তাই আধিদৈবিক দুঃখ।

জন্ম থেকেই জীব এই দুঃখত্রয়ের ত্রিতাপ জ্বালায় জর্জরিত। এই ত্রিতাপ দুঃখ থেকে চিরনিবৃত্তিই তার চরম লক্ষ্য বা পরম পুরুষার্থ। এই দুঃখ নিবৃত্তির উপায় কী ?
বলা হচ্ছে, দুঃখের অভিভব বা নিবারণ সম্ভব এবং তিন প্রকার দুঃখের নিবারণের তিন প্রকার উপায় আছে। যথা- (১) দৃষ্টবৎ বা লৌকিক উপায়, (২) আনুশ্রবিক উপায় তথা বেদবিহিত যাগযজ্ঞাদি কর্মকলাপ এবং (৩) সাংখ্যশাস্ত্রবিহিত উপায়- তত্ত্বজ্ঞান বা বিবেকজ্ঞান।

যোগ-দর্শন
ভারতীয় আধ্যাত্মদর্শনে অন্যতম প্রভাবশালী দর্শন হলো যোগ দর্শন। মহর্ষি পতঞ্জলি এই দর্শনের সূত্রকার। ‘যোগসূত্র’ বা ‘পাতঞ্জলসূত্র’ই এই দর্শনের মূল বা সূত্রগ্রন্থ। পতঞ্জলির নাম অনুসারে এই দর্শনকে পাতঞ্জল দর্শনও বলা হয়। দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকে সাংখ্য ও যোগ দর্শনের মধ্যে প্রভেদ খুবই সামান্য। তাই এ দুটোকে পরস্পর সমানতন্ত্র দর্শন বলা হয়। মহর্ষি কপিলের সাংখ্য দর্শনে স্বীকৃত পঞ্চবিংশতি তত্ত্বে কোন ঈশ্বরকে স্বীকার করা হয়নি। সাংখ্যের পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব বা পঁচিশ প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- (১) জ্ঞ বা পুরুষ, (২) অব্যক্ত বা মূলপ্রকৃতি বা প্রধান, (৩) মহৎ বা বুদ্ধি, (৪) অহংকার, (৫) মনস্ বা মন (৬) পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক- এই পাঁচটি), (৭) পঞ্চকর্মেন্দ্রিয় (বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ- এই পাঁচটি), (৮) পঞ্চতন্মাত্র বা পঞ্চসূক্ষ্মভূত (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ- এই পাঁচটি), (৯) পঞ্চস্থূলভূত বা পঞ্চমহাভূত (ক্ষিতি বা পৃথিবী, অপ্ বা জল, তেজ বা অগ্নি, মরুৎ বা বায়ু, আকাশ বা ব্যোম্- এই পাঁচটি)। অন্যদিকে পতঞ্জলির যোগ দর্শনে সাংখ্যের পঁচিশটি তত্ত্বের সাথে অতিরিক্ত একটি তত্ত্ব ঈশ্বরতত্ত্ব যুক্ত করে ঈশ্বর স্বীকৃত হয়েছে বলে নিরীশ্বর-সাংখ্যের বিপরীতে যোগ দর্শনকে ‘সেশ্বর-সাংখ্য’ও বলা হয়ে থাকে।

প্রাচীন ভারতে ‘সাংখ্য’ ও ‘যোগ’ এই দুটি ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায়ের নাম প্রায় সম অর্থে ব্যবহৃত হতো। তাই যোগ-সম্প্রদায়ের এই ঈশ্বর-স্বীকৃতির ইতিহাস ঠিক কতোটা প্রাচীন- তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও, প্রাচীন উপনিষদ পুরাণ ইত্যাদিতে যোগ ও যোগানুষ্ঠান বিধানের উল্লেখ দেখা যায়। এছাড়া প্রাচীন সাহিত্য ও শাস্ত্র গ্রন্থগুলিতে যথা- মহাভারত, গীতা ইত্যাদিতে এই দুই সম্প্রদায়কে এক বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সেসব শাস্ত্রগ্রন্থে দুটোকে এক বলা হলেও, দর্শন-সম্প্রদায়গত আলোচিত তত্ত্বের গুরুত্ব অনুযায়ী ভারতীয় দর্শন জগতে এ দুটি পৃথক সম্প্রদায়, দুটি পৃথক প্রস্থান। কেননা দুই সম্প্রদায়ের ভিত্তি এক হলেও এদের ব্যবহারিক প্রয়োগ ভিন্ন।

যে দর্শন কেবল তত্ত্ব-নিদিধ্যাসন এবং বৈরাগ্য-অভাসের দ্বারা আত্মসাক্ষাৎকারে বিশ্বাসী, তাকে সাংখ্য এবং যে দর্শন তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধানরূপ ক্রিয়ার সাহায্যে আত্মসাক্ষাৎকারে বিশ্বাসী, তাকে যোগ বলা হয়। সাংখ্য বর্ণিত পুরুষতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, জগৎ পরিণাম, সৎকার্যবাদ এবং মোক্ষ এসব যোগসম্মত। তবে কৈবল্যলাভের উপায় সম্পর্কে যোগ দর্শনে সাংখ্যের অতিরিক্ত কিছু নির্দেশ আছে। সাংখ্য দর্শনে বিবেকজ্ঞানকেই ত্রিবিধ দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি এবং কৈবল্যলাভের উপায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে যোগ দর্শনে বিবেকজ্ঞান লাভ ও কৈবল্য প্রাপ্তির জন্য অতিরিক্ত কিছু প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াগুলিকে এককথায় ‘যোগ’ বলা হয়। তাই বলা হয়- ‘যোগ ঠিক দর্শন নয়, যোগ; আর যোগ মানে চিত্তবৃত্তি-নিরোধ- যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ। যোগশাস্ত্রের আরম্ভই হয়েছে এভাবে। তার পর প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠেছে- চিত্তবৃত্তি কী কী? নিরোধ হয় কী প্রকারে? নিরোধের ফল কী? ইত্যাদি।
চিত্তের বৃত্তি সকল নিরোধ হলে যে অবস্থা হয়, তার নাম সমাধি। সমাধিরও প্রকারভেদ আছে; এভাবে আলোচনা বিস্তৃত হয়েছে। মূল কথা হলো, যোগশাস্ত্র সাধণার কথা- দর্শন-চর্চার কথা নয়।

পতঞ্জলির যোগসূত্র চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এরা যথাক্রমে সমাধিপাদ, সাধনপাদ, বিভূতিপাদ ও কৈবল্যপাদ। প্রথম সমাধিপাদে রয়েছে যোগের প্রকৃতি, লক্ষ্য ও নানা প্রকারভেদের কথা; দ্বিতীয় সাধনপাদে রয়েছে সমাধিলাভের উপায়। তৃতীয় বিভূতিপাদে রয়েছে যোগীর অলৌকিক শক্তি বা বিভূতিলাভের কথা, আর চতুর্থ কৈবল্যপাদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে মুক্তির প্রকৃতি ও প্রকারভেদের কথা।

যোগশাস্ত্র মতে যোগ-ই তত্ত্বজ্ঞান লাভ এবং দুঃখ-নিবৃত্তির প্রধান উপায়। যোগের দ্বারাই পুরুষ বা আত্মা স্ব-স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে। এই মতে ঈশ্বর-প্রণিধান পুরুষের প্রত্যক্ষলব্ধ অভিজ্ঞতা। তাই সাংখ্য দর্শনকে তত্ত্বমূলক দর্শন এবং যোগ দর্শনকে প্রয়োগমূলক দর্শন বলা বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও জগতের বিবর্তন, ভ্রমের ব্যাখ্যা, মোক্ষের স্বরূপ এবং ঈশ্বর-কর্তৃত্বের বিষয়ে সাংখ্য ও যোগের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সাংখ্য-পরিণামবাদ হলো অচেতন উদ্দেশ্যবাদ, কিন্তু যোগ-পরিণামবাদ হলো সচেতন উদ্দেশ্যবাদ। যোগমতে ঈশ্বরই যেহেতু বিবর্তন-প্রক্রিয়ার কর্তা, তাই জগতের বিবর্তন কখনোই অচেতন হতে পারে না। মোটকথা, পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে জগৎ বহির্ভূত যে অতিরিক্ত ঈশ্বরতত্ত্ব স্বীকার করেছেন, তার ফলে জগতের অভিব্যক্তি, কল্পান্তে প্রলয় ও তার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যোগমত, সাংখ্যমত থেকে ভিন্ন হয়ে পড়েছে।

ন্যায়-দর্শন
ভারতীয় আস্তিক ষড়দর্শনের মধ্যে ন্যায়দর্শনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ন্যায়দর্শনের দুটি শাখা- প্রাচীন ন্যায় ও নব্য ন্যায়। প্রাচীন ন্যায়দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মহর্ষি গোতম। কেউ কেউ বলেন গৌতম। মহর্ষি রচিত ‘ন্যায়সূত্র’ হলো ন্যায়দর্শনের মূল গ্রন্থ। গৌতমের অপর নাম অক্ষপাদ (২৫০ খ্রিঃ)। তাঁর এই নাম অনুসারে ন্যায়দর্শনকে অক্ষপাদদর্শনও বলা হয়ে থাকে। অক্ষপাদ গৌতমের ন্যায়শাস্ত্র বুদ্ধিবাদী বা যুক্তিবাদী।

ন্যায় দর্শনের ইতিহাস অতি প্রাচীন ও বিস্তৃত। এ দর্শনের উপর একাধিক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তবে মহর্ষি গৌতমের ‘ন্যায়সূত্র’  প্রাচীন ন্যায়দর্শনের মূল গ্রন্থ। এ  গ্রন্থে পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে এবং প্রতিটি অধ্যায় দুটি করে আহ্নিক বা খণ্ডে বিভক্ত। ন্যায়সূত্রের বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ হচ্ছে ভাষ্যকার বাৎসায়নের ‘ন্যায়ভাষ্য’। এছাড়া উদ্দ্যোতকরের ‘ন্যায়বার্ত্তিক’, বাচস্পতি মিশ্রের (নবম শতক) ‘ন্যায়বার্তিক-তাৎপর্য টীকা’, উদয়নাচার্যের (দশম শতক) ‘ন্যায়বার্তিক-তাৎপর্যপরিশুদ্ধি’ এবং ‘ন্যায়-কুসুমাঞ্জলি’, জয়ন্ত ভট্টের (নবম-দশম শতক) ন্যায়মঞ্জরী ইত্যাদি গ্রন্থে ন্যায়সূত্রের তাৎপর্য ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

উদয়নাচার্যের পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতকে মহানৈয়ায়িক গঙ্গেশ উপাধ্যায় সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতিতে ন্যায় দর্শনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। এই নতুন অধ্যায় নব্যন্যায় নামে পরিচিত। গঙ্গেশের যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘তত্ত্বচিন্তামণি’ এই অধ্যায়ের ভিত্তিস্তম্ভ। প্রথমে মিথিলায় এবং পরে নবদ্বীপে এর প্রসার ঘটে। ন্যায়-সম্প্রদায়ের ইতিহাসে এই নব্য-ন্যায় মতের গ্রন্থটি এমনই যুগান্তর সৃষ্টি করে যে, এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থগুলি এমনকি ন্যায়সূত্র এবং বৈশেষিকসূত্রও অবহেলিত ছিলো বলে জানা যায়। সাম্প্রতিককালে এগুলির চর্চা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

ন্যায়সম্প্রদায়ে তর্কবিদ্যার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। তবে প্রাচীন ন্যায়ে যে সকল দার্শনিক তত্ত্ব পরিলক্ষিত হয়, নব্যন্যায়ে তা বহুলাংশেই অনুপস্থিত। এখানে তর্কবিদ্যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছে এবং দার্শনিক তত্ত্বের তুলনায় যৌক্তিক শুদ্ধতা ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের উপরই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তারপর থেকে সম্প্রদায়টিতে কোনো নির্দিষ্ট দার্শনিক মত চর্চা করবার উৎসাহ প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে বলে বিদ্বানদের অভিমত। নব্যন্যায়ের এক ও অদ্বিতীয় উৎসাহ কেবল তর্কেই। এই নব্যন্যায় মতকে ঘিরেও বেশ কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছে। তার মধ্যে বাসুদেব সার্বভৌম (পঞ্চদশ শতক), রঘুনাথ শিরোমণি, জগদীশ তর্কালঙ্কার, গদাধর ভট্টাচার্য প্রমুখের রচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিশ্বনাথের ‘ভাষাপরিচ্ছেদ’ এবং অন্নংভট্টের ‘তর্কসংগ্রহ’ ন্যায়-প্রস্থানের বিশেষ করে নব্যন্যায়ের মূল সিদ্ধান্তগুলিকে সংক্ষেপে ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস।

নীয়তে অনেন ইতি ন্যায়ঃ।’ অর্থাৎ এই শাস্ত্রের দ্বারা পরিচালিত হয়ে মানুষের বুদ্ধি স্থির মীমাংসায় উপনীত হয় বলে এই শাস্ত্রকে বলা হয় ন্যায়। ফলে যথাযথ জ্ঞান লাভ করতে হলে কী কী উপায় অবলম্বন করে শুদ্ধ চিন্তায় উপনীত হতে পারা যায়- তা-ই হলো ন্যায় দর্শনের মূল উদ্দেশ্য। তাই যথার্থ জ্ঞান লাভের প্রণালী হিসেবেই ন্যায় দর্শনকে আখ্যায়িত করা হয়।

ন্যায় দর্শন যুক্তিমূলক বস্তুবাদী দর্শন। জ্ঞানের বিষয়ের যে জ্ঞান-ভিন্ন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে তা এই দর্শনে স্বীকৃত। অর্থাৎ বিভিন্ন বস্তুর জ্ঞান নিরপেক্ষ অস্তিত্ব আছে। কারণ বস্তুর অস্তিত্ব আমাদের জানা বা না-জানার উপর নির্ভর করে না। শুধুমাত্র যুক্তি তর্ক বিচারের মাধ্যমে নৈয়ায়িকরা বস্তুর জ্ঞাননিরপেক্ষ অস্তিত্ব স্বীকার করে নেন বলে নৈয়ায়িকদের বস্তুবাদ যুক্তিমূলক বস্তুবাদ।

যেহেতু ন্যায় দর্শন বেদকে প্রামাণ্য বলে গ্রহণ করে, তাই ন্যায় দর্শন আস্তিক দর্শন। তবে বেদকে প্রামাণ্য বলে গ্রহণ করলেও এ মতবাদ স্বাধীন চিন্তা ও বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের চিন্তাধারাকে ফলপ্রসূ করার জন্য নির্দেশ দেয় বলে ন্যায় দর্শনকে ‘ন্যায়বিদ্যা’ বলা হয়। এই মতে ‘প্রমা’ বা যথার্থজ্ঞান লাভের প্রণালীকে ‘প্রমাণ’ বলা হয়। প্রমা এবং প্রমাণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বলে ন্যায় দর্শনকে প্রমাণশাস্ত্র নামেও অভিহিত করা হয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদেরকে অনুমান, শব্দ প্রভৃতি প্রমাণের উপর নির্ভর করতে হয়। এই প্রমাণগুলির তত্ত্ব একমাত্র ন্যায়শাস্ত্রেই বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এছাড়া ন্যায়দর্শন সব শাস্ত্রকে নির্ভুলভাবে প্রতিভাত করে বলে ন্যায়সূত্রের ভাষ্যকার বাৎসায়ন ন্যায়দর্শনকে ‘সর্বশাস্ত্রপ্রদীপ’ বা ‘সকল বিদ্যার প্রদীপ’ নামে অভিহিত করেছেন। আবার যুক্তির দ্বারা বিষয়ের বিশ্লেষণকে ‘ঈক্ষা’ বা মনন বলে। এই অর্থে অনুমান হলো অন্বীক্ষা (অনু + ঈক্ষা)। ন্যায় দর্শন এই অন্বীক্ষার সমাধা করে অর্থাৎ অনুমান বা ন্যায়ের সাহায্যে বস্তুর জ্ঞানলাভের পথ উন্মুক্ত করে বলে তাকে আন্বীক্ষিকীও বলা হয়ে থাকে।

ন্যায়দর্শনে যুক্তি-তর্ক এবং জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনার প্রাধান্য থাকলেও যুক্তি-তর্ক করাই কিন্তু ন্যায়শাস্ত্রের চরম উদ্দেশ্য নয়। ভারতীয় অন্যান্য দর্শনের মতোই ন্যায়দর্শনের চরম উদ্দেশ্য বা পুরুষার্থ হলো মুক্তি বা মোক্ষ। যুক্তিসিদ্ধ চিন্তা এই পরম পুরুষার্থ লাভের সহায়ক মাত্র। কী করে এই পুরুষার্থ বা মোক্ষকে লাভ করা যায়, ন্যায়দর্শন সে সম্পর্কে আলোচনা করে বলে তাকে মোক্ষশাস্ত্রও বলা হয়। ন্যায়দর্শন মানুষের পার্থিব জীবনকে দুঃখময় রূপে এবং মোক্ষপ্রাপ্তিকেই মানব জীবনের পরমলক্ষ্য হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। এই মতে অবিদ্যা হলো দুঃখের কারণ এবং তত্ত্বজ্ঞান বা যথার্থজ্ঞানের দ্বারাই অবিদ্যা দূর করে মোক্ষ লাভ করা সম্ভব। ন্যায় মতে জীবের মোক্ষলাভের জন্য ষোলটি পদার্থের তত্ত্বজ্ঞান প্রয়োজন। তাই ন্যায়দর্শনে এই ষোড়শ পদার্থের বিস্তৃত আলোচনা করা হয়। এই ষোলটি পদার্থ হলো- (১) প্রমাণ, (২) প্রমেয়, (৩) সংশয়, (৪) প্রয়োজন, (৫) দৃষ্টান্ত, (৬) সিদ্ধান্ত, (৭) অবয়ব, (৮) তর্ক, (৯) নির্ণয়, (১০) বাদ, (১১) জল্প, (১২) বিতণ্ডা, (১৩) হেত্বাভাস, (১৪) ছল, (১৫) জাতি, (১৬) নিগ্রহস্থান। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা সম্ভব কিনা তা নির্ধারণ করার জন্য যথার্থজ্ঞানের প্রণালী কী হতে পারে তা ঠিক করার নিমিত্তে ন্যায়শাস্ত্রে জ্ঞানতত্ত্বের প্রয়োজন স্বীকার করা হয়। ন্যায় দর্শনের প্রধান তত্ত্বগুলি হলো- জ্ঞানতত্ত্ব, জগৎতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব এবং ঈশ্বরতত্ত্ব।

বৈশেষিক-দর্শন
ভারতীয় আস্তিক ষড়দর্শনের মধ্যে অন্যতম দর্শন হলো বৈশেষিক দর্শন। এই দর্শনের ‘পদার্থতত্ত্ব’ বা ‘বিশ্বতত্ত্বে’র জ্ঞান প্রাচীনকালে যে কোন ছাত্রের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হতো। বিশ্বতত্ত্বের আলোচনাই বৈশেষিক দর্শনের প্রধান আলোচনা। ন্যায়-সম্প্রদায়ের মতো বৈশেষিক সম্প্রদায়ও মোক্ষকেই পরমপুরুষার্থ বলে মনে করেন। ন্যায়দর্শনে যেমন ষোড়শ পদার্থের তত্ত্বজ্ঞানকে মোক্ষের হেতুরূপে গণ্য করা হতো, বৈশেষিকদর্শনে তেমনি দ্রব্যাদি সপ্তপদার্থের সাধর্ম্য বা বৈধর্ম্যহেতুক তত্ত্বজ্ঞানকেই মোক্ষের হেতুরূপে গণ্য করা হয়।

মহর্ষি কণাদ-এর ‘বৈশেষিকসূত্র’ হলো বৈশেষিক দর্শন-সম্প্রদায়ের মূল ও আদিগ্রন্থ। ‘বিশেষ’ পদার্থের উপর গুরুত্ব আরোপ করায় এই দর্শন ‘বৈশেষিক দর্শন’ নামে সমধিক পরিচিত হয়ে থাকলেও ক্ষেত্র বিশেষে ‘কণাদদর্শন’, ‘ঔলূক্যদর্শন’, ‘কাশ্যপীয় দর্শন’ প্রভৃতি নামেও পরিচিত। এই নামগুলির পেছনে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে।
মহর্ষি কণাদ ‘কণভূক’, ‘কণভক্ষ’, ‘যোগী’, ‘উলূক’, ‘কাশ্যপ’ প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিলেন। প্রবাদ আছে যে, তিনি দিবাভাগে গহন অরণ্যে গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন এবং রাত্রিকালে সবাই যখন নিদ্রিত থাকতো তখন তিনি আহারান্বেষণে বের হতেন। এরকম বৃত্তি উলূক বা পেচকের বৃত্তি তুল্য বলে তাঁর উলূক নামকরণ করা হয়েছে। মহাভারতের শান্তিপর্ব-১১-এ এরকম কাহিনীর ছায়া রয়েছে- ‘উলূকঃ পরমো বিপ্রো মার্কণ্ডেয় মহামুনিঃ’।

অন্য এক প্রবাদে বলা হয়েছে কণাদ কঠোর যোগাভ্যাসের ফলে শিবের অনুগ্রহ লাভ করেন। শিব কণাদের তপশ্চর্যায় সন্তুষ্ট হয়ে উলূকের রূপ ধরে তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন এবং ষটপদার্থের উপদেশ দান করেন। বায়ুপুরাণেও উল্লেখ আছে যে, কণাদ পরম শৈব ছিলেন। ‘কণাদ’ নাম প্রসঙ্গে ন্যায়কন্দলীতে উল্লেখ আছে, ক্ষেত্রে পড়ে থাকা শস্যকণা ভক্ষণ করে অর্থাৎ একপ্রকার ভিক্ষাবৃত্তির দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন বলে তাঁকে কণাদ বলা হতো। এবং এ কারণেই তাঁকে কণভূক বা কণভক্ষ বলা হতো। আবার কণাদ কাশ্যপ গোত্রীয় ছিলেন বলে তাঁর দর্শনকে কাশ্যপীয় দর্শনও বলা হয়। মোটকথা বৈশেষিক সূত্রকারের বিবিধ নাম অবলম্বনেই এই সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে সাধারণভাবে এই দর্শন ‘বৈশেষিক দর্শন’ নামেই পরিচিত।

বৈশেষিক সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র ও নিজস্ব গ্রন্থাবলী খুব বেশি নয়। ভারতীয় দর্শন সাহিত্যে প্রাচীনতম সূত্রর অন্যতম নিদর্শন হিসেবে মহর্ষি কণাদের ‘বৈশেষিক সূত্র’কে স্বীকার করা হয়। এই গ্রন্থের প্রকৃত কোন ভাষ্যগ্রন্থ পাওয়া যায় না। লঙ্কেশ্বর রাবণ এই দর্শনের প্রাচীন ভাষ্যকার হিসেবে বেদান্ত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। আচার্য শঙ্কর এই ভাষ্যকে রাবণভাষ্য বলে উল্লেখ করেছেন। বেদান্তদর্শনে বৈশেষিকমতখণ্ডন প্রসঙ্গে শঙ্করাচার্য রাবণভাষ্যের মতের খণ্ডন করেছেন বলে জানা যায়। অনেকের মতে আচার্য প্রশস্তপাদ (২০০ খ্রিঃ)-এর ‘পদার্থধর্মসংগ্রহ’ বৈশেষিক-দর্শনের সঠিক ভাষ্য না হলেও ভাষ্যস্থানীয় এবং তা প্রশস্তপাদভাষ্য নামে পরিচিত। মূলত পদার্থধর্মসংগ্রহে সূত্র ব্যাখ্যাত হয়নি, তবে সূত্রের তাৎপর্য সংক্ষেপে ও যোগ্যতার সাথে সংগৃহীত হয়েছে। এটিই বর্তমানে প্রাপ্ত গ্রন্থাবলীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ।  উদয়নাচার্যের (১০০০-১১০০ খ্রিঃ) ‘কিরণাবলী’ এবং শ্রীধরাচার্যের (৯৯১ খ্রিঃ) ‘ন্যায়কন্দলী’ এই পদার্থধর্মসংগ্রহের উপর উল্লেখযোগ্য টীকাগ্রন্থ। এছাড়া বল্লভাচার্যের (১১০০-১১৫০ খ্রিঃ) ‘ন্যায়লীলাবতী’, চন্দ্রানন্দের ‘বৃত্তি’, শঙ্কর মিশ্রের (১৪৬২ খ্রিঃ) ‘বৈশেষিকসূত্রোপস্কার’ প্রভৃতি বৈশেষিক দর্শনের উল্লেখযোগ্য স্বতন্ত্র গ্রন্থ।

বৈশেষিক সম্প্রদায়ের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র গ্রন্থাবলী খুব বেশি না হলেও ভারতীয় দর্শনে বৈশেষিক-মতের আলোচনা সুবিশাল। কেননা বৈশেষিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ন্যায় সম্প্রদায়ের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ট এবং দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকে উভয়েরই প্রতিপাদ্য বিষয় অভিন্ন বা প্রায়-অভিন্ন। এজন্যেই ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনকে সমানতন্ত্র দর্শন বলা হয়। ফলে বহু গ্রন্থেই ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের তত্ত্বসমূহ একই সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রাচীন ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন স্বতন্ত্রভাবে আলোচিত হলেও আচার্য উদয়নের কাল থেকেই উভয় দর্শনের তত্ত্বসমূহ একই সঙ্গে ন্যায়-বৈশেষিক হিসেবে আলোচিত হতে দেখা যায়। এভাবে পরবর্তীকালে ন্যায়-বৈশেষিক দর্শন চর্চায় শিবাদিত্যের (১১৫০-১২০০ খ্রিঃ) ‘সপ্তপদার্থী’, লৌগাক্ষি ভাস্করের ‘তর্ককৌমুদী’, রঘুনাথ শিরোমণির (১৫০০-১৫৫০ খ্রিঃ) দীধিতি বা ‘পদার্থতত্ত্বনিরূপণ’, বিশ্বনাথ ন্যায় পঞ্চাননের (১৬০০-১৬৫০ খ্রিঃ) মুক্তাবলী টীকা সহ ‘ভাষাপরিচ্ছেদ’ এবং অন্নংভট্টের (১৫৫০-১৬০০ খ্রিঃ) ‘তর্কসংগ্রহ’ প্রভৃতি গ্রন্থে বৈশেষিকসম্মত মত এবং ন্যায়সম্মত মতের পার্থক্য প্রাসঙ্গিক স্থলে উল্লেখ করা হলেও যে সকল বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, সে সকল ক্ষেত্রে যে কোন একটি মতেরই উল্লেখ আছে।

ন্যায় ও বৈশেষিক এই দুই সমানতন্ত্র দর্শনে প্রধান প্রধান বিষয়ে উভয় সম্প্রদায় একমত হলেও কোন কোন অপ্রধান বিষয়ে অবশ্য উভয় সম্প্রদায়ের মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ন্যায়শাস্ত্র প্রধানত প্রমাণশাস্ত্র। তারা প্রমাণ চতুষ্টয়বাদী। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান, শব্দ- এই চারটি প্রমাণ ন্যায়দর্শনের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। কিন্তু বৈশেষিক দর্শনের মুখ্য আলোচ্য বিষয় প্রমেয় বা পদার্থ। বৈশেষিক দর্শন মুখ্যত প্রমেয়শাস্ত্র বা পদার্থশাস্ত্র। নৈয়ায়িকদের স্বীকৃত চারটি প্রমাণের মধ্যে বৈশেষিকেরা প্রত্যক্ষ ও অনুমান এই দুটি প্রমাণ স্বীকার করেছেন। উপমান ও শব্দ প্রমাণকে বৈশেষিকেরা প্রত্যক্ষ ও অনুমানের অন্তর্গত করেছেন। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু পরিভাষাগত ভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়।
ন্যায়দর্শনে ষোড়শ পদার্থের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বৈশেষিক দর্শনে সপ্ত পদার্থের কথা বলা হয়েছে। তবে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। পদার্থ বিষয়ে উভয় সম্প্রদায়ের সংখ্যার পার্থক্য দুটি ভিন্ন বিন্যাস-প্রক্রিয়ার পার্থক্য মাত্র। বস্তুত সামগ্রিকভাবে জগতের পদার্থ বিষয়ে উভয় মতের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ন্যায় দর্শনে ষোড়শ পদার্থের মাধ্যমে যে সকল তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে, বৈশেষিক দর্শনে তা সপ্তপদার্থের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ন্যায় দর্শনে যেমন প্রমাণের আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে, বৈশেষিক দর্শনে তেমনি ভৌততত্ত্ব বা বিশ্বতত্ত্বের আলোচনাই গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্ববৈচিত্র্য তথা পার্থিব জগতকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বৈশেষিক সম্প্রদায় সাতটি পদার্থ স্বীকার করেছেন। এই সাতটি পদার্থ হলো- দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় ও অভাব। জগতে এমন কিছু নেই যা এই সাতটি পদার্থের কোন না কোনটির অন্তর্গত নয়। সুতরাং, বিশ্বের মৌলিক তত্ত্ব হলো সাতটি। অবশ্য ‘অভাব’ বা সপ্তম পদার্থটি সংক্রান্ত কিছু মতভেদ আছে বলে জানা যায়। দেবীপ্রসাদ বলেন, খুব সম্ভব, বৈশেষিক সম্প্রদায়ের প্রাচীন পর্যায়ে স্বতন্ত্র পদার্থ হিসেবে ‘অভাব’-এর কথা স্বীকৃত হয়নি; প্রশস্তপাদই প্রথম ‘অভাব’ হিসেবে সপ্তম পদার্থের কথা স্বীকার করেন- তাঁর আগে পর্যন্ত বৈশেষিক দর্শনে শুধু ছয়টি পদার্থ স্বীকৃত হয়েছিলো। অর্থাৎ অনেক সময় বৈশেষিক-দর্শনকে ষট্পদার্থ-বর্ণন বলা হয়। দ্রব্য নামের পদার্থ আবার নয় রকম- পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মন। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি দ্রব্যকে,- পৃথিবী, জল, বায়ু, তেজ ও আকাশকে- পঞ্চভূত বলে। অর্থাৎ এই পাঁচটি দ্রব্যের সাধারণ সংজ্ঞা ‘ভূত’ বা ম্যাটার। এই মতে, পঞ্চভূতের মধ্যে আকাশ ছাড়া প্রথম চারটির মূলে রয়েছে চার-রকম পরমাণু। পৃথিবী আদি পরমাণুপুঞ্জ। বৈশেষিক-মতে, পরমাণু নিত্য, তার উৎপত্তি নেই, বিনাশ নেই। এইজন্য বৈশেষিক-দর্শনকে পরমাণুবাদ আখ্যা দেওয়া হয়; কারণ, অচেতন ও নিত্য পরমাণুপুঞ্জই সমস্ত জন্য-দ্রব্যের মূল উপাদান-কারণ বলে এই মতে স্বীকৃত।

মীমাংসা-দর্শন
ভারতীয় দর্শনে যে ছয়টি সম্প্রদায় বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করেন, তাঁদের মধ্যে দুটি সম্প্রদায় নিঃসংশয়ে বৈদিক বা বেদমূলক। এদের একটি হলো পূর্ব-মীমাংসা বা সংক্ষেপে মীমাংসা, অন্যটি উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্ত।
সাধারণত বেদের যে চারটি পর্যায় স্বীকার করা হয়- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ- এদের মধ্যে সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে বলা হয় কর্মকাণ্ড এবং আরণ্যক ও উপনিষদকে বলা হয় জ্ঞানকাণ্ড। কর্মকাণ্ডে, বিশেষ করে যজুর্বেদ ও ব্রাহ্মণগুলিতে বেদের যাজ্ঞিক ক্রিয়াকর্মের স্বরূপ এবং কর্মবিষয়ক বেদবাক্যসমূহের তাৎপর্য বিবৃত হয়েছে। তার বিচারকে বলা হয় পূর্ব-মীমাংসা। আর জ্ঞানকাণ্ড, অর্থাৎ বেদের অন্তিমভাগ বা উপনিষদ (বেদান্ত) যার মূখ্য বিষয় হলো আধ্যাত্মিক জ্ঞান, যেখানে আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি এবং জ্ঞান-বিষয়ক বাক্যসমূহের অর্থ বিবৃত হয়েছে, তার বিচারকে বলা হয় উত্তর-মীমাংসা। কিন্তু দার্শনিকদের ব্যবহার অনুসারে জৈমিনি প্রবর্তিত পূর্বমীমাংসা বোঝাতে কেবল ‘মীমাংসা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, আর উত্তর-মীমাংসা বোঝাতে সাধারণভাবে ‘বেদান্ত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। পূর্ব-মীমাংসার আরেক নাম ধর্ম-মীমাংসা বা কর্ম-মীমাংসা, এবং উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্তের আরেক নাম ব্রহ্ম-মীমাংসা। তবে এ দুই শাস্ত্রের জন্য যথাক্রমে মীমাংসা দর্শন ও বেদান্ত দর্শন এই দুটি নামই সমধিক প্রচলিত। মীমাংসাদর্শন সম্পূর্ণরূপে বেদমূলক। এতে স্বাধীন মতবাদের অবকাশ নেই বললেই চলে।

মীমাংসাশাস্ত্র দর্শন হলেও অনেকাংশে তা ব্যাকরণ এবং ন্যায়শাস্ত্রের বাদার্থ বা শব্দখণ্ডের মতো। পদশাস্ত্র হলো ব্যাকরণ এবং প্রমাণশাস্ত্র হলো ন্যায়। এই পদবাক্যপ্রমাণ-তত্ত্বজ্ঞ না হলে প্রাচীনকালে কেউ সুপণ্ডিত বলে বিবেচিত হতেন না। তাই প্রাচীন দর্শনশাস্ত্রের প্রাসঙ্গিক আলোচনা ও ব্যাখ্যায় এগুলির প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। এ প্রেক্ষিতে আচার্যরা মীমাংসাকে বাক্যশাস্ত্রও বলে থাকেন। শ্রুতি স্মৃতি প্রভৃতি শাস্ত্রের তাৎপর্যবোধে মীমাংসাশাস্ত্র উপায়স্বরূপ বলে এই শাস্ত্রকে ‘ন্যায়’ও বলা হতো। একারণেই হয়তো মীমাংসাশাস্ত্রের অনেক গ্রন্থ ন্যায়নামেও অভিহিত হয়েছে। যেমন- ‘ন্যায়কণিকা’, ‘ন্যায়মালা’, ‘ন্যায়প্রকাশ’ প্রভৃতি। পূর্বমীমাংসা ও উত্তরমীমাংসার এক একটি অধিকরণ বা বিচারের সিদ্ধান্তকেও ন্যায় বলা হতো। মীমাংসা এবং ন্যায়- এই দুটি শব্দই প্রাচীনকাল থেকে মীমাংসাদর্শনরূপ অর্থে প্রচলিত ছিলো। তার্কিক আচার্যরা ন্যায় শব্দটিকে একটি বিশেষ অর্থে গ্রহণ করে তাঁদের দর্শনের নামই করেছিলেন ন্যায়দর্শন। পরবর্তীকালে যুক্তিমূলক দর্শনের একটি ভিন্ন প্রস্থান হিসেবে ন্যায়দর্শনের উৎপত্তি হওয়ায় ন্যায় বলতে এখন আর মীমাংসাদর্শনকে বোঝায় না।

বস্তুত বৈদিক যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর বৈদিক বাক্যের অর্থ এবং বৈদিক বিধান নিয়ে নানা ধরনের বিবাদ ও অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়। এ সময়ে বেদ-বিরোধী বৌদ্ধধর্মের প্রভাব অতি প্রবল আকার ধারণ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেদবাক্য ও বেদবিধি নিয়ে নানা ধরনের সংশয় দেখা যায়। বেদের উপজীব্য যজ্ঞীয় কর্মকাণ্ড নামক ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের অসারতা পরিলক্ষিত হতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের ধারক-বাহক যজমান পুরোহিত ব্রাহ্মণদের জীবিকা সংশয় দেখা দেওয়ার প্রেক্ষিতে এ ধর্মসংকট কাটিয়ে উঠার জন্য স্মৃতি, পুরাণ, ইতিহাস প্রভৃতি শাস্ত্র বেদবাক্যের তাৎপর্য নির্ধারণে সচেষ্ট হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টাও প্রবল সংকটকে কাটিয়ে উঠতে পারে না। কেননা ইতোমধ্যে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ পরিশ্রমলব্ধ কর্মানুষ্ঠানের চাইতে জ্ঞানযোগের মাধ্যমে ধর্ম ও মোক্ষের সন্ধানে প্রবৃত্ত বিভিন্ন জ্ঞান-দর্শনের আবির্ভাব হওয়ায় যজ্ঞীয় কর্মকাণ্ডের জ্ঞানতাত্ত্বিক দার্শনিক ভিত্তিশূন্যতা দেখা দেয়। মহর্ষি জৈমিনি বৈদিক কর্মকাণ্ডের এই গভীর সংকটকে দূর করার জন্য বেদবাক্যের যথার্থ ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন কর্মের স্বরূপ ও অনুষ্ঠানপ্রণালী স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার অভিপ্রায়ে মীমাংসাসূত্র রচনা করেন।

মীমাংসা-দর্শনের প্রাচীনতম এবং মূল গ্রন্থ হলো জৈমিনির ‘মীমাংসাসূত্র’। ভারতীয় দর্শনের সূত্রগ্রন্থ হিসেবে এটিকেই সর্বপ্রাচীন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও তার রচনাকাল সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হওয়া যায় না। বিভিন্ন বিদ্বান-গবেষকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় ২০০-এর মধ্যে হওয়াই সম্ভব। তবে আধুনিক বিদ্বানমহলে মীমাংসাসূত্র’র রচনাকাল খ্রিস্টীয় ২০০-র কিছু পূর্ববর্তী বলে বিবেচিত হয়। জৈমিনির রচনা বলেই মীমাংসাসূত্রকে ‘জৈমিনিসূত্র’ও বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে মীমাংসাসূত্রের উপর অনেক ভাষ্যগ্রন্থ রচিত হয় বলে ধারণা করা হয়। তবে এসব ভাষ্যগ্রন্থের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ ভাষ্যকার শবরস্বামীর ‘শাবরভাষ্য’ই প্রাচীনতম। এই শাবরভাষ্যেই মীমাংসাসূত্রের প্রাচীনতর ব্যাখ্যাকারদের কথা পাওয়া যায়।

শবরের কাল-নির্ণয়ও অনিশ্চিত। শুধু এটুকু ধারণা করা হয় যে, শবর খ্রিস্টীয় ৪০০-এর পূর্ববর্তী হবেন। এবং মীমাংসা-দর্শনের সমস্ত আলোচনার প্রধানতম ভিত্তি এই শাবরভাষ্যই। এমনও শোনা যায়- ‘বাক্যপদীয়’ গ্রন্থের প্রণেতা ভর্ত্তৃহরি শবরস্বামীর পুত্র। প্রবাদ আছে- জৈনগণের নিকট থেকে দূরে থাকবার নিমিত্তে তিনি নাকি শবরের বেশ ধারণ করে শবরবসতিতে বাস করতেন। শবরস্বামী জৈমিনিসূত্রের শুধু বারো অধ্যায়ের ভাষ্য রচনা করেছিলেন। তাঁর ভাষ্যের ভাষা অতি সরল ও প্রসাদগুণযুক্ত। প্রসঙ্গত, শাবরভাষ্য এবং পতঞ্জলির মহাভাষের মতো সরল ভাষায়, ছোট ছোট বাক্যবিন্যাসে আর কোন ভাষ্যগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় রচিত হতে দেখা যায় নি। আচার্য শঙ্করের ব্রহ্মসূত্রভাষ্যের ভাষাও সরল ও সাহিত্যগন্ধী বলে অনেকে উল্লেখ করেন। তবে এর বাক্যগুলি শাবরভাষ্যের মতো স্বল্পপদ নয়। শাবরভাষ্য ছাড়া জৈমিনিসূত্র বোঝা অসম্ভব বলেই বিজ্ঞজনের অভিমত।

শবরের পর মীমাংসকাচার্যদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুজন হলেন- প্রভাকর মিশ্র ও কুমারিল ভট্ট। উভয়েই শাবরভাষ্যের ব্যাখ্যা করেছেন। প্রভাকরের প্রধান ও বড়ো ব্যাখ্যাগ্রন্থটির নাম ‘বৃহতী’ এবং সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার নাম ‘লঘ্বী’। কুমারিলের ব্যাখ্যাগ্রন্থের তিনটি খণ্ড- ‘শ্লোকবার্ত্তিক’, ‘তন্ত্রবার্ত্তিক’ এবং ‘টুপ্-টীকা’। কিন্তু প্রভাকর ও কুমারিল উভয়ের ব্যাখ্যায় এতোটাই মৌলিক পার্থক্য যে, তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে মীমাংসামত দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রভাকরের নাম থেকে প্রথমটিকে প্রাভাকর-সম্প্রদায় এবং কুমারিল-ভট্টর নাম থেকে দ্বিতীয়টিকে ভাট্ট-সম্প্রদায় নামে আখ্যায়িত করা হয়। প্রচলিত মতে প্রভাকর ছিলেন কুমারিলের শিষ্য এবং কুমারিল তাঁকে সম্ভবত বিদ্রূপ করেই গুরু আখ্যা দিয়েছিলেন, এ কারণে প্রভাকর-মত গুরুমত নামেও প্রসিদ্ধি লাভ করে।

মীমাংসা দার্শনিকেরা মূলত বেদের প্রামাণ্য প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যেই জ্ঞানের স্বরূপ, যথার্থ ও অযথার্থ জ্ঞানের পার্থক্য নির্ণয়, যথার্থ জ্ঞান লাভের উপায় এবং এতৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করেন। মীমাংসা দর্শন মতে, সমস্ত বস্তুই হয় প্রমাণ অথবা প্রমেয়ের অন্তর্গত। এই মতে, প্রমাণ হলো প্রমা বা যথার্থ জ্ঞানের করণ বা উপায়, আর প্রমেয় হলো যথার্থ জ্ঞানের বিষয়।

মূলত মীমাংসা দর্শনের প্রধান উপজীব্য হলো বেদের অপৌরুষেয়ত্ব ও নিত্যত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈদিক কর্মকাণ্ডের স্বতসিদ্ধতা প্রমাণ করা। যজ্ঞকর্ম যে নিষ্ফল নয় তার আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য প্রয়োজন হয় দার্শনিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার। ভারতীয় দর্শনের নিয়ম অনুযায়ী যে কোন দর্শনই প্রচলিত কিছু বিষয়কে যেমন বস্তু, জগত, ঈশ্বর, আত্মা, পরকাল, পাপ-পূণ্য, স্বর্গ-নরক, মোক্ষ, ধর্ম, প্রমাণ-প্রমেয় ইত্যাদি বিষয়কে নিজ নিজ মত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে হয়।  আর তা করতে গিয়ে দার্শনিক বিচারে অন্যান্য দর্শন সম্প্রদায়ের তত্ত্বের যেখান থেকে যেটুকু স্বীকার করা আবশ্যক তা নিজের মতো করে স্বীকার করা এবং যেখানে বিরোধিতার প্রয়োজন সেখানে বিরোধী যুক্তি উপস্থান করতে মীমাংসকরা কার্পণ্য করলেন না। ফলে একদিকে ঈশ্বরের অস্তিত্বে প্রচণ্ড অবিশ্বাসী এ দর্শনের বস্তুবাদী বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিস্রোতের পাশাপাশি যজ্ঞানুষ্ঠানের মতো একটি আদিম কুসংস্কারের মধ্যে যাদুক্ষমতা আরোপ প্রচেষ্টার চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচীন দর্শনটিকে জটিল স্ববিরোধিতায় ঠেলে দিয়েছে বলে একালের বিদ্বানেরা মনে করেন।

মীমাংসাদর্শন সাংখ্য বৌদ্ধ বা ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনের মতো একটা সুশৃঙ্খল সুসংহত দার্শনিক প্রস্থানরূপে গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে যাগযজ্ঞসম্পৃক্ত মন্ত্ররাশির অর্থবিচারকে উপলক্ষ করে। এই দর্শনের মুখ্য উদ্দেশ্য কোন বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্বের উদ্ভাবন ও প্রচার নয়। মুখ্য উদ্দেশ্য যাগযজ্ঞের সামাজিক প্রয়োজন অক্ষুণ্ন ও অব্যাহত রাখার জন্য মন্ত্রার্থবিচার। এই বিচারের প্রসঙ্গেই প্রয়োজনানুরূপ দার্শনিক যুক্তিতর্ক বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থিত হয়েছে।

বেদান্ত-দর্শন
উত্তর-মীমাংসার নামান্তর হলো বেদান্ত। ভারতীয় ছয়টি আস্তিক দর্শনের মধ্যে বেদান্তদর্শনকে শ্রেষ্ঠ ভাববাদী দর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা ভাববাদের চূড়ান্ত রূপ এই বেদান্তদর্শনের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ‘বেদান্ত’ বলতে বোঝায় বেদের অন্ত বা শেষ। বৈদিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে হিন্দুদের কাছে বেদ সকল জ্ঞানের আকর বলে বিবেচিত। বলা হয়ে থাকে, প্রাচীন মুনি-ঋষিরা তাঁদের উপলব্ধ সত্যকে যে সাহিত্য-ভাণ্ডারে সঞ্চিত করে রেখেছেন, তা-ই বেদ। বেদই আস্তিক ষড়দর্শনের ভিত্তি ও উৎস। বেদের চারটি অংশ- মন্ত্র বা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ। সুতরাং বেদের অন্ত অর্থাৎ উপনিষদকেই মুখ্যত বেদান্ত নামে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ, উপনিষদ তত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা ও সমর্থনই বেদান্তদর্শন।

বেদের চারটি অংশের মধ্যে সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে কর্মকাণ্ড এবং আরণ্যক ও উপনিষদকে জ্ঞানকাণ্ড বলা হয়। কর্মকাণ্ড ক্রিয়া-প্রধান। এতে মন্ত্রের সংকলন ও বিভিন্ন যাগযজ্ঞের বর্ণনা রয়েছে। অপরদিকে জ্ঞানকাণ্ড বিচার-প্রধান। বেদের বিভিন্ন মন্ত্র ও ক্রিয়াকর্মের তাৎপর্য বিচারই এই অংশের প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই বিচার চরম পরিণতি লাভ করেছে উপনিষদ অংশে। উপনিষদ বিভিন্ন কালে রচিত হয়েছে এবং তা সংখ্যায় বহু। এযাবৎ ১১২ খানা উপনিষদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান উপনিষদগুলি হলো ঈশ, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন, কেন, কঠ, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, কৌষীতকি, মৈত্রী, শ্বেতাশ্বতর প্রভৃতি।

উপনিষদের অর্থ হলো গুরু কর্তৃক শিষ্যের নিকট বর্ণিত রহস্য। ঈশ ব্যতীত সর্বপ্রাচীন (আনুমানিক ৭০০ খ্রিস্টপূর্ব) উপনিষদ ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক গদ্যে রচিত, তার পরবর্তী উপনিষদসমূহ কেবল পদ্যে অথবা গদ্য-পদ্যের সংমিশ্রণে রচিত। বিভিন্ন উপনিষদে বেদের অন্তর্নিহিত দার্শনিক তত্ত্বকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন খ্যাত-অখ্যাত দার্শনিক কর্তৃক উপনিষদের ব্যাখ্যায় যথেষ্ট পার্থক্য আছে। উপনিষদগুলির মুখ্য বিষয় ছিলো লোক বা জগৎ, ব্রহ্ম, আত্মা বা জীব, পুনর্জন্ম এবং মুক্তি।

বৈদিক সাহিত্যের কালানুক্রমিক বিচারে উপনিষদ হলো বেদের সর্বশেষ স্তর। আবার পাঠক্রমের দিক থেকে উপনিষদকে সর্বশেষ স্তরের পাঠ বলা হয়। উৎকর্ষের দিক থেকেও উপনিষদ বৈদিক সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্তর বা পরিপূর্ণ বিকাশ বা সর্বশেষ পরিণতি বলা যায়। প্রাচীন আর্য বা হিন্দু সমাজ কর্তৃক প্রবর্তিত বর্ণাশ্রম ধর্মে মানুষের জীবনকাল চারটি আশ্রমে বিভক্ত, যথা- ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। ব্রহ্মচর্য জীবনে বেদের মন্ত্রভাগ বা সংহিতা পাঠ করতে হয়। গার্হস্থ্য জীবনে ব্রাহ্মণ পাঠ এবং ব্রাহ্মণোক্ত যাগযজ্ঞাদি অনুষ্ঠান করতে হয়। বানপ্রস্থকালে কর্ম হতে অবসর প্রাপ্তি এবং এই সময়ে আরণ্যকই হলো পঠনীয় শাস্ত্র। শেষ পর্যায়ে ভোগ-বিরতির সন্ন্যাস জীবন। সন্ন্যাস আশ্রমে উপনিষদ পাঠের নির্দেশ রয়েছে। উপনিষদে বৈদিক চিন্তাধারার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে বলে উপনিষদভিত্তিক এই তত্ত্বদর্শনই বেদান্তদর্শন নামে পরিচিত।

বেদান্ত-সম্প্রদায়ের প্রধানতম প্রচেষ্টাই হলো উপনিষদ-প্রতিপাদ্য তত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা ও সমর্থন। কিন্তু উপনিষদগুলিতে দার্শনিক তত্ত্বাবলী আলোচিত হলেও সে-আলোচনা বহুলাংশেই বিক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট; তাছাড়া এ-আলোচনা যুক্তিতর্কমূলক সুসংবদ্ধ দার্শনিক আলোচনা নয় এবং নানা উপনিষদে নানা রকম আলোচনার মধ্যে ঠিক কোন্ তত্ত্বকে প্রকৃত উপনিষদ-প্রতিপাদ্য তত্ত্ব বলা হবে সে-কথা নির্ণয় করাও সহজ নয়। স্বভাবতই, উপনিষদের অনুগামী পরবর্তী দার্শনিকেরা উপনিষদ-প্রতিপাদ্য মূল দার্শনিক তত্ত্বকে সনাক্ত করবার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এবং এই তত্ত্বের সুসংবদ্ধ দার্শনিক ব্যাখ্যা দিতে চাইলেন। এ-প্রচেষ্টার প্রথম পরিচয় বেদান্তসূত্র নামের গ্রন্থ। উপনিষদ-প্রতিপাদ্য মূল দার্শনিক তত্ত্ব বোঝাবার জন্য ব্রহ্ম শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে এবং এই কারণেই বেদান্তসূত্রের নামান্তর ব্রহ্মসূত্র। অর্থাৎ, বেদান্তের ব্রহ্ম বিষয়ক তত্ত্ব ও বিবিধ ধারণার উৎস উপনিষদ হলেও একই বিষয়ে বিভিন্ন উপনিষদগুলির নিজস্ব ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন ঋষির মধ্যে উপলব্ধ সত্য সম্পর্কে পারস্পরিক যে আপাত বিরোধ দেখা দেয়, তা নিরসনকল্পে উপনিষদগুলির মধ্যে নিহিত চিন্তাগুলিকে সমন্বয় করে সুশৃঙ্খলভাবে সংবদ্ধ করার প্রয়োজনে মহর্ষি বাদরায়ণ ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তসূত্র রচনা করেন। এই ব্রহ্মসূত্রই ব্রহ্মবাদ বা বেদান্তদর্শনের মূল সূত্রগ্রন্থ।

উপনিষদগুলি যেহেতু পূর্বাপর কোন একটি বিশেষ মতবাদের শিক্ষা দেয়নি, বরং আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন স্তরে অবস্থিত বিভিন্ন ব্যক্তির উপযোগী বিভিন্ন প্রকার মতবাদই উপনিষদগুলিতে স্থান পেয়েছে, তাই বিভিন্ন উপনিষদের মধ্যে একটি মূলগত ঐক্য আছে বলে বাদরায়ণ মনে করেন। এই মূলগত ঐক্যই হলো ব্রহ্মবাদ। এই ব্রহ্মবাদকে কেন্দ্র করেই মহর্ষি বাদরায়ণ কয়েকটি মূল সূত্র সংবদ্ধ করেন। এবং এই সূত্রগুলি ঘিরেই তার ব্যাখ্যা-বিস্তৃতি হিসেবে বাকি সব সূত্র-সমন্বয়ে গোটা ব্রহ্মসূত্র রচিত।

সমগ্র ব্রহ্মসূত্রের মধ্যে প্রথম অধ্যায়ের প্রথম চারটি সূত্র চতুঃসূত্র বা সূত্রচতুষ্টয় নামে পরিচিত। এই চারটি সূত্রকেই ব্রহ্মসূত্রের প্রধান ও সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সূত্র বলে মনে করা হয়। এমনও বলা হয় যে, চতুঃসূত্রীর সঠিক উপলব্ধি হলেই সমগ্র ব্রহ্মসূত্রের উপলব্ধি হবে। এই চারটি সূত্র হলো- 


(১) ‘অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা’।। (ব্রহ্মসূত্র-১/১/১)।।
ভাবার্থ : যজ্ঞাদি ক্রিয়ার ফল ক্ষণস্থায়ী জানার পর আধ্যাত্মিক সাধনার প্রয়োজনীয় গুণগুলি অর্জন করে সর্বপ্রকার সংশয় মুক্ত হয়ে ‘অতঃপর এখান থেকে ব্রহ্মজিজ্ঞাসা’ শুরু হলো।
(২) ‘জন্মাদ্যস্য যতঃ’।। (ব্রহ্মসূত্র-১/১/২)।।
ভাবার্থ : জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় যাঁর থেকে ঘটে, তিনিই ব্রহ্ম।
(৩) ‘শাস্ত্রযোনিত্বাৎ’।। (ব্রহ্মসূত্র-১/১/৩)।।
ভাবার্থ : ব্রহ্ম সম্পর্কিত যথার্থ জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায় উপনিষদ শাস্ত্র, কারণ শাস্ত্রই তার প্রমাণ এবং তা সর্বসম্মত।
(৪) ‘তত্ত্ব সমন্বয়াৎ’।। (ব্রহ্মসূত্র-১/১/৪)।।
ভাবার্থ : কারণ ব্রহ্ম হলেন সেই উপনিষদ শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়।


মহর্ষি বাদরায়ণ তাঁর ব্রহ্মসূত্রে সর্বসমন্বয় প্রমাণ করতে গিয়ে একদিকে যেমন উপনিষদগুলির অভ্যন্তরীণ বিরোধ পরিহার করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ভিন্ন ভিন্ন উপনিষদ-বক্তা যে ব্রহ্মজ্ঞান বিষয়ে বিশেষ উপদেশ দিয়েছেন, সেসবই এক ব্রহ্মের বিষয়ে। মোটকথা, ব্রহ্ম, জীব, জগৎ ইত্যাদি সম্বন্ধে নিজ সিদ্ধান্ত কী, এবং বিরোধী দার্শনিক সিদ্ধান্ত যে যুক্তিসঙ্গত নয় এই হলো বেদান্তসূত্রের প্রতিপাদ্য।

কিন্তু শুধুমাত্র এই সূত্রগ্রন্থটি পাঠ করে প্রকৃত অর্থ নির্ণয় করা একান্তই কঠিন। সূত্রগুলি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ বাক্যও নয়। অথচ বেদান্ত সম্প্রদায়ের সমস্ত পরবর্তী দার্শনিকের কাছেই মূল দার্শনিক গ্রন্থ বলতে এইটিই; অতএব তাঁরা সকলেই বেদান্তমত ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে ব্রহ্ম-সূত্রের ভাষ্য রচনা করেছেন। এবং সকলের ব্যাখ্যাও এক নয়। কেননা, ব্রহ্মসূত্রের অতিসংক্ষিপ্ত শ্লোকবিশিষ্ট সূত্রগুলি স্বাভাবিকভাবেই অতি দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে সূত্রগুলির ব্যাখ্যাকল্পে বিভিন্ন আচার্য কর্তৃক যেসব ভাষ্যগ্রন্থ রচিত হয়েছে তাতে বেদান্ত ভাষ্যকারদের নিজস্ব বিশ্বাস, ধারণা ও মতভেদ অনুযায়ী অধিকারীভেদে বিভিন্ন উপসম্প্রদায়েরও সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেক উপসম্প্রদায়ের দার্শনিকই দাবি করেছেন, তাঁদের প্রতিপাদ্য দার্শনিক তত্ত্বই প্রকৃত উপনিষদ-প্রতিপাদ্য তত্ত্ব; কিন্তু বিভিন্ন উপসম্প্রদায়ের দাবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে এবং অনেক সময় বিভিন্ন উপসম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা পরস্পরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি। এই উপসম্প্রদায়ের মধ্যে প্রধান বলতে দুটি- অদ্বৈত-বেদান্ত এবং বিশিষ্টাদ্বৈত-বেদান্ত।

অদ্বৈতমতে নির্গুণ ব্রহ্মই একমাত্র বা অদ্বিতীয় সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীব এবং ব্রহ্ম অভিন্ন। অজ্ঞানবশে আমরা পরিদৃশ্যমান জগৎ এবং নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তাকে সত্য বলে মনে করি, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানের উদ্ভব হলে বোঝা যাবে চিৎস্বরূপ আমি একমাত্র সত্য। তারই নাম ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম নির্গুণ, অর্থাৎ কোন গুণের সাহায্যে তাঁকে ব্যাখ্যা করা চলে না। ব্রহ্ম ছাড়া দ্বিতীয় কিছুর কল্পনা অজ্ঞানের পরিণাম। ওই অজ্ঞানের নামান্তর মায়া; তাই অদ্বৈতবাদকে মায়াবাদ বলে উল্লেখ করবার প্রথাও বিরল নয়।
অন্যদিকে, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ অনুসারেও যদিও ব্রহ্মই চূড়ান্ত সত্য, তবুও ব্রহ্মকে নির্গুণ আখ্যা দেওয়া ভুল। বরং ব্রহ্মকে অনন্ত-কল্যাণগুণের আধার মনে করতে হবে। তিনিই ঈশ্বর; উপাসনাদি সৎকর্মের সাহায্যে তাঁর করুণার উদ্রেক করতে পারলেই জীবের মুক্তি। পরিদৃশ্যমান জড়জগৎ এবং জীবাত্মার স্বাতন্ত্র্য মিথ্যা নয়। কেননা, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের মধ্যেই চিৎ এবং অচিৎ- চেতনা এবং জড়- উভয় বৈশিষ্ট্যই বর্তমান। চিৎ বৈশিষ্ট্য থেকেই জীবাত্মার সৃষ্টি, অচিৎ থেকে জড়জগতের । ব্রহ্ম চিৎ-অচিৎবিশিষ্ট। জীবাত্মার সঙ্গে জড়দেহের সম্পর্কই বন্ধনের স্বরূপ এবং তার মূলে আছে জন্মজন্মান্তরের কৃতকর্মজনিত অজ্ঞান। ঈশ্বরের করুণায় জীবাত্মা এই অজ্ঞান কাটিয়ে মুক্তিলাভ করবে।

অদ্বৈত-বেদান্তের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক শঙ্করাচার্য। কিন্তু তিনি এ-সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা নন। তাঁর গুরুর নাম গোবিন্দ এবং গোবিন্দের গুরুর নাম গৌড়পাদ। গৌড়পাদ পদ্যে মাণ্ডুক্য-উপনিষদের একটি ব্যাখ্যা রচনা করেছিলেন, তার নাম মাণ্ডুক্যকারিকা। এটির রচনাকাল ৭৮০ খ্রিস্টাব্দ বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু অদ্বৈত-সম্প্রদায়ের আচার্য পরম্পরা এর চেয়ে অনেক প্রাচীন হওয়াই সম্ভব বলে বিদ্বানেরা মনে করেন। তবুও অদ্বৈতবাদের সঙ্গে শঙ্করাচার্যের নামই বিশেষভাবে জড়িত, কেননা তিনিই অদ্বৈতবাদের সবচেয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর শঙ্করের রচনাবলীও সত্যিই সুবিশাল। তার মধ্যে অবশ্য ব্রহ্মসূত্র’র ভাষ্যই সবচেয়ে বিখ্যাত। এই ভাষ্যের নাম শারীরক-ভাষ্য। ‘শারীরক’ শব্দের অর্থ লক্ষণীয়- ‘শরীর শব্দের উপর কুৎসার্থে কণ্ প্রত্যয় করে শারীরক-শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে। শারীরক শব্দের অর্থ কুৎসিত শরীরবাসী জীবাত্মা।
আর বিশিষ্টাদ্বৈত-সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক আচার্য রামানুজ। তাঁর রচিত ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্যের নাম শ্রীভাষ্য। ধারণা করা হয় মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য অনুসারে ১০১৬-১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈত সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও আচার্য-পরম্পরার ইতিহাস অত্যন্ত সুপ্রাচীন বলেই অনুমিত হয়।

বেদান্তের আরো উপসম্প্রদায় রয়েছে। কিন্তু সেগুলি আপাতত আলোচ্য নয়। মোটকথা, পূর্ব-মীমাংসার মতোই বেদান্তকেও শ্রুতিমূলক বা বেদমূলক অর্থে আস্তিক বলা যায়। কেননা পূর্ব-মীমাংসার মতোই এই সম্প্রদায়টির উদ্ভবের সঙ্গেও প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিক যোগ আছে। বেদান্ত দর্শন মানেই উপনিষদের দর্শন- অন্তত বৈদান্তিকদের মতে একান্তভাবেই তাই। অবশ্যই উত্তরকালের বৈদান্তিক আচার্যরা বিপক্ষ-খণ্ডনের উদ্দেশ্যে এমন অনেক দার্শনিক প্রসঙ্গের আলোচনা করেছেন যার পরিচয় উপনিষদগুলির মধ্যে পাওয়া যায় না। দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রমাণ-প্রমেয় প্রভৃতি প্রসঙ্গে পরবর্তী বৈদান্তিকদের আলোচনা উল্লেখ করা যায়। কেননা ইতোমধ্যে অন্যান্য সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা এ-জাতীয় প্রসঙ্গের অবতারণা করে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছেন যার সঙ্গে উপনিষদ-প্রতিপাদ্য দার্শনিক তত্ত্বের সঙ্গতি হয় না। স্বভাবতই উপনিষদের সমর্থনে এ-জাতীয় প্রসঙ্গেরও প্রত্যুত্তর রচনা করা প্রয়োজন হয়েছে। তবে এখানেও মনে রাখা দরকার, উত্তরকালের বৈদান্তিকেরা যত নতুন ও জটিল দার্শনিক আলোচনার অবতারণাই করুন না কেন, তার সবটুকুই একটি মূল কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। অর্থাৎ, স্বাধীন যুক্তি বা বিচার-বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করে তাঁরা কেউই বিশ্বের কোনো নতুন ব্যাখ্যা খোঁজেননি; তার বদলে উপনিষদ-প্রতিপাদ্য পুরানো ব্যাখ্যাটিরই নতুন সমর্থন অন্বেষণ করেছেন।

(চলবে…)

[আগের পর্ব : ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন সম্প্রদায়]  [*] [পরের পর্ব: ভারতীয় দর্শনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]


Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,672 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুন 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« এপ্রিল   জুলাই »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: