h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: বড় কাটরা ও ছোট কাটরা |

Posted on: 13/04/2011


বড় কাটরা, ঢাকা।

| কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: বড় কাটরা ও ছোট কাটরা |
-রণদীপম বসু

‘কাটরা’ শব্দটি আরবি শব্দ ‘কাতরার’ বা ‘কাতারা’ থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়। কাতারা শব্দের অর্থ খিলান সারিযুক্ত ইমারত। আরবি ও ফার্সি সাহিত্যে এটাকে কারওয়ান সরাই বলা হয়, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ক্যারভান সরাই বা শুধু সরাই। ইসলামি স্থাপত্য সংস্কৃতিতে কারওয়ান সরাই নির্মাণ একটি পূণ্যের কাজ বলে গণ্য হতো। তাই পূণ্য লাভের আশায় পরোপকারী শাসকরা অনেক সরাইখানা নির্মাণ করেছেন বলে ইতিহাস রয়েছে। এগুলো সাধারণত বাণিজ্য রুটের পাশ দিয়ে নির্মাণ করা হতো। কারওয়ান সরাই সাধারণত প্রয়োজনীয় অঙ্গন বিশিষ্ট ইমারত। অঙ্গনটিকে খিলান সারিযুক্ত বারান্দা দিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা হতো। বারান্দার পাশেই থাকতো অতিথিদের কক্ষ। পরিব্রাজক ও ব্যাবসায়ীরা বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার পথে এসব কক্ষে সাময়িক আশ্রয় নিতেন। বোঝাবহনকারী পশু, গাড়ি ও অন্যান্য সামগ্রি খোলা প্রাঙ্গণে রাখা হতো। বাংলার সুলতানি ও মুগল আমলে এ ধরনের বেশ কিছু সরাই বা কাটরা নির্মিত হয়েছিলো বলে জানা যায়।

একটি কাটরায় পরিব্রাজকদের জন্য ঘুমাবার স্থান, রান্নাঘর, গোসলখানা, মসজিদ এমনকি আগত বসবাসকারীদের জন্য হাসপাতালও থাকতো। প্রাথমিকভাবে কাটরা যদিও পরিব্রাজক ও বণিকদের জন্য নির্মিত হয়েছিলো বলে মনে করা হয়, এক সময় এগুলো শাসকদের অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়েও নির্মিত হতো। এ জন্যে এগুলোকে প্রাসাদ ইমারত বলেও আখ্যায়িত করা হয়।

ঢাকায় এ ধরনের বেশ কিছু সরাই বা কাটরার  (Katra) অস্থিত্ব পাওয়া যায় যেগুলো পরবর্তীকালে বোর্ডিং হাউজ বা বাজার রূপে পরিবর্তিত হয়েছে। অনেকগুলোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন মৌলভীবাজারে মুকিম কাটরা। ১৬৬২ খ্রিষ্টাব্দে মীর জুমলা যখন সুবাদার, মির্জা মুকিম নামের এক ভদ্রলোক ওই মুকিম কাটরা নির্মাণ করেন। বর্তমানে এর কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়া বকশীবাজার কাটরা, মুগলটুলী কাটরা, মায়া কাটরা, নবাব কাটরা, নাজির কাটরা, রহমতগঞ্জ কাটরা এবং বাদামতলী কাটরা উল্লেখযোগ্য। কারওয়ান বাজারেও একগুচ্ছ কাটরা ছিলো বলে জানা যায়, যেগুলোর কোন অস্তিত্ব এখন নাই। ধারণা করা হয় সরকারি ও বেসরকারি উভয় উদ্যোগেই এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। সরাইখানার রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ওয়াকফ এস্টেট-ব্যবস্থারও সূচনা হয়। বর্তমানে যেগুলোর ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়ে গেছে, ঢাকায় মুগলদের নির্মিত বিখ্যাত সেই দুটো কাটরা হলো ‘বড় কাটরা’ ও ‘ছোট কাটরা’।

বড় কাটরা:
ঢাকার চকবাজারের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বড় কাটরার অবস্থান।  একটি আয়তাকার প্রাঙ্গণকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে বাইশটি কক্ষ নিয়ে এটি নির্মিত। এর প্রধান তোরণ ছিলো দুটি- একটি উত্তরে ও একটি দক্ষিণে। দক্ষিণ তোরণটি নদীর দিকে থাকায় এ অংশ বৃহৎ ও বিশেষ পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছিলো। পূর্ব-পশ্চিম অংশের মাঝামাঝি অংশে তিনতলা উঁচু ফটক। তার দুপাশে দোতলা ঘরের সারি। একেবারে দুপ্রান্তে আটকোণা দুটি বুরুজ। চুনসুরকি দিয়ে মজবুত করে তৈরি সম্পূর্ণ রাজকীয় মুগল স্থাপত্য শৈলীর এই ইমারতটি ১৬৪৩ থেকে ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। তবে বড় কাটরায় প্রাপ্ত ফার্সি ভাষায় লিখিত দুটো শিলালিপিতে দু’ধরনের সালের উল্লেখ রয়েছে। একটিতে লেখা আছে এই কাটরা ১০৫৩ হিজরী সনে (১৬৪৩-৪৪ খ্রি.), এবং অন্যটিতে লেখা ১০৫৫ হিজরী সনে (১৬৪৫-৪৬ খ্রি.) নির্মিত।

 

বড় কাটরা, ঢাকা।

 

বলা হয়ে থাকে, মুগল শাহজাদা শাহ সুজা নিজের জন্য ঢাকায় একটি প্রাসাদ নির্মাণ করতে মীর-ই-ইমারত বা প্রধান স্থপতি মীর আবুল কাসেমকে দায়িত্ব দেন। কিন্তু নির্মিত হওয়ার পর প্রাসাদটি পছন্দ না হওয়ায় এটি আবুল কাসেমকেই কাটরা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য দিয়ে দেন। শর্ত ছিলো যে দানকৃত ওয়াকফ ইমারতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ কোন অবস্থাতেই ব্যবহারের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তির কাছ থেকে কোন প্রকার ভাড়া নিতে পারবে না। এর মধ্যে বাইশটি দোকানির নিকট ওয়াকফ করা দোকান কাটরার খরচ বহনের জন্য দেওয়া হয়। বর্তমানে পুরো কাটরা ইমারতের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, বাকি অংশও ধ্বংসপ্রায়। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে অধিগ্রহণ করতে চাইলেও এর মালিকদের চরম বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। মালিকরা এখানে অনেক পরিবর্তন এনে এর আদিরূপের পরিবর্তন করে ফেলেছে এবং একই এলাকায় অনেক বহুতল ভবনও নির্মিত হয়ে গেছে। ফলে মুগল ঐতিহ্যের জমকালো নিদর্শন হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ ইমারতটি এখন বিলুপ্তপ্রায়। ১৭৬৫ সালে নিমতলী কুঠি নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকার নায়েব নাজিম এখানে বসবাস করতেন বলে জানা যায়।
 

বড় কাটরা, ঢাকা।

 

বড় কাটরা এলাকায় গেলে সুউচ্চ মধ্যবর্তী খিলানরূপী প্রবেশ তোরণযুক্ত ইমারতের নিদর্শন চিহ্নের বিদ্যমান ধ্বংসাবলীর মধ্যে এই বড় কাটরাটির প্রকৃত কোন অবয়বই চোখে পড়ে না আর। চার্লস ডি অয়েলীর (১৮২৪-৩০) আঁকা স্কেচ থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে এক সময় এই ইমারত বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যমণ্ডিত নিদর্শন রূপে বিদ্যমান ছিলো। এখন তা কেবলই ইতিহাস।

ছোট কাটরা:
বড় কাটরার কাছেই প্রায় ২০০ গজ পূর্ব দিকে হাকিম হাবিবুর রহমান লেনে এই ছোট কাটরার অবস্থান। এর নকশা ও নির্মাণ উদ্দেশ্য বড় কাটরার অনুরূপই ছিলো। তবে এর আকৃতি অপেক্ষাকৃত ছোট বলেই এই ছোট কাটরা নামকরণ হয়েছে। বড় কাটরার মতো এটিতেও দুটো তোরণ, একটি উত্তরে ও অপরটি দক্ষিণে অবস্থিত। দক্ষিণের তোরণটিই প্রধান তোরণ। আয়তাকার কাটরার দক্ষিণ বাহুর দুই কোণায় দুটো আটকোণা বুরুজ বা টাওয়ার রয়েছে। উভয় তোরণেরই অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়ে গেছে। মুগল রীতিতে নির্মিত ত্রিতলবিশিষ্ট দক্ষিণ তোরণ এবং তিন জানালাযুক্ত সুউচ্চ কোণার টাওয়ারগুলোর সাথে পরবর্তী ইংরেজ আমলের সংস্কাররীতি মিশে এগুলো ঔপনিবেশিক চিহ্নও ধারণ করেছে।
 

ছোট কাটরা, ঢাকা।

 

অনুমান করা হয় যে ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খানের আমলে সরাইখানা বা কোন প্রশাসনিক কাজে ছোট কাটরার নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৬৭১ খ্রিষ্টাব্দে তা শেষ হয়। এটাও বলা হয় যে, শায়েস্তা খানের কিছু কর্মকর্তা ও বর্ধিত পরিবারের বসবাসের প্রয়োজনে এটি নির্মাণ করেছিলেন তিনি।  বড় কাটরার মতো ছোট কাটরাও ছিলো ওয়াকফ করে দেয়া ইমারত।

কোম্পানী আমলে ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে মিশনারি লিওনার্দ এই ছোট কাটরায় ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল খোলেন। ১৮৫৭ সালে এখানেই ঢাকার প্রথম নরমাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। উনিশ শতকের শেষ দিকে ও বিশ শতকের প্রথম দিকে ছোট কাটরা ঢাকার নবাব পরিবারের দখলে ছিলো এবং তখন এখানে কয়লা ও চুণার কারখানার কাজ চলতো বলে জানা যায়। ছোট কাটরার চত্বরেই বিবি চম্পার স্মৃতিসৌধ রয়েছে। এই বিবি চম্পা কে ছিলেন তা নিয়ে বিভিন্ন মত চালু রয়েছে। কারো মতে তিনি শায়েস্তা খাঁর মেয়ে, কারো মতে উপপত্নী। তবে তাঁর নামানুসারেই এলাকার নাম চম্পাতলী হয়েছে।

বর্তমানে ছোট কাটরার ধ্বংসাবশেষটাই চোখে পড়ে। কাটরা ঘিরে গলি-উপগলি আর চতুর্দিকে এতো দোকানপাট তৈরি হয়ে ঐতিহ্যবাহী ছোট কাটরা এখন অদৃশ্য হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে বলেই মনে হয়।

# তথ্য সূত্র:
০১) স্থাপত্য / বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-২ / বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।
০২)  ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী / মুনতাসীর মামুন।
( বড় কাটরার আরো ছবি এখানে এবং ছোট কাটরার আরো ছবি এখানে )

Advertisements

4 Responses to "| কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: বড় কাটরা ও ছোট কাটরা |"

Choto belay giyechilam, mone pore gelo hariye jacche anek oitijjo amder kas theke. Vhalo laglo post ti.

ভাল লাগলো। অনেক কিছু জানতে পারলাম …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 188,777 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

এপ্রিল 2011
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ   জুন »
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: