h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|বেদান্তদর্শন-অদ্বৈতবেদান্ত-০৮ : অদ্বৈত জ্ঞানতত্ত্ব|

Posted on: 18/06/2015


IMG_1050_1 [1600x1200]

|বেদান্তদর্শন-অদ্বৈতবেদান্ত-০৮ : অদ্বৈত জ্ঞানতত্ত্ব|
রণদীপম বসু

৩.০ : অদ্বৈত জ্ঞানতত্ত্ব

যথার্থ জ্ঞান বুদ্ধির অধীন নয় বস্তুর অধীন, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞান বস্তুর অধীন। যে বস্তু যেমন, সেরূপ জ্ঞানই তত্ত্বজ্ঞান। অদ্বৈতমতে পরমাত্মা ব্রহ্মই হলো নিত্য, আর জগৎ অনিত্য। একমাত্র ব্রহ্মেরই পারমার্থিক সত্তা আছে এবং পরাবিদ্যার সাহায্যেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। ব্রহ্মজ্ঞানই সত্যজ্ঞান বা পরাবিদ্যা। এ জ্ঞান নিরপেক্ষ জ্ঞান যাকে অনুভব করা যায়। বিচারবুদ্ধি অনুভবের একটি উপায়।

অদ্বৈতবেদান্তের প্রধান প্রবক্তা আচার্য শঙ্কর তাঁর শারীরকভাষ্যে পারমার্থিক সত্তা ও ব্যবহারিক সত্তার মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। তাঁর মতে অবিদ্যার জন্যই জীব অনাত্মাকে আত্মার সঙ্গে অভিন্ন মনে করে। অবিদ্যা হলো ব্যবহারিক জ্ঞান। অবিদ্যায় জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতার পারস্পরিক ভেদ বর্তমান থাকে। শঙ্করের মতে ব্রহ্মেরই একমাত্র সত্তা আছে, ব্রহ্মের বাহিরে বা ভেতরে ব্রহ্ম ছাড়া আর কোন সত্তা নেই। ব্রহ্মের কোন প্রকার ভেদ নেই। পরাবিদ্যা সব রকমের ভেদরহিত জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ জ্ঞান। আর অপরাবিদ্যা আপেক্ষিক জ্ঞান হলেও শঙ্করের মতে এ জ্ঞান পরাবিদ্যা বা অনপেক্ষ জ্ঞান লাভের সোপান স্বরূপ।

এই মতে, শ্রুতি থেকে ব্রহ্মের জ্ঞান হয়, তারপর যুক্তি-তর্কের সাহায্যে তার যৌক্তিকতা উপলব্ধ হয় এবং সর্বশেষ অনুভবের মাধ্যমে ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার হয়। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার জন্য শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন হলো তিনটি উপায়। শ্রুতি ছাড়া অন্য কোন কিছু থেকে জীব ও ব্রহ্মের অভেদ জ্ঞান লাভ হয় না। শ্রুতির প্রামাণ্য নিরপেক্ষ। বেদান্তসূত্রে মহর্ষি বাদরায়ণও বলেছেন-


‘শাস্ত্রযোনিত্বাৎ’। (ব্রহ্মসূত্র-১/১/৩)
ভাবার্থ : শাস্ত্ররাশিই হলো ব্রহ্ম সম্পর্কিত জ্ঞান লাভের উপায়।


শ্রুতিলব্ধ জ্ঞানের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করার জন্য যুক্তি-তর্কের প্রয়োজন হয়। কিন্তু শ্রুতির কথায় বিশ্বাস না থাকলে কেবলমাত্র যুক্তি-তর্কের দ্বারা আত্মোপলব্ধি হয় না। যে তর্ক শ্রুতির অনুগামী, সেই তর্কই গ্রহণযোগ্য। যেহেতু মানুষের বুদ্ধি এক প্রকার নয় সেজন্য তর্ক বিভিন্নরূপের হয়। একজন তার্কিক তাঁর তর্কক্ষমতা দ্বারা কোন তত্ত্বকে সিদ্ধ করতে পারেন, আবার তাঁর চেয়েও যুক্তিকুশল ব্যক্তি অধিকতর দক্ষতায় সেটার ত্রুটি প্রমাণ করে নিজ মতকে সিদ্ধ করতে পারেন। অতএব যুক্তি-তর্কের দ্বারা আমরা কোন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না, কেবলমাত্র শ্রুতি বা উপনিষদ থেকেই আমরা সত্যকে প্রাপ্ত হতে পারি। যুক্তি তর্ককে আমরা শুধুমাত্র উপনিষদের অভিপ্রায়কে সঠিকভাবে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারি। শঙ্করের মতে তর্ক যেহেতু অপ্রতিষ্ঠা দোষে দূষিত সেজন্য তর্কের উপর নির্ভর করে শাস্ত্রের অর্থ নির্ণয় করা যুক্তিসঙ্গত নয়। বেদান্তসূত্রে বাদরায়ণও বলেছেন-


‘তর্ক অপ্রতিষ্ঠানাৎ অপি, অন্যথা অনুমেয়ম্ ইতি চেৎ, এবং অপি অবিমোক্ষপ্রসঙ্গঃ’। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/১১)
ভাবার্থ : তর্ক অপ্রতিষ্ঠ; অতএব শ্রুতিসিদ্ধ ব্রহ্মের কারণত্ববাদ কেবলমাত্র তর্কের দ্বারা খণ্ডন করা চলে না।


বেদান্ত-সিদ্ধান্তের সত্যতা তর্ক বা যুক্তিনির্ভর তো নয়ই বরং উপনিষদ প্রতিপাদিত। বেদ নিত্য, তাই বেদ থেকে প্রাপ্ত অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব কালই এক। শাস্ত্র মতে তর্কের দ্বারা সগুণ ব্রহ্মের জ্ঞান লব্ধ করা যাবে, কিন্তু পরব্রহ্মের বা নির্গুণ ব্রহ্মের জ্ঞান লাভ করা যায় না। তাই শঙ্করের মতে শ্রুতি বা শব্দই স্বত প্রমাণ। অন্যান্য প্রত্যক্ষ, অনুমানাদি প্রমাণসমূহ শব্দের (=বেদ) করুণা দ্বারাই প্রমাণিত হতে পারে। অতএব, প্রমাণ সম্পর্কে শঙ্করের ব্যাখ্যা জৈমিনি তথা ভাট্ট-মীমাংসকদের মতবাদেরই অনুরূপ।
প্রমাণ হলো যথার্থ জ্ঞানলাভের উপায়। শঙ্কর ছয় প্রকার প্রমাণ স্বীকার করেন, যেমন- প্রত্যক্ষ, অনুমান, শব্দ, উপমান, অর্থাপত্তি ও অনুপলব্ধি।

কোন সৎ বস্তুর সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ ঘটলে যে জ্ঞান হয় তাই প্রত্যক্ষ জ্ঞান। কোন জ্ঞান বিষয়ের উপরের নির্ভর করে এবং তার দ্বারা সমর্থিত হয়ে যদি কোন অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয় তাকে অনুমান বলে। বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তির বচন হলো শব্দ এবং এই বচনের উপর নির্ভর করে যে জ্ঞান লাভ হয় তাকে শব্দজ্ঞান বলে। সংজ্ঞা ও সংজ্ঞীর যে জ্ঞান তাই উপমান। নৈয়ায়িক ও মীমাংসকরা উপমানকে স্বতন্ত্র প্রমাণ বলে মনে করেন। কোন বিষয়কে যখন জ্ঞাত কোন কারণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না তখন অন্য কোন অজ্ঞাত কারণকে কল্পনা করা হয়, এই অজ্ঞাত কারণকে কল্পনা করার নাম অর্থাপত্তি। কোন বস্তুর অভাবের জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করার জন্য অনুপলব্ধি নামক একটি স্বতন্ত্র প্রমাণকে শঙ্করাচার্য স্বীকার করেন। তবে অদ্বৈতমতে সকল প্রমাণের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হলো শব্দ প্রমাণ, এবং শব্দই স্বত প্রমাণ।

সত্যতা :
যে জ্ঞান অন্য জ্ঞানের দ্বারা বাধিত বা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না তাই সত্য। তখন অদ্বয় অর্থাৎ অদ্বিতীয় আত্মজ্ঞান লাভ হয়। শঙ্করের মতে সত্যতা নির্ণয় করার মূল উপায় হলো আধিতত্ত্ব বা অবিরুদ্ধতা। অদ্বয়জ্ঞান যথার্থ, কারণ এ জ্ঞান অন্য জ্ঞানের দ্বারা বাধিত হয় না। ভাববাদী দার্শনিকদের মতে সঙ্গতি হলো সত্যতা নিরূপণ করার মাপকাঠি। শঙ্করও এই অভিমত সমর্থন করেন। তাঁর মতে সঙ্গতি ছাড়াও অনুরূপতা এবং প্রবৃত্তি সামর্থও সত্যতা নিরূপণের উপায়। অনুরূপতা অর্থাৎ যখন কোন ধারণা বস্তুর অনুরূপ হয় তখন ধারণা সত্য হয়, এটাও ব্যবহারিক সত্যতা নিরূপণ করার মাপকাঠি। প্রবৃত্তি সামর্থ্য অর্থাৎ যখন ধারণা সফল প্রবৃত্তির কারণ হয় তখন ধারণা সত্য হয়।

ভ্রম :
অদ্বৈতবেদান্ত মতে ভ্রমের কারণ হলো অবিদ্যা। ব্রহ্মে জগৎ ভ্রমেরও কারণ হলো অবিদ্যা। ভ্রম সম্পর্কে অদ্বৈতবাদীদের মতবাদ অনির্বচনীয় খ্যাতিবাদ নামে পরিচিত। অন্যান্য দর্শন সম্প্রদায় ভ্রমের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা শঙ্কর স্বীকার করেন না।

মীমাংসকরা প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে ভ্রমের সম্ভাবনাকে মোটেই স্বীকার করেন নি। তাঁরা সব জ্ঞান, বিশেষ করে অপরোক্ষ জ্ঞানকে সত্য বলে মনে করেন। তাঁদের এই মত যথার্থ বলে স্বীকার করলে অদ্বৈতমতে দেয়া জগৎ ব্যাখ্যার কোন যুক্তি থাকে না। মীমাংসামতে রজ্জুতে যে সর্পভ্রম হয় সেখানে প্রত্যক্ষ এবং স্মৃতির মিশ্রণ ঘটে এবং দুটির মধ্যে পার্থক্য করা হয় না। রজ্জুতে যখন সর্পভ্রম হয় তখন আমরা রজ্জু প্রত্যক্ষ করি, যে রজ্জুর অস্তিত্ব আছে। তার সাথে সর্পের স্মৃতি মনে জাগরিত হয়। কারণ সর্পের সঙ্গে রজ্জুর সাদৃশ্য আছে। রজ্জুর প্রত্যক্ষ এবং সর্পের স্মৃতি দুটোর যে পার্থক্য বা বিবেকের অখ্যাতি তা ভ্রম সৃষ্টি করে।

আবার নৈয়ায়িকদের ন্যায়মতে ভ্রম হলো ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণ। তাদের মতে ভ্রমের ক্ষেত্রে একটি বস্তুকে আর একটি বস্তুরূপে প্রত্যক্ষ করা হয়। যখন রজ্জুতে সর্পভ্রম ঘটে তখন রজ্জু অন্য বস্তুরূপে দৃষ্ট হয়। অদ্বৈতবেদান্তীরা এই মত গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে বৌদ্ধমতে ভ্রমের ব্যাখ্যা অদ্বৈতবাদীরা স্বীকার করেন না। বৌদ্ধমতে ভ্রমের ব্যাখ্যা আত্মখ্যাতিবাদ নামে পরিচিত। তাঁদের মতে ভ্রমে মনের ধারণা বাহ্যবস্তু হিসেবে দৃষ্ট হয়। রজ্জুতে সর্পভ্রম একটি নিছক মনের ধারণা। সে জন্য সর্পকে অস্তিত্বশীল বাহ্যবস্তু হিসেবে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বেদান্তীরা মনে করেন, ভ্রমের ক্ষেত্রে যদি কোন বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করা না যায় তাহলে রজ্জুতে সর্পভ্রম না হয়ে যে কোন ভ্রম ঘটতে পারতো। অদ্বৈতমতে ব্রহ্মই জগৎভ্রম হয়।

অদ্বৈতবাদীদের ভ্রম সম্পর্কিত মতবাদ অনির্বচনীয় খ্যাতিবাদ অনুসারে, ভ্রমজ্ঞানকে সৎও বলা যায় না, অসৎও বলা যায় না। রজ্জুতে যখন সর্পভ্রম হয় তখন সর্পকে অসৎ বলা যায় না, কারণ সর্প অসৎ হলে সর্পকে প্রত্যক্ষ করা যায় না। সর্পকে সৎও বলা যায় না, কারণ পরে রজ্জুজ্ঞান দ্বারা সর্পজ্ঞান বাধিত হয়। আবার সর্পকে সদসৎও বলা যায় না, কারণ সৎ এবং অসৎ পরস্পরবিরোধী, তাই সৎ ও অসৎ কারো ক্ষেত্রে একই সময়ে একই অর্থে সত্য হতে পারে না। কাজেই অদ্বৈতমতে সর্প অনির্বচনীয়। এই অনির্বচনীয় সর্প প্রাতিভাসিক। যতক্ষণ পর্যন্ত রজ্জুর জ্ঞান না হয় ততক্ষণ পর্যন্তই সর্প ভ্রান্তদর্শীর দৃষ্টিতে প্রতিভাত হয়। ভ্রম দূর হলে সর্পের কোন অস্তিত্ব থাকে না।

অদ্বৈতমতে জগতের যাবতীয় বস্তুই চৈতন্যে অধিষ্ঠিত। রজ্জু যে চৈতন্যে অধিষ্ঠিত সেই চৈতন্যে আশ্রিত অবিদ্যার তমোভাগ থেকে অনির্বচনীয় সর্পের উৎপত্তি। কাজেই অদ্বৈতবেদান্ত মতে সর্প অনির্বচনীয়। অবিদ্যার জন্যই রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়। একইভাবে ব্রহ্মে জগৎভ্রম এই অবিদ্যার জন্যই হয়ে থাকে। অবিদ্যা অপসারিত হলেই একই অদ্বয় ব্রহ্মের উপলব্ধি ঘটে।

[আগের পর্ব : জীবের বন্ধন ও মুক্তি] [*] [পরের অধ্যায় : রামানুজাচার্যের বিশিষ্টাদ্বৈত-বেদান্ত]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 441,806 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুন 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« এপ্রিল   জুলাই »
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: