h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| চাণক্যজন কহেন…০১ | ভূমিকাপর্ব |

Posted on: 12/03/2012


.
| চাণক্যজন কহেন…০১ | ভূমিকাপর্ব |
-রণদীপম বসু
প্রাচীন নীতিশাস্ত্র
.
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ‘নীতিশাস্ত্রম’ নামে একটি বিভাগ স্বীকার করা হয়। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- নীতিশাস্ত্র। নামের মধ্যেই যেহেতু শাস্ত্র কথাটি যুক্ত রয়েছে, তার উপর আবার সংস্কৃত ভাষা, তাই ধারণা হয় নিশ্চয়ই এতে মারাত্মক সব জটিল তত্ত্বের সমাহারে ভয়ঙ্কর সব শাস্ত্রীয় কপচানিই থাকবে। এবং যার ফলে, এ বিষয়ে বিরাট পাণ্ডিত্য ধারণ করা না-গেলে এই শাস্ত্র উপভোগের শুরুতেই সহজ-সরল সাধারণ পাঠক-মনে প্রথম যে ইচ্ছেটাই গজিয়ে ওঠা স্বাভাবিক, তা হলো- থাক্ বাবা! এ রাস্তায় এগোনোর চাইতে পাথর চিবানোও বুঝি সহজ কর্ম ! ভাগ্যিস এগুলো আসলে সে জাতীয় ভয়ঙ্কর কিছু নয়। এবং এগুলো যে মোটেও রসকষহীন কিছু নয়, বরং অধিকাংশই মনোগ্রাহী কাব্যধর্মী রচনা, এর উদ্দেশ্য থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ, এর উদ্দেশ্য হলো আকর্ষণীয় উপায়ে কিছু সদুপদেশ বিতরণ বা কাঙ্ক্ষিত কিছু নীতির প্রচার।
.
স্বভাবতই প্রশ্ন আসে- কিসের নীতি ? তা নির্ভর করে এই নীতিগুলোর রচয়িতা বা প্রচারকের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সামাজিক অবস্থান এবং তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সামাজিক প্রয়োজনের উপর। সংস্কৃত সাহিত্যে এরকম বহু নীতিকাব্যের নাম জানা যায়। এক্ষেত্রে প্রথমেই যার নাম আসে তা হলো চাণক্যের নীতিশাস্ত্র। এরপরেই আসে ভর্তৃহরির শতকত্রয় (শৃঙ্গারশতক, নীতিশতক এবং বৈরাগ্যশতক)। সুধীসমাজের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে এ ধরনের অন্যান্য নীতিমূলক কাব্যগুলো হচ্ছে- ভল্লটের শতক, সদানন্দের নীতিমালা, শম্ভুরাজের নীতিমঞ্জরী, বেঙ্কটরায়ের নীতিশতক, ঘটকর্পরের নীতিসার, স্বামী দয়ানন্দের নীতিচন্দ্রিকা, সুন্দরাচার্যের নীতিশতক, সোমদেবসূরির নীতিবাক্যামৃত, ব্রজরাজ শুক্লের নীতিবিলাস, বররুচির নামে প্রচলিত আর্যামঞ্জরী, অমরুর অমরুশতক, বাণভট্টের চণ্ডীশতক, ময়ূরের সূর্যশতক, শিহ্লনের শান্তিশতক, আনন্দবর্ধনের দেবীশতক, নীলকণ্ঠ দীক্ষিতের সভারঞ্জকশতক ও অন্যোক্তিশতক, বল্লালসেনের বল্লালশতক, রামচন্দ্র কবিভারতীর ভক্তিশতক, বজ্রদত্তের লোকেশ্বরশতক ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ বর্তমানে খুবই দুষ্প্রাপ্য বলে উদাহরণ হিসেবে শুধু নামগুলোই সংযুক্ত করা হলো।
.
তবে বর্তমান পাঠে আমাদের পর্যায়ক্রমিক আলোচনার সুবিধার্থে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বেকার রচিত চাণক্যের নীতিশাস্ত্রকেই মূল অবলম্বন হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। বঙ্গানুবাদসহ সংস্কৃত মূল শ্লোকগুলোকে ব্যবহার করে এর উপর যথাসাধ্য আলোকপাতের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক বিষয়ানুক্রমে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের অন্যতম প্রধান সংস্কৃত কবি ভর্তৃহরির নীতিশতকের সবগুলো না হলেও যথাসম্ভব প্রয়োজনীয় শ্লোকও উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্যে অন্যান্য সূত্রগ্রন্থের পাশাপাশি যে-দুটো ছোট্ট বইয়ের ব্যাপক সহযোগিতা নেয়ার কারণে সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, সেই বই দুটো হলো- সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার কলকাতা থেকে প্রকাশিত শ্রী সত্যনারায়ণ চক্রবর্তীর ‘চাণক্য-নীতি-শাস্ত্র-সমীক্ষা’ এবং বাংলা একাডেমী ঢাকা থেকে প্রকাশিত দুলাল ভৌমিকের ‘ভর্তৃহরির নীতিশতক’।
.
সংস্কৃত সাহিত্য
আমাদের বর্তমান আলোচনা সংস্কৃত কাব্যের কোনরূপ সাহিত্য বিচার বা পর্যালোচনা না হলেও প্রসঙ্গক্রমে উপস্থাপিতব্য প্রাচীন জ্ঞানের বিষয় আস্বাদনের সুবিধার্থে সংস্কৃত কাব্যসাহিত্যের সামান্য দুয়েকটা লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য জেনে রাখা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বোধ করি।
.
তার আগে বলে নেয়া ভালো, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম শ্রেষ্ঠ ভাষা ও সাহিত্য হচ্ছে সংস্কৃত। বেদ থেকে শুরু করে রামায়ণ মহাভারতের কবিগণ এবং কালিদাসের মতো সংস্কৃত সাহিত্যের কবিশ্রেষ্ঠগণ সংস্কৃত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারকে অমূল্য রত্নরাজিতে পূর্ণ করে গেছেন। কিন্তু এতো কিছু দিলেও আরেকটা যে অনুচিত কাজ করে গেছেন তাঁরা, উত্তরসূরীদের কাছে নিজেদেরকে রেখে গেছেন গোপন করে। কেননা অধিকাংশ কবিরই জীবন-চরিত আমাদের অজ্ঞাত রয়ে গেছে এজন্যেই যে, আমরা জানি না তাঁদের সঠিক পিতৃ-মাতৃ পরিচয়, বংশ বা জন্মস্থানের কথা। এমনকি তাঁরা কেউ কেউ তাঁদের রচনার পাতায় নিজের নামটিও উহ্য রেখেছেন। ফলে অজ্ঞাত পরিচয় রচনাকর্মের স্রষ্টা নির্ধারণেই দূরপনেয় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। একারণে অধিকাংশ কবির বেলাতেই সৃষ্টি হয়েছে একের পর এক জনশ্রুতি বা কিংবদন্তীর। কারো কারো পরিচয় উদ্ধার করতে এসব জনশ্রুতিকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। ফলে নিশ্চয় করে কোন তথ্যকেই অভ্রান্ত হিসেবে মেনে নিয়ে যেমন সন্দেহমুক্ত হওয়া যায় না, তেমনি অবহেলা করারও উপায় থাকে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের এটাও বোধ করি একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। এ দায় মাথায় নিয়েই এই কবিশ্রেষ্টদের সম্পর্কে কোন তথ্য উপস্থাপন করতে হয় বৈকি।
.
সে যাক্, সংস্কৃত সাহিত্যে কাব্যকে প্রথমতঃ দুটো শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে- দৃশ্যকাব্য এবং শ্রব্যকাব্য। দৃশ্যকাব্য হলো দেখার উপযোগী নাটক বা নাটক জাতীয় রচনা যা অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের দেখানো যায়। আর শ্রব্যকাব্য শোনার উপযোগী যা কেবল পাঠের দ্বারা শ্রোতাদের শোনানো যায়, কিন্তু অভিনয় করে দেখানো যায় না।
.
শ্রব্যকাব্য আবার তিন ভাগে বিভক্ত- গদ্যকাব্য, পদ্যকাব্য ও চম্পূকাব্য। গদ্যকাব্য গদ্যে রচিত। যা ‘কথা’ ও ‘আখ্যায়িকা’ এই দুই প্রকার। এদের পার্থক্য মূলত বিষয়বস্তুতে। ‘কথা’ হলো কবিকল্পিত বা কল্পনাশ্রয়ী রচনা, এবং ‘আখ্যায়িকা’র কাহিনী হবে ঐতিহাসিক বা বস্তুনিষ্ঠ। অন্যদিকে পদ্যকাব্য পদ্যে রচিত। আর গদ্য-পদ্য মিশ্রিত কাব্যকে বলা হয় চম্পূকাব্য।
.
পদ্যকাব্যের আবার তিনটি ভাগ- মহাকাব্য, খণ্ডকাব্য এবং গীতিকাব্য। লোকপ্রসিদ্ধ, ঐতিহাসিক মহাপুরুষ কিংবা কোন দেব-দেবীর কাহিনী নিয়ে আটের অধিক সর্গে রচিত বিশাল কাব্যই মহাকাব্য। এতে মানবজীবনের একটি পূর্ণ চিত্র প্রতিফলিত হয়। অন্যদিকে খণ্ডকাব্য এর বিপরীত। যেখানে ধর্ম, নীতি, প্রেম, বিরহ ইত্যাদি যে-কোন বিষয়ে মানবজীবনের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র অঙ্কিত হয়। আর গীতিধর্মী রচনাশৈলীর যে কাব্য গীত হবার যোগ্য তা-ই গীতিকাব্য।
.
গীতিকাব্যের দুটো ভাগ- প্রবন্ধকাব্য এবং মুক্তককাব্য বা কোষকাব্য। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বিষয়বস্তু সম্বলিত পরস্পর-সাপেক্ষ শ্লোকসমূহকে বলে প্রবন্ধকাব্য। অর্থ প্রকাশের দিক থেকে প্রবন্ধকাব্যের শ্লোকগুলো পরস্পর-নিরপেক্ষ হবার সুযোগ নেই। অন্যদিকে মুক্তককাব্য বা কোষকাব্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থ প্রকাশের দিক থেকে প্রতিটি শ্লোকই পরস্পর নিরপেক্ষ। প্রত্যেক শ্লোকই স্বতন্ত্র, বিশেষ ভাবনার বাহক।
.
জীবন চলার পথে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কর্তব্য-অকর্তব্য নির্ধারণে কোষকাব্যশৈলীর এধরনের শ্লোক-সংকলন প্রয়োজনীয় নির্দেশনার কাজ করে।  এগুলো সংস্কৃত সাহিত্যের অমূল্য রত্নবিশেষ। কোন কোন সংকলন বিভিন্ন কবির কাব্য বা নাটকের বা যেকোন সাহিত্যকীর্তির উদ্ধৃতিমাত্র অবলম্বন করে রচিত হয়েছে। আবার লৌকিক প্রবাদ-বাক্যকে সম্বল করেও মনোরম শ্লোক রচিত হয়েছে, যার উদাহরণ ‘ভর্তৃহরির নীতিশতক’।  অথবা কেবলমাত্র উপদেশমালা নিয়েও এরকম সুভাষিতসংগ্রহ রচিত হয়েছে। ‘চাণক্য-নীতিশাস্ত্র’ সেরকমই উপদেশমালা বিশেষ।
.
যেহেতু নীতিমূলক শাস্ত্র বা কাব্য রচনায় রচয়িতার সমকালীনতাই মূল অনুসঙ্গ হয়ে থাকে, তাই রচয়িতার উৎস-সন্ধানের মধ্য দিয়ে সেকালের সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলেই এই নীতিশাস্ত্রগুলোর প্রকৃত উপযোগিতাটুকু উপলব্ধি করা সহজ হতে পারে। তাছাড়া সভ্যতার ক্রমবিবর্তিত ধারায় কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে একালে এসেও বহু নীতিবচন যেভাবে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে মিলেমিশে কখনো পূর্বের অবয়বে কখনো বা নতুন অবয়বে সমকালীন উপযোগিতায় জ্বলজ্বল করছে, তাতে করে এই নীতিবচনগুলো থেকে আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতির একটি ধারাবাহিক চারুপাঠ করে ফেলাও অসম্ভব নয় বলে মনে হয়। সেই চারুপাঠে প্রবেশের আগে সংশ্লিষ্ট সময়কালটাকে উপলব্ধির প্রয়োজনে আমাদের আলোচ্য ওই নীতিকাব্য স্রষ্টাদের পরিচয়টা অন্তত একটু খুঁজে নিতে পারি।

(চলবে…)

পর্ব : [ * ] [ ভর্তৃহরিপর্ব ]
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 171,998 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2012
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   এপ্রিল »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: