h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| বেদান্তদর্শন-ব্রহ্মবেদান্ত-০৪ : শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা |

Posted on: 05/02/2014


1044157_624033784318095_381795834_n.

| বেদান্তদর্শন-ব্রহ্মবেদান্ত-০৪ : শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা |
রণদীপম বসু

১.৩ : শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা :
.
বলা হয়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী। এটি মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে সংক্ষেপে ভগবদ্গীতা বা শ্রীগীতা বা আরো সংক্ষেপে গীতা বলা হয়। ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের সমরাঙ্গনে কৌরবসৈন্য ও পাণ্ডবসৈন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধার্থে সজ্জিত হলে, যুদ্ধে প্রতিপক্ষে অবস্থানকারী আত্মীয়বর্গকে হত্যা করতে হবে ভেবে অন্যতম পাণ্ডব সেনাধ্যক্ষ ধনুর্ধর অর্জুন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আত্মীয়হত্যা অসঙ্গত বিবেচনা করে ক্ষণিক বৈরাগ্যের মোহাক্রান্ত অর্জুন যুদ্ধে নিবৃত্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর রথের সারথিরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে বিশদ তত্ত্বসমৃদ্ধ উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে অর্জুনের মোহ দূর করে স্বকর্মে প্রবৃত্ত করেছিলেন, মুখ্যত তা-ই ভগবদ্গীতা।

গীতার গুরুত্ব বোঝাতে গীতামাহাত্ম্যে বলা হয়েছে-

‘সর্ব্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ।
পার্থো বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ’।।
অর্থাৎ : সমস্ত উপনিষদ গাভী, শ্রীকৃষ্ণ দোহনকর্তা, অর্জুন বৎস ও সুধীগণ ভোক্তা, গীতামৃত উপাদেয় দুগ্ধ।

এদ্বারা এটাই প্রতিপন্ন করা হচ্ছে যে, ভগবদ্গীতা উপনিষদের সারগ্রন্থ মাত্র। এছাড়াও ভাগবতের বরাহপুরাণোক্ত দীর্ঘ গীতামাহাত্ম্যের একটি শ্লোকে ভগবান বিষ্ণুর উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে-

‘গীতাশ্রয়েহহং তিষ্ঠামি গীতা মে চোত্তমং গৃহম্’।
গীতাজ্ঞানমুপাশ্রিত্য ত্রীন্ লোকান্ পালয়াম্যহম্’।।
অর্থাৎ : আমি গীতার আশ্রয়ে অবস্থান করি এবং গীতা আমার উত্তম গৃহ। গীতাজ্ঞান আশ্রয় করে আমি ত্রিলোক পালন করি।

গীতার এ গুরুত্ব বিবেচনা করেই বেদান্তশাস্ত্রে গীতাকে প্রাচীন বারোটি উপনিষদের সমশ্রেণীর কাতারে ত্রয়োদশ উপনিষদ বলেও গণ্য করা হয়। বেদের মতো গীতা সব সম্প্রদায়েরই মান্য। এজন্যেই পরবর্তীকালের শঙ্করাচার্য, রামানুজ, শ্রীধরস্বামী, মাধবাচার্য, বলদেব প্রমুখ শ্রেষ্ঠ আচার্যরা সকলেই গীতার জ্ঞানকে শিরোধার্য করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ উপসম্প্রদায়ের মতের পরিপোষণের জন্য ভগবদ্গীতার টীকাভাষ্যও রচনা করেছেন। এর মধ্যে শাঙ্করভাষ্য এবং শ্রীধরস্বামীর টীকাই সমধিক প্রসিদ্ধ। তবে শঙ্করাচার্যের শাঙ্করভাষ্যকে পরিপূর্ণ উপনিষদানুসারী বলে বিবেচনা করা হয়।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আঠারটি যোগ বা অধ্যায়ে মোট ৭০০ শ্লোক রয়েছে। গীতার অধ্যায়সমূহ যথাক্রমে- (১) অর্জুন বিষাদযোগ, (২) সাংখ্যযোগ, (৩) কর্মযোগ, (৪) জ্ঞানযোগ, (৫) সন্ন্যাসযোগ, (৬) ধ্যানযোগ বা অভ্যাসযোগ, (৭) জ্ঞান-বিজ্ঞানযোগ, (৮) অক্ষর-ব্রহ্মযোগ, (৯) রাজবিদ্যা-রাজগুহ্যযোগ, (১০) বিভূতিযোগ, (১১) বিশ্বরূপ-দর্শনযোগ, (১২) ভক্তিযোগ, (১৩) ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ, (১৪) গুণত্রয়-বিভাগযোগ, (১৫) পুরুষোত্তমযোগ, (১৬) দৈবাসুরসম্পদ-বিভাগযোগ, (১৭) শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগযোগ, (১৮) মোক্ষযোগ।


এই আঠারটি অধ্যায়ের মোট ৭০০ শ্লোকের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্রের উদ্ধৃতিতে ১টি, সঞ্জয়ের উদ্ধৃতিতে ৪০টি, অর্জুনের উদ্ধৃতিতে ৮৫টি এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্ধৃতিতে ৫৭৪টি শ্লোক রয়েছে। এসব শ্লোকের মাধ্যমে মূলত অর্জুনের জিজ্ঞাসু মনের সশ্রদ্ধ প্রশ্ন ও তার প্রেক্ষিতে যথাযোগ্য উত্তর দিতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তি, প্রেম, আত্মা, জ্ঞান, সকাম-কর্ম, নিষ্কাম-কর্ম, সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্ম প্রভৃতি সম্পর্কিত যাবতীয় দর্শন ও তত্ত্বজ্ঞান উপস্থাপন ও তার বিশ্লেষণ করে অর্জুনের সকল কৌতুহল ও জ্ঞানতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেন। এজন্যেই গীতাকে পরম ভক্তি সহকারে সকল শাস্ত্রের সার বলা হয়।


জীবের চূড়ান্ত লক্ষ্য মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে গীতা কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়ে সম্পূর্ণ সাধনতত্ত্ব প্রচার করে।  কর্মের সাথে জ্ঞানের এবং জ্ঞানের সাথে ভক্তির সংযোগে সাধনা সম্পূর্ণতা লাভ করে। তবে কর্মযোগই গীতার মুখ্য আলোচ্য বিষয়। কিন্তু এই কর্ম হবে নিষ্কাম কর্ম, অর্থাৎ ফলের আশা না করে কর্ম করে যাওয়া। যেমন-

‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত¡কর্মণি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৪৭)।
অর্থাৎ : কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়। অতএব কর্ম করো। সুতরাং কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু হয়ো না। আবার কর্মত্যাগেও তোমার প্রবৃত্তি না হোক (গীতা-২/৪৭)।

কিন্তু কেন এই কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু না হয়ে অর্থাৎ কাম্য-কর্ম বাদ দিয়ে কেবল নিষ্কাম কর্ম করে যাওয়া ? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন-

‘দূরেণ হ্যবরং কর্ম বুদ্ধিযোগাদ্ ধনঞ্জয়।
বুদ্ধৌ শরণমন্বিচ্ছ কৃপণাঃ ফলহেতবঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৪৯)।
‘কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত্বা মনীষিণঃ।
জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫১)।
অর্থাৎ :
হে ধনঞ্জয়, কাম্য-কর্ম নিষ্কাম-কর্ম অপেক্ষা নিতান্ত নিকৃষ্ট। অতএব তুমি কামনাশূন্য হয়ে সমত্ব বুদ্ধির (সম্যক জ্ঞানের) আশ্রয় গ্রহণ করো। যারা ফলাকাঙ্ক্ষী হয়ে কর্ম করে তারা অতি হীন (গীতা-২/৪৯)।  নিষ্কাম কর্মযোগী মনীষিগণ কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মরূপ বন্ধন হতে মুক্ত হন এবং সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত (পাপ ও পুণ্য উভয় হতে মুক্ত হয়ে) ব্রহ্মপদ লাভ করেন (গীতা-২/৫১)।

গীতার মতে ফলাসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান বন্ধনের কারণ। আসক্তি ও অহংবুদ্ধি ত্যাগ করে ফলাফলে উদাসীন হয়ে কর্ম সম্পাদনে বন্ধন হয় না। অর্থাৎ সর্বকর্ম ঈশ্বরে সমর্পণ করে ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জন ও অহংবুদ্ধি বা কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করাই নিষ্কার্ম কর্মের লক্ষণ। কিন্তু আত্মজ্ঞান ব্যতীত এই আসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান দূর হয় না। তাই শ্রীকৃষ্ণ বলেন-

‘যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫২)।
‘শ্রুতিবিপ্রতিপন্না তে যদা স্থাস্যতি নিশ্চলা।
সমাধাবচলা বুদ্ধিস্তদা যোগমবাপ্স্যসি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৩)।
অর্থাৎ :
যখন তোমার বুদ্ধি (জ্ঞান) মোহাত্মক অবিবেকরূপ কলুষ অতিক্রম করবে, তখন তুমি শ্রোতব্য ও শ্রুত কর্মফল বিষয়ে বৈরাগ্যলাভ করবে (নিষ্পৃহ হবে) (গীতা-২/৫২)।  নানা কর্মফল শ্রবণে বিক্ষিপ্ত তোমার চিত্ত যখন পরমাত্মাতে স্থির ও অচল হবে, তখন তুমি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করবে (গীতা-২/৫৩)।

অতএব কর্মযোগ সিদ্ধিলাভের জন্য জ্ঞানলাভের দরকার। আত্মজ্ঞান লাভ হলে ভগবানে পরমভক্তি জন্মায়। এর মাধ্যমেই সমত্ব-বুদ্ধি বা সম্যক-জ্ঞান জন্মায়। এই সমত্ব বুদ্ধিকেই বলা হয় স্থিতপ্রজ্ঞা। গীতায় এই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে শ্রীভগবান বলেন-

‘প্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনোগতান্ ।
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৫)।
দুঃখেষ¦নুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৬)।
অর্থাৎ :
হে পার্থ, বাহ্যলাভে নিরপেক্ষ ও পরমার্থদর্শনে প্রত্যগাত্মাতেই পরিতৃপ্ত হয়ে যখন যোগী সমস্ত মনোগত বাসনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলে উক্ত হন (গীতা-২/৫৫)।  দুঃখে উদ্বেগহীন, সুখে নিঃস্পৃহ এবং আসক্তিশূন্য ভয়মুক্ত ও ক্রোধরহিত মুনিই স্থিতপ্রজ্ঞ বলে উক্ত হন (গীতা-২/৫৬)।

এখানে প্রশ্ন আসে, কর্মযোগ অপেক্ষা সমত্ব-বুদ্ধি বা সম্যক-জ্ঞানই যদি শ্রেষ্ঠ হয় তাহলে সব কামনা বর্জন করে সাম্যবুদ্ধি বা সম্যকজ্ঞান লাভ করলেই তো জীবের মোক্ষ লাভ হয়, কর্মের আবশ্যকতা কী ? তাই অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন-

‘জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।
তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/১)।
অর্থাৎ : হে জনার্দন, যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে এই হিংসাত্মক (যুদ্ধ) কর্মে নিযুক্ত করছেন কেন (গীতা-৩/১)?

বলাবাহুল্য, গীতায় কর্মকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এমনকি ইহলোকে মোক্ষলাভের যে দুটি মার্গ রয়েছে- সন্ন্যাস মার্গ ও কর্মযোগ মার্গ, সেখানেও কর্মযোগকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিপাদন করা হয়েছে। কেননা, সন্ন্যাস মার্গে যে মোক্ষ লাভ হয় তা জ্ঞানের ফলে, কর্ম ত্যাগের জন্য নয়। যেমন গীতার সন্ন্যাসযোগে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-

‘সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ।
তয়োস্তু কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/২)।
‘সন্ন্যাসস্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/৬)।
অর্থাৎ :
সন্ন্যাস বা কর্মের ত্যাগ ও কর্মের অনুষ্ঠান উভয়ই মুক্তিমার্গ; কিন্তু তাদের মধ্যে জ্ঞানহীন কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান উৎকৃষ্টতর (গীতা-৫/২)।  হে মহাবাহো, নিষ্কাম কর্মযোগ ব্যতীত জ্ঞানযুক্ত পরমার্থ সন্ন্যাস লাভ করা অসম্ভব। নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হলেই নিষ্ঠ ব্যক্তি সন্ন্যাসী হয়ে অচিরে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হন (গীতা-৫/৬)।

এছাড়াও জ্ঞান ও কর্মের পরস্পর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বোঝাতে গীতায় জ্ঞানযোগে বলা হয়েছে যে-

‘ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৩৮)।
অর্থাৎ : জ্ঞানের তুল্য পবিত্র বস্তু ইহজগতে নেই। দীর্ঘকাল প্রযত্ন দ্বারা কর্মযোগে চিত্ত শুদ্ধ হলেই মুমুক্ষু ব্যক্তি সেই আত্মজ্ঞান (ব্রহ্মজ্ঞান) লাভ করেন (গীতা-৪/৩৮)।

তাই কর্ম নাকি জ্ঞান শ্রেষ্ঠ, অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন-

‘লোকেহস্মিন্ দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৩)।
‘ন কর্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্যং পুরুষোহশ্লুতে।
ন চ সংন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৪)।
‘ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।
কার্যতে হ্যবশঃ কর্ম সর্বঃ প্রকৃতিজৈর্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৫)।
অর্থাৎ :
হে অনঘ অর্জুন, ইহলোকে জ্ঞানাধিকারিগণের জন্য জ্ঞানযোগ এবং নিষ্কাম কর্মিগণের জন্য কর্মযোগ- এই দুই প্রকার নিষ্ঠার বিষয় সৃষ্টির প্রারম্ভে আমি বেদমুখে বলেছি (গীতা-৩/৩)।  কর্মানুষ্ঠান না করে কেউ নৈষ্কর্ম্য বা মোক্ষ লাভ করতে পারে না। আবার কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধি ও আত্মবিবেক না হলে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি হয় না। কেবলমাত্র জ্ঞানশূন্য কর্মত্যাগ দ্বারা এ অবস্থালাভ অসম্ভব (গীতা-৩/৪)।  কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না। অ-স্বতন্ত্র প্রকৃতির (মায়াজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের) প্রভাবে সকলেই কর্ম করতে বাধ্য হয় (গীতা-৩/৫)।

এ প্রেক্ষিতে শ্রীকৃষ্ণ আরো বলেন-

‘কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৬)।
‘যস্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেহর্জুন।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৭)।
‘নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্মণঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৮)।
অর্থাৎ :
যে ব্যক্তি কর্মেন্দ্রিয়গুলিকে কর্মবিরত করে মনে মনে তাদের বিষয় চিন্তা করে তারা মিথ্যাচারী (গীতা-৩/৬)।  কিন্তু যারা ইন্দ্রিয়গুলি সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্ম করেন তারাই শ্রেষ্ঠ (গীতা-৩/৭)।  তুমি শাস্ত্রবিহিত নিত্যকর্ম করো। কর্ম না করা অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়। কর্মহীন হলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হবে না (গীতা-৩/৮)।

তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আসক্তিহীন হয়ে কর্তব্যরূপে সবসময় বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান করার উপদেশ দেন। যে কর্ম যার পক্ষে বিহিত তাই তার পক্ষে যজ্ঞস্বরূপ। অনাসক্ত হয়ে কর্ম করলে মানুষ মোক্ষ লাভ করে। কারণ এই যথার্থ কর্ম ঈশ্বরের প্রীতির জন্যেই করা হয়-

‘যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্মবন্ধনঃ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৯)।
অর্থাৎ : যজ্ঞার্থে বা ঈশ্বরের প্রীতির জন্য অনুষ্ঠিত কর্ম ব্যতীত অন্য কর্ম বন্ধনের কারণ হয়। অতএব, তুমি ভগবানের উদ্দেশ্যে অনাসক্ত হয়ে বর্ণাশ্রমোচিত সকল কর্ম করো (গীতা-৩/৯)।

এবং বিহিত কর্মযোগের সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে গীতার সেই প্রসিদ্ধ শ্লোকটি উচ্চারিত হয় এভাবে-

‘শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৩/৩৫)।
অর্থাৎ : স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। (বর্ণাশ্রমবিহিত) স্বধর্মসাধনে নিধনও কল্যাণকর; কিন্তু অন্যের (বর্ণাশ্রমোচিত) ধর্মের অনুষ্ঠান অধোগতির কারণ বলে বিপজ্জনক (গীতা-৩/৩৫)।

বর্ণাশ্রমে বিভক্ত সমাজে জন্মজাত চারটি বর্ণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের জন্য ঈশ্বরবিহিত যে যে কর্ম নির্ধারণ করা আছে প্রত্যেকের জন্য তা-ই স্বধর্ম অনুষ্ঠান। কারণ এই বর্ণগুলি ঈশ্বরসৃষ্ট এবং তাদের কর্মবণ্টনও ঈশ্বরই করে রেখেছেন প্রকৃতিজাত বা স্বভাবজাত করে-

‘চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/১৩)।
‘ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈর্মুক্তং যদেভিঃ স্যাৎত্রিভির্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪০)।
‘ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাঞ্চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪১)।
‘শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪২)।
‘শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্ ।
দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৩)।
‘কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্ ।
পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৪)।
‘স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ’। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৪৫)।
অর্থাৎ :
গুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি চারটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) সৃষ্টি করেছি। আমি মায়িক (মায়ারূপ) ব্যবহারে চতুর্বর্ণের সৃষ্টিকর্তা হলেও আমাকে পরমার্থদৃষ্টিতে অব্যয় অকর্তা ও অসংসারী বলে জানবে (গীতা-৪/১৩)।  পৃথিবীতে বা স্বর্গে এমন কোন প্রাণী (মানুষ বা দেবতা) বা বস্তু নেই, যা এই প্রকৃতিজাত ও বন্ধনের কারণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই) ত্রিগুণ থেকে মুক্ত (গীতা-১৮/৪০)।  হে পরন্তপ, প্রকৃতিজাত ত্রিগুণানুসারেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রেরও কর্মসমূহ পৃথক পৃথক রূপে ভাগ করা হয়েছে (গীতা-১৮/৪১)।  বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, বাচিক ও মানসিক তপস্যা; অন্তর্বহিঃ শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতি এবং শাস্ত্রে ও ভগবানে বিশ্বাস- এই সকল ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত (রজোমিশ্রিত সত্ত্বগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪২)।  পরাক্রম, তেজ, ধৃতি, কর্মকুশলতা, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা ও শাসনক্ষমতা- এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত (স্বভাবজ সত্ত্বমিশ্রিত রজোগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪৩)।  কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য বৈশ্যের স্বভাবজাত (স্বভাবজ তমোমিশ্রিত রজোগুণ দ্বারা বিহিত) কর্ম। (অন্য বর্ণের) সেবা বা পরিচর্যা শূদ্রদের স্বভাবজাত (রজোমিশ্রিত তমোগুণের দ্বারা বিহিত) কর্ম (গীতা-১৮/৪৪)।  মানুষ নিজ নিজ বর্ণ ও আশ্রমের কর্মে নিরত থেকে জ্ঞান, নিষ্ঠা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সিদ্ধিলাভ করে (গীতা-১৮/৪৫)।

সহজভাবে বললে, বিহিত কর্ম মানে আরোপিত কর্ম যা ঈশ্বরকর্তৃক নির্দেশিত। কর্মফলের আশা ত্যাগ করে আসক্তিহীন কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞানরূপ সন্ন্যাসমার্গে উত্তীর্ণ হওয়াই গীতার মতে জীবের মোক্ষ বা সংসার-মুক্তির অনিবার্য শর্ত। কিন্তু ভক্তি বিনে জ্ঞান হয় না। এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পরমেশ্বর পরমব্রহ্মের প্রতি অবিচল ভক্তি থাকা আবশ্যক। তাই গীতায় শ্রীভগবান বলছেন-

‘মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৬৫)।
অর্থাৎ : তুমি আমাতে চিত্ত স্থির করো, ভজনশীল ও পূজনশীল হও। আমাকে নমস্কার করো। আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি, এভাবেই তুমি আমাকে পাবে (গীতা-১৮/৬৫)।

কিন্তু যা-ই করো না কেন, কোনভাবেই কর্মযোগ উপেক্ষা করে নয়। সকল শাস্ত্রের সারগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সার-কথাটাও সম্ভবত এই যে-

‘শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্ জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে।
ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্’।। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১২/১২)।
অর্থাৎ : অবিবেচকপূর্বক অভ্যাস অপেক্ষা শ্রুতি (বেদোক্ত শাস্ত্রাদি) ও যুক্তি দ্বারা আত্মনিশ্চয় উৎকৃষ্ট। আত্মনিশ্চয় অপেক্ষা জ্ঞানপূর্বক ধ্যান শ্রেষ্ঠ। জ্ঞানপূর্বক ধ্যান অপেক্ষা কর্মফলত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কর্মফল ত্যাগের অব্যবহিত পরেই সহেতুক সংসার নিবৃত্তিরূপ পরম শান্তিলাভ হয় (গীতা-১২/১২)।

মূলত, কর্মযোগকে ঘিরেই গীতার মুখ্য আলোচ্য বিষয় গীতার মূলতত্ত্ব, মূলনীতি, আত্ম-তত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব, ব্রহ্মতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে যত প্রকার জ্ঞান উপদিষ্ট হয়েছে, অর্জুনকে তা উপলব্ধি করতে হয়েছে। এবং তার উপলক্ষ হয়ে এটি একটি অন্যতম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবেও ভারতীয় লোকসমাজে সর্বাদৃত হয়েছে।

(চলবে…)

[আগের পর্ব : ব্রহ্মসূত্র] [*] [পরের পর্ব : বেদান্তের অনুবন্ধ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 204,511 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 85 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

ফেব্রুয়ারি 2014
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ডিসে.   মার্চ »
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
232425262728  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: