h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| ক্ষুদ্রঋণের সুদ গণনা ও গ্রামীণ ব্যাংক বিতর্ক |

Posted on: 07/04/2011


| ক্ষুদ্রঋণের সুদ গণনা ও গ্রামীণ ব্যাংক বিতর্ক |

-রণদীপম বসু

আজ থেকে অন্তত তিরিশ বছর আগের কথা। ১৯৮০ সাল। আমি তখন ভ্রাম্যমান নাগরিক হিসেবে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। অতিরিক্ত আগ্রহ হিসেবে ক্লাস শেষে বিকেলে কলেজের সাধারণ জিমনেশিয়ামটিতে যাতায়াত ছিলো নিয়মিত। এখন সেই জিমনেশিয়াম কম্পাউন্ডটার কীরকম চেহারা দাঁড়িয়েছে জানি না, তবে সেসময়ে তা দেখতে যে খুব একটা দৃষ্টিনন্দন ছিলো তাও নয়। কলেজ ক্যাম্পাসের প্রান্ত ঘেষা স্বল্পপরিসর জিমনেশিয়াম কম্পাউন্ডে ঢোকার জন্যে রাস্তার পাশে লোহার গ্রিলের বুক সমান উঁচু যে পুরনো পকেট গেটটা ছিলো ওটা সবসময়ই তালাবদ্ধ পেয়েছি। ফলে গেটটি বেয়ে উঠে তীরের ফলার মতো  লোহার খাড়া গ্রিলের ছুঁচালো অগ্রভাগ বাঁচিয়ে টপকে গেটের ভেতরে ঢুকে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হতো আমাদের। ছাত্র-অছাত্র বিভিন্ন শ্রেণীর ইচ্ছুক শরীরচর্চাকারীদের আনাগোনা ছিলো সেখানে। নিয়মিত যাতায়াতের কারণে অনেকের সাথেই ব্যক্তিগত পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। স্মৃতিবিভ্রাটের কারণে সেই বড় ভাইটির নাম এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। ধরে নেই  শাহীন ভাই। বেশ জলি টাইপের লোক ছিলেন। তো একদিন তিনি তাঁর এক বন্ধুর সাথে খেলাচ্ছলে তখনকার হিসাবে দশ টাকার একটা বেট ধরে বসলেন। বেট আর কিছু নয়, লোহার গেটটা একলাফে পেরোনো। যথারীতি লাফ দিলেন এবং অনায়াসে পেরিয়ে গেলেন। অতঃপর বাজি জেতা দশ টাকা নিয়ে খুশিমনে বন্ধুসহ চলেও গেলেন। হরদম ঘটে যাওয়া খুব সাধারণ ও গুরুত্বহীন একটা ঘটনা হিসেবে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরাও মনে রাখলাম না সেটা।

কিন্তু পরদিন থেকে তাঁকে আর জিমনেশিয়ামে দেখা গেলো না। সপ্তা খানেক বা আরো কিছুদিন পর হঠাৎ খবর পেলাম শাহীন ভাই হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়। পড়িমরি করে ছুটলাম আমরা তাঁকে দেখতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমার ধারণা শূন্যের কোঠায়। তাই আমার শরীরে কোন একটা সদ্যক্ষত থাকার কারণে আমাকে কেন রোগীর কক্ষে ঢুকতে দেয়া হলো না এর প্রকৃত ব্যাখ্যা দেয়া আমার দ্বারা সম্ভব নয়। হয়তো আমার জন্যেই অতিরিক্ত সতর্কতা ছিলো এটা। কারণ তীব্র ধনুষ্টঙ্কারে আক্রান্ত হয়ে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যাওয়া শাহীন ভাই তখন চূড়ান্তভাবেই মৃত্যুপথযাত্রী। অন্যেরা তাঁকে দেখে বিষণ্ন মন নিয়ে বেরিয়ে এলো। জানা গেলো, বেট ধরে লাফ দিয়ে সেদিন গেট পেরোতেই মাটিতে পড়ে থাকা একটা পুরনো ছোট্ট পেরেকের মাথা গেথে গিয়ে পায়ের তলায় বেরিয়ে আসা অতিনগন্য রক্তবিন্দুকে তাঁর মতো একজন এথলেটের অনাবশ্যক ভেবে পাত্তা না-দেয়ার মাশুল দিলেন তিনি এভাবেই।

তারুণ্যের উন্মেষকালে এরকম অভাবনীয় ঘটনার স্তম্ভিত সাক্ষি হয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। সাধারণ অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবনার বাইরে কিছু ঘটে যাওয়াকেই অভাবনীয় ঘটনা বলে। এরকম অভাবনীয় ঘটনা দেখা ও জানার অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে আরো অনেক হলেও বর্তমান লেখাটা লিখতে যাওয়াও আরেক অভাবনীয় রঙ্গ বলেই মনে হচ্ছে নিজের কাছে। তবু কতো রঙ্গই তো ঘটে এই বঙ্গদেশে।

আমি অর্থনীতি বা ব্যাংকিংয়ের ছাত্র নই। তবু দায়ে পড়ে, কখনো বা অদম্য কৌতুহলের বশে কত কিছুতেই যে নাক গলাতে হয়। মাইক্রোক্রেডিট (microcredit) নিয়েও সেরকমই কৌতুহল আমার। গোটা বিশ্বে আলোড়ন তোলা যে তত্ত্বের জন্ম ও প্রাথমিক প্রয়োগ এই গরীব বাংলাদেশেই, যার সাফল্যের সাথে জড়িয়ে আছে ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Dr. Yunus)ও গ্রামীণ ব্যাংকের  (Grameen Bank) নাম, যাঁকে নিয়ে দুনিয়া জুড়ে এতো আলোচনা-সমালোচনার ঝড়, উপরন্তু যে তত্ত্বকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে সভ্যতার কলঙ্কচিহ্ন ‌দারিদ্র্য নামের সামাজিক রোগটিকে বিমোচন বা দূর করার সম্ভাব্যতা নিয়ে টাটকা বিতর্ক, তার প্রতি শুধু আমার কেন, শিক্ষিত সচেতন যে কারোরই কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। ফলে নানা মত ও পথের দেশি-বিদেশি রথি-মহারথি ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বরাও এর পক্ষে-বিপক্ষে পরস্পর কলম-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরেই। ইদানিং নতুন মাত্রা যুক্ত হলো ড. ইউনূসকে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অপসারণের নির্দেশের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশকে সারাবিশ্বে দারুণ সম্মানের সাথে পরিচিতি দেবার ঈর্ষণীয় সাফল্যধারী ড. ইউনূসের এই অপমানজনক অপসারণের অতিউৎসাহী উদ্যোগকে তাঁর পক্ষাবলম্বীরা যেমন দেখছেন একটি উদ্দেশ্যমূলক অবৈধ হটকারি আয়োজন হিসেবে, অন্যদিকে ইউনূস বিরোধী পক্ষ এটিকে দেখছেন একটি বৈধ আইনী পদক্ষেপ হিসেবে। বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তা উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আমার আলোচনা সেটা নয়। আমি বরং আমার আলোচ্য বিষয়েই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে চাই।

ড. ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংক বা মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে যুযুধান পক্ষের এই যে ঝড়ো বিতর্ক, প্রত্যেকেই যার যার নিজস্ব অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন। কেউ দেখেন এটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে, কেউ দেখেন অরাজনৈতিকভাবে। কেউ দেখেন কর্পোরাল কিংবা কর্পোরেট দৃষ্টিতে, কেউ দেখেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের আলোকে। কেউ আবার দেখেন সমাজমনস্ক দৃষ্টিতে। কেউ করেন আবেগের চাষ, কেউবা তাকে ব্যবচ্ছেদ টেবিলে ফেলে নিজের মতো কাটাছেঁড়া করেন। ইদানিং কাউকে আবার জনমতের মাঠ গরম করতেও ভীষণ উৎসাহী দেখা যায়। এ সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, দায়বোধ ও নাগরিক অধিকারের বিষয় জড়িত। যে যার মতো করে দেখতেই পারেন এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাও তাঁর রয়েছে। কিন্তু এটা করতে হয় বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই। তা না করলে যে অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকারও এতে খর্ব করা হয় সে বিষয়ে হয়তো আমরা অনেকেই সচেতন থাকি না। আর কোন ক্ষেত্রে যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তথ্য গোপন বা বিকৃতির অপপ্রয়াস লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে, এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী থাকতে পারে ! ইতিহাস বিকৃতির সিদ্ধহস্ত জাতি হিসেবে আমাদের খ্যাতি তো ইতোমধ্যেই বিশ্ববিশ্রুত হয়েই আছে !

মাইক্রোক্রেডিট বা গ্রামীণ ব্যাংকের সমালোচকরা তাঁদের আলোচনায় বা বিতর্কে অন্যতম জোরালো পয়েন্ট হিসেবে যে অভিযোগটি উত্থাপনের মাধ্যমে অন্যান্য অভিযোগগুলোকে যুক্তিসিদ্ধতায় অব্যর্থ করে তুলতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন তা হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার (Rate of Interest)। অথচ এ বিষয়টির স্পষ্ট একটা তথ্যগত ধারণা বা চিত্র খুব স্বাভাবিকভাবে দায়িত্বশীল কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া হলে বর্তমানে প্রচলিত কিছু মিথজুজুর অদ্ভুত বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো না এবং অন্যান্য সৃষ্ট অভিযোগগুলোর বস্তুনিষ্ঠতাও অধিকতর সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা যেতো। এতে করে হয়তো আমাদের প্রচুর মেধাশ্রমের অপচয়ও রোধ হতো এবং মাইক্রোডিটের প্রকৃত সুফলগুলোকে কিভাবে কোন্ প্রক্রিয়ায় আরো উন্নত ও কার্যকর করা যায় সেদিকে এই মেধাশ্রমের সফল প্রয়োগও করা যেতো। কিন্তু তা হয়নি। কেন হয়নি তা খুঁজে বের করা হয়তো সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের কাজ। নিশ্চয় একদিন তা জানতে পারবো আমরা।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। এগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্যেও রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দপ্তর রয়েছে। আর এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে রয়েছে  এমআরএ বা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি। তবে এখন পর্যন্ত এই এনজিওগুলোর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংক নয়। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান হয়েও গ্রামীণ ব্যাংক যে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে সরকার অনুমোদিত নিজস্ব নীতিমালায় পরিচালিত একটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং এটার আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি যে প্রচলিত ব্যাংকিং রীতিতেই সম্পন্ন হয়ে থাকে, এ বিষয়টি অনেকেই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গিয়ে অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিশৃঙ্খলার দায়ভারও এতকাল আশ্চর্যজনকভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের উপর নির্দ্বিধায় চাপিয়ে দিতে দেখা গেছে। কেন এটা করা হয়েছে সেটাও একটা প্রশ্ন। এর দৃশ্যমান নমুনা হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার আধিক্য। এই প্রচারকদের কে কীভাবে এই সুদের হার নির্ণয় করেন জানি না, তবে কেউ বলেন ৩০%, কেউ বলেন ৩৩%, কেউ দেখান ৩৬% বা ৩৮%, আবার কেউ কেউ এটাকে ঠেলতে ঠেলতে চল্লিশ পার করে পঞ্চাশ বা তারও অধিক শতাংশের হারে নিয়ে যান। বিগত পঁয়ত্রিশ বছর বা তারও অধিক সময় ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি আমাদের চোখের সামনেই একটু একটু করে বিস্তৃত হতে হতে বিরাট মহীরুহের আকার নিয়ে গোটা দেশে আড়াই হাজারেরও বেশি শাখার মাধ্যমে দেশের প্রায় সবকটি গ্রামে তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তার করে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং চাইলেই যে হিসাবটি হাত বাড়িয়ে অতি নিকট থেকেই সরেজমিনে বা হাতেকলমে যাচাই করার সুযোগও অগম্য নয়, সেখানে এতো বিচিত্র ও পরস্পর বিরোধী তথ্যের সমাহার দেখে আশ্চর্যই হতে হয়। আর এই বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট, পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে দেয়া রিজয়েন্ডার বা বিভিন্ন প্রকাশনা পুস্তিকার মাধ্যমে জানাতে চেষ্টা করছে যে তাদের সুদের হার সর্বোচ্চ ২০% এবং তা অন্য যেকোন ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সর্বনিম্ন। আরো বিস্ময়কর হচ্ছে নিয়ন্ত্রণকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে আদৌ কোন তথ্য রয়েছে কি না, বা থাকলে তা কতো সেদিকে কারো আগ্রহী না হওয়া। এটা এমন কোন হাইপোথিটিক্যাল বা হাওয়াই বিষয় নয় বা ছিলো না যে তা খুঁজে দেখতে আমাদেরকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। ব্যাংকিং রীতিতে এই বিষয়গুলো তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেজার বা ব্যালেন্স সীটে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত হিসেবে স্থায়ীভাবেই থেকে যায়। আমরা কেন তাতে নজর দিলাম না বা আগ্রহী ছিলাম না সেটাও প্রশ্ন।

ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে গ্রামীণ ব্যাংক কোন্ প্রক্রিয়ায় কিস্তির (instolment) মাধ্যমে ঋণ ও সুদ আদায় করে থাকে এবং ঋণের উপর তাদের সুদ ধার্য করার পদ্ধতি কী তা যাচাই করতে কোন বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না বলেই বর্তমান লেখকের কৌতুহল ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়। গ্রামীণের সুদের হিসাবটা কাছে থেকে দেখার সুযোগ না-হওয়া বা বাস্তবাবস্থাটা মিলিয়ে দেখার সুযোগ না-পাওয়ার কারণেই হয়তো সুদ সম্পর্কে অনেকের মধ্যে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা। এবং আরো ধারণা করি, কেউ কেউ আবার হয়তো এই বিভ্রান্তিকেই পুজি করে বিশেষ উদ্দেশ্যসাধনের চেষ্টা করেছেন অজ্ঞাত কোন ফায়দা হাসিলের জন্য। অতএব, যাঁরা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত তথ্য যাচাই করার যথাযথ সুযোগটুকু করে ওঠতে পারেননি, মূলত তাঁদের জন্যেই সুদ সম্পর্কিত বিভিন্নজন কর্তৃক প্রচারিত কাল্পনিক জুজুমিথের সাথে গ্রামীণের ও অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থা একটু হাতে কলমে মিলিয়ে দেখার এই প্রচেষ্টা। তার আগে অর্থনীতি বা ব্যাংকিংয়ের ছাত্র বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী পাঠকের কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এই বলে যে, তাঁরা যেন এ বিষয়ে বর্তমান লেখকের উদ্যোগটিকে কোনভাবেই অযৌক্তিক সীমালঙ্ঘন বা অযাচিত জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা হিসেবে না ভাবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের একাডেমিক শিক্ষার্থী ছিলাম না বলেই নিশ্চয় করে বলা না গেলেও পাঠ্যে এটি সাধারণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ বলেই অনুমান করছি। তাই একাডেমিক পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতে না-পারার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা নিয়ে এ লেখাটা ভিন্ন অংগনের আগ্রহী ও কৌতুহলী পাঠকের জন্যেই নিবেদিত।

ক্ষুদ্রঋণের সুদ ধার্য ও আদায় প্রক্রিয়া:

গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ চার্জের হিসাবটা কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়মকে পুরোপুরি অনুসরণ করে। আমার ধারণা বাংলাদেশ ব্যাংকও এটা নিরীক্ষা করার বাকি রাখেনি এবং তাঁরা খুব ভালোভাবেই জানেন যে গ্রামীণ ব্যাংক উৎপাদনশীল ও বিভিন্ন খাতভেদে প্রদত্ত ঋণের উপর ডিক্লাইনড মেথড বা ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ২০% হারে সরল সুদ আদায় করে থাকে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আরো ভালো জানবেন, আমার সীমিত জ্ঞানে যেটুকু বুঝি, ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি হচ্ছে ঋণগ্রহীতা যে পরিমাণ টাকা যতদিন ভোগ বা ব্যবহার করেন, সে পরিমাণ টাকার ততদিনের সুদচার্জ বা ধার্য করা।

নমুনা হিসেবে ধরা যাক্ গ্রামীণ ব্যাংক একজন ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাকে বার্ষিক ২০% সুদসহ ফেরতদানের শর্তে এককালীন ১০০০ টাকা ঋণ বিতরণ করলো।  সেক্ষেত্রে মূলঋণের পরিমাণ হলো ১০০০ টাকা। বিতরণের পর বিনিয়োগকৃত এই ১০০০ টাকা হলো ব্যাংকটির এসেট বা সম্পদ, যা আদায়যোগ্য ঋণ হিসেবে ঋণগ্রহীতা সদস্যের কাছে বার্ষিক ২০% সুদসহ পাওনা। সুদ হলো ব্যাংকটির মূল আয়, যা দিয়ে তার যাবতীয় পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চায়।

এবার আসি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ায়। যেহেতু গ্রামীণের ঋণ আদায়ের সিস্টেমে সাপ্তাহিক কিস্তির মাধ্যমে ঋণ আদায় করা হয়ে থাকে, তাই আদায়যোগ্য ঋণ  যেমন এই ১০০০ টাকার সাপ্তাহিক কিস্তিতে পরিশোধের শর্তও বিতরণের সময়ে বা আগেই নির্ধারণ করা থাকে। ধরা যাক্ পঞ্চাশটি সাপ্তাহিক কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তাহলে মূল ঋণ ১০০০ টাকাকে পঞ্চাশটি সমান কিস্তিতে ভাগ করা হলে সাপ্তাহিক ঋণের কিস্তি হয় ২০ টাকা। অর্থাৎ মাঠকর্মী বা কর্মকর্তা প্রতি সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র থেকে এই হারে কিস্তি আদায় করবেন। ধরা যাক্ ওই নির্দিষ্ট দিনটি সপ্তাহের প্রতি রবিবার। অর্থাৎ প্রতি রবিবার এলেই ঋণগ্রহীতার কিস্তি দেয়ার পালা।

ঋণগ্রহীতা ঋণ নেয়ার এক সপ্তাহ পর রবিবার এলেই ২০ টাকা কিস্তি দেবেন। এদিন প্রথম কিস্তি দেয়ার পর ঐ তারিখে ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকের পাওনা আদায়যোগ্য ঋণ থাকবে (১০০০-২০) = ৯৮০ টাকা। পরের সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে আবার ২০ টাকা দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধের পর ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকের পাওনা আদায়যোগ্য ঋণ থাকবে এবার (৯৮০-২০) = ৯৬০ টাকা। এভাবে প্রতিসপ্তাহে ২০ টাকা করে কিস্তি পরিশোধ হতে থাকবে আর ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকের পাওনা আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকবে।  এ প্রক্রিয়ায় … ৯৪০, ৯২০, ….., ৫২০, ৫০০, ৪৮০,… ৬০, ৪০, ২০ এভাবে আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পেতে পঞ্চাশ নম্বর সপ্তাহে গিয়ে ঋণ পূর্ণ পরিশোধ হয়ে যাবে।

আবার ৪৬ সপ্তাহেও এই ঋণ পরিশোধযোগ্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে মূল ঋণ ১০০০ টাকাকে সমান ৪৬ টি কিস্তিতে ভাগ করতে গিয়ে ২২ টাকা করে সাপ্তাহিক কিস্তি নির্ধারণ করা যায়। এতে ৪৫ কিস্তিতে পরিশোধ হবে (২২*৪৫)= ৯৯০ টাকা। ফলে ৪৬ নম্বর সপ্তাহে বাকি ১০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথম কিস্তি পরিশোধের পর থেকে আদায়যোগ্য ঋণ হ্রাসের ধারা হবে ৯৭৮, ৯৫৬, ৯৩৪, …, ৫৪, ৩২, ১০। তবে আলোচনার সুবিধার্থে উপরোক্ত ৫০ কিস্তিতে পরিশোধের শর্তকেই নমুনা হিসেবে ধরি।

এবার আসা যাক এই বিতরণকৃত ঋণের উপর সুদ চার্জ ও তার আদায় প্রক্রিয়ায়। ঋণগ্রহীতার কাছে গ্রামীণ ব্যাংক প্রাপ্য সুদ ধার্য করে ব্যাংকিং রীতির খুব সরল একটি পদ্ধতিতে। যা আগেই উল্লেখ করেছি, ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতার কাছে কতটাকা কতদিন আদায়যোগ্য ঋণ হিসেবে ছিলো তার উপর সুদ ধার্য করা হয়। এক্ষেত্রে সাপ্তাহিক কিস্তি আদায়ের প্রকৃতি অনুযায়ী সপ্তাহ অন্তর আদায়যোগ্য ঋণের উপর উপরে বর্ণিত ধারায় ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকের প্রাপ্য সুদ হবে এভাবে-

১০০০টাকার ৭দিনের সুদ + ৯৮০টাকার ৭দিনের সুদ + ৯৬০টাকার ৭দিনের সুদ + …..+ ৫২০টাকার ৭দিনের সুদ + ৫০০টাকার ৭দিনের সুদ + ৪৮০টাকার ৭দিনের সুদ + ….. + ৪০টাকার ৭দিনের সুদ + ২০ টাকার ৭দিনের সুদ… = মোট ৫০সপ্তাহের বা ৩৫০দিনের সুদের যোগফল।

ব্যাংকিং নিয়মে এই সুদ ক্যালকুলেশনের সহজ একটি গাণিতিক সূত্র রয়েছে।  সরল সুদচার্জের এই সূত্রটা হচ্ছে এরকম-

সুদ = [{(১ম ব্যালেন্স + শেষ ব্যালেন্স)/২} *ঋণ ব্যবহারের দিন সংখ্যা/ ৩৬৫] * সুদের হার %

তাহলে এই নিয়মে ২০% হারে ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংক প্রথম সপ্তাহের সুদ প্রাপ্য হবে

= [{(১০০০ + ৯৮০)/২}* ৭/৩৬৫]* ২০/১০০ টাকা

= [৯৯০*৭/৩৬৫]* ২০/১০০ টাকা = ৩.৮০ টাকা (সম্ভাব্য)।

এভাবে দ্বিতীয় সপ্তাহের জন্য সুদ প্রাপ্য হবে

= [{(৯৮০ + ৯৬০)/২}* ৭/৩৬৫]* ২০/১০০ টাকা

= [৯৭০*৭/৩৬৫]* ২০/১০০ টাকা = ৩.৭২ টাকা (সম্ভাব্য)।

এই পদ্ধতিতে পঞ্চাশটি সপ্তাহের ধার্যকৃত সুদগুলোর সামেশন বা যোগ টানলে প্রাপ্য সুদের মোট পরিমাণ বেরিয়ে যায়। এটাকে বলে ব্রেক মেথড। কিন্তু ঋণ পরিশোধের প্রকৃতি অনিয়মিত না হলে একজন ঋণগ্রহীতার জন্য এভাবে প্রত্যেক সপ্তাহের এক এক করে সুদ চার্জ করে মোট সুদ বের করার প্রয়োজন পড়ে না ।

যেহেতু ঋণ পরিশোধের ধরন নিয়মিত সাপ্তাহিক, তাই সেখানে ব্যাংকিং রীতিতে গোটা বছরের হিসাবটাকে একই গড় নিয়মে বের করে ফেলা যায়। এক্ষেত্রে একই নিয়মে প্রথম দিনের আদায়যোগ্য ঋণ হয় ১০০০ টাকা এবং সর্বশেষ কিস্তি প্রদানের আগের দিনে আদায়যোগ্য ঋণ ২০ টাকা। ফলে

সুদ = [{(১০০০ + ২০)/২}*৩৫০/৩৬৫]*২০/১০০ = ৯৯টাকা।

এই গাণিতিক নিয়মে ধার্য করা মোট সুদের পরিমাণের সাথে পূর্বের ব্রেক মেথডে ধার্যকৃত সুদের খুব একটা হেরফের ঘটে না বলে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় এটাই সর্বস্বীকৃত পদ্ধতি। এটার নাম সুদ চার্জের গড় পদ্ধতি।

এখানে আরেকটা বিষয় ধর্তব্য যে, ৫০ সপ্তাহের মোট দিন সংখ্যা ৩৫০ দিন ধরা হলেও বছরে সরকারি ছুটি বা ইত্যাদি কারণে গড়ে দু’সপ্তাহ  কিংবা তারচে কম-বেশি সংখ্যক সপ্তাহের সংশ্লিষ্ট কিস্তি পরিশোধের সাপ্তাহিক তারিখে ব্যাংক বন্ধ থাকতে পারে। বছরে গড়ে দু’সপ্তাহ বন্ধ হিসাবে ধরে যদি মোট ঋণ ব্যবহারের দিন সংখ্যা ৩৬৫ দিনই ধরি তাহলেও হিসাবটা হবে এরকম,

সুদ = [{(১০০০ + ২০)/২}*৩৬৫/৩৬৫]*২০/১০০ = ১০২ টাকা।

অর্থাৎ একজন ঋণগ্রহীতাকে এক বছর মেয়াদী ১০০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করে ২০% হারে বছরে সুদ দিতে হচ্ছে প্রায় ১০০ টাকা বা এক-দু’টাকা এদিক ওদিক।  তাহলে ২০% রেটে ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতির কী অর্থ দাঁড়ালো ? সাদা চোখে সুদের হার প্রায় ১০%  ফ্ল্যাট রেটে নেমে এলো। গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য এটাই হচ্ছে প্রকৃত বাস্তবতা।

আবার কোন ঋণগ্রহীতা যদি বছরের মাঝখানে ধরা যাক ২৫ সপ্তাহ পরে ঋণ একবারে পূর্ণ পরিশোধ করে দিতে চায় সেক্ষেত্রে একই ব্যাংকিং রীতিতে ২৫ সপ্তাহ বা ১৭৫ দিনের জন্য হিসাবটা কেমন হবে ? একই সূত্র-

সুদ = [{(১০০০ + ৫০০)/২}*১৭৫/৩৬৫]*২০/১০০ = ৭২ টাকা।

যে যখনই ঋণ পরিশোধ করুক না কেন, কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের প্রকৃতি নিয়মিত হলে অর্থাৎ ঋণ প্রদানে অনিয়মিত বা খেলাফি না হলে এই গড় পদ্ধতির মাধ্যমেই সুদ ধার্য করা হয় এই অভিন্ন ব্যাংকিং রীতিতে। গ্রামীণের অন্যান্য ঋণ যা এক বছরের বেশি মেয়াদীও হতে পারে যেমন গৃহনির্মাণ ঋণ ৮% বা উচ্চশিক্ষা ঋণ ৫% বা অন্য কোন রেটের স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ, সবগুলোর জন্যই সুদচার্জের এই স্বীকৃত নিয়ম প্রযোজ্য হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আর কোন প্রতিষ্ঠানে এ সুবিধা রয়েছে কিনা জানি না, গ্রামীণ ব্যাংকের একজন নিয়মিত প্রকৃতির ঋণগ্রহীতা ২৫ সপ্তাহে ২৫টি কিস্তি পরিশোধের পর চাইলে তাঁর বাকি ঋণ এককালীন পরিশোধ করে কিংবা প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাপেক্ষে পূর্বের সিলিংয়ে একই ঋণ পুনরায় নিতে পারেন। পূর্বের সিলিং উল্লেখ করার কারণ হলো তিনি যদি ১০০০ টাকার ঋণগ্রহীতা হয়ে থাকেন তাহলে ঋণ গ্রহণের এক বছরের মধ্যে ১০০০ টাকার ঋণের সিলিং অতিক্রম করতে পারবেন না। আর সমন্বয় সাপেক্ষে বলার অর্থ হচ্ছে একজন ঋণগ্রহীতার পুজি বৃদ্ধি বা জরুরি প্রয়োজনে ঋণ পরিশোধের মাঝামাঝি সময়ে বাকি অর্ধেক পরিমাণ ঋণ নগদে পরিশোধ করার সুযোগ বা সামর্থ নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এই সুবিধা গ্রহণ তাঁর দ্বারা অসম্ভব হয়ে যাবে।

একটি ঋণদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সবক্ষেত্রেই যে গড় নিয়ম অনুসরণ করা হবে তা নয়। কেননা ঋণ পরিশোধের প্রকৃতি নিয়মিত না হলে একটানে এই গড় পদ্ধতিতে সুদ চার্জ করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধে অনিয়মিত বা খেলাফি হলেই তখন ব্রেক মেথডে সুদ চার্জ করতে হয়। কারণ একজন ঋণগ্রহীতা এক সপ্তাহ কিস্তি দিয়ে পরবর্তী দুসপ্তাহ হয়তো কিস্তি না দিয়ে তার পরের সপ্তায় কিস্তি দিলেন। সেক্ষেত্রে মাঝখানের ওই তিন সপ্তাহ বা একুশ দিনের জন্য তাঁর কাছে একই পরিমাণ নির্দিষ্ট আদায়যোগ্য ঋণ থাকার কারণে ২১ দিনের জন্য একটি সুদ চার্জ হবে। আবার পরের সপ্তাহে কিস্তি দিলে ওই এক সপ্তাহের জন্য পরিবর্তিত আদায়যোগ্য ঋণের প্রেক্ষিতে একটি সুদ চার্জ হবে। এরপর দেখা গেলো তিনি পরের ছয় সপ্তাহ কোন কিস্তি দিলেন না। তাহলে ওই সময়ের জন্য আরেকটা সুদ চার্জ হবে। এভাবে প্রতিটা অসমান ব্রেকের জন্য একটা করে সুদ চার্জ হয়ে ঋণ পরিশোধ পর্যন্ত যতগুলো ব্রেকের প্রয়োজন হয় ততগুলো গড় পদ্ধতির চার্জের যোগফলই মোট সুদ হিসাবে ব্যাংক প্রাপ্য হবে। অর্থাৎ ব্রেক পদ্ধতি মানে হলো কতকগুলো অসমান গড় পদ্ধতির সমাহার। বর্ণিত এই ব্যাংকিং রীতির বাইরে সুদ চার্জের অন্য কোন নিয়মের প্রচলন জানামতে গ্রামীণ ব্যাংকে কখনো ছিলো না, এখনো নেই। এখানেও উল্লেখ থাকা উচিৎ যে, গ্রামীণ ব্যাংকে ঋণের উপর চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ধার্য বা আদায়ের এমন কোন অমানবিক বিধান কখনোই ছিলো না বা তা চর্চিতও হয় না। এবং আরেকটি বিধান যা চর্চার খুব একটা প্রয়োজন হয় না, দীর্ঘকালীন ক্লাসিফাইড বা খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকিং নৈতিকতা অনুযায়ী ঋণের উপর ধার্যকৃত মোট সুদের সর্বোচ্চ পরিমাণ বিতরণকৃত মূল ঋণের চাইতে কখনোই বেশি হতে পারে না।

উপরিউক্ত হিসাব মতে এটা স্পষ্ট যে, গ্রামীণ ব্যাংকের ঘোষিত ২০% সুদের হার আসলে ডিক্লাইনড বা ক্রমহ্রাসমান সুদের হার, যা মূলত ফ্ল্যাট রেটে দাঁড়ায় ১০% এ। গ্রামীণ ব্যাংক এখানে তার ঋণের উপর সর্বোচ্চ সুদের হার ডিক্লাইনড রেটে ২০% প্রচার না করে ১০% ফ্ল্যাট রেটের এমন চমৎকার কথাটি কেন প্রচার করলো না ? এখানে এরকম ধারণা করা অনুচিত হবে না যে, গ্রামীণ ব্যাংক এক্ষেত্রে ১০% ফ্ল্যাট রেটের কৌশলী প্রচার না করে ২০% ডিক্লাইনড রেটের কথা বলে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে। যদিও তার বিরোধীরা যে এর ধারেকাছেও না থেকে অপপ্রচারের মাধ্যমে কোনভাবেই সততার পরিচয় দেন নি তা বলা যায়। অথচ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত আপাত অল্প হারের দৃশ্যমান ফ্ল্যাট রেটের আড়ালে সম্ভাব্য কত যে গুজর রয়ে গেছে তা ভাবলেই অবাক হতে হয় !

এই ফাঁকে আমরা নাহয় ফ্ল্যাট রেটের মহিমাটা একটু যাচাই করে নিতে পারি যা অনেক প্রতিষ্ঠান নিজের জন্য সুকৌশলে প্রচার করে থাকে। গ্রামীণের এতো জটিল শব্দ ডিক্লাইনড রেট ২০% এর বিপরীতে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সহজ-সরলভাবে বলে থাকে যে ওরা মূলঋণের উপর সাধারণ ফ্ল্যাট রেটে ১৫% সুদ নেয়। ব্যাংকিং রীতিতে এই সহজ কথাটির হিসাব পদ্ধতিও অত্যন্ত সরল। এক্ষেত্রে সুদকষার খুব স্বাভাবিক নিয়মটি হলো-

সুদ = মূল ঋণ গুণন সুদের %।

অতএব মূল ঋণ ১০০০ টাকার জন্য ১৫% হারে এক বছরের সুদ হবে

= ১০০০ *১৫/১০০ = ১৫০ টাকা।

ফলাফল যে আর সরল থাকছে না সেটা বুঝতে বাকি থাকে না। অর্থাৎ সুদের হার কম দেখিয়েও প্রতি হাজার টাকার জন্য এরা গ্রামীণ ব্যাংকের চাইতেও ৫০ টাকা করে বছরে সুদ বেশি নিচ্ছে। কারো কারো ফ্ল্যাট রেটের হার হয়তো ১৫% এরও বেশি রয়েছে। বাংলাদেশে এরকম বহু ঋণদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিও সংস্থা সবার চোখের সামনে দিয়ে এ কাজটি হরদম করে যাচ্ছে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের নজরে আসছে না।

কোন ঋণ গ্রহীতা যদি এই ফ্ল্যাট রেটের ১৫% সুদহারেই বছরের মাঝামাঝি সময় অর্থাৎ ২৫ সপ্তাহ পর ঋণ পূর্ণ পরিশোধ করতে আগ্রহী হয়, সেক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক সরল সুদের ফ্ল্যাট নিয়মে সুদ হওয়ার কথা অর্ধেক, অর্থাৎ ৭৫ টাকা। এখানেও গ্রামীণের ২০% ডিক্লাইড রেট থেকে সুদ নিচ্ছে বেশি। কিন্তু ভয়ঙ্কর আশংকার কথা হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা যখনই ঋণ পরিশোধ করুক না কেন, তা বছরের যে কোন সময়, হতে পারে ঋণ গ্রহণের ছ’মাস পর বা তিন মাস পর, তার কাছ থেকে বিতরণকৃত মূলঋণের উপর ফ্ল্যাট রেটে গোটা বছরের সুদটাই নিয়ে নিচ্ছে, যেহেতু তাদের ঋণদানের শর্তই হচ্ছে মূল ঋণের পরিমাণের উপর সুদ আদায়। যারা গণিত ও ব্যাংকিংয়ে পারদর্শী, দয়া করে এই সুদের হিসাবটা কেউ কি বের করে দেখবেন ঋণ পরিশোধের সময়ের হেরফেরে বাস্তবে এই সুদের হার শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় ?

কেউ কেউ হয়তো এই হিসাবটা করেছেনও, এবং এর ভয়ঙ্করতাও চাউর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানভেদে বাছবিচার না হবার অদ্ভুত কারণে ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ হবার মাশুল হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককেই শিখণ্ডি হয়ে এর মিথ্যে দায় নিতে হয়েছে হয়তো। আর যেহেতু হতদরিদ্র মানুষজনকে নিয়েই তার কাজকারবার, ফলে নোবেল জয়ী হয়েও অতিরিক্ত শিরোপা হিসেবে ‘সুদখোর’ ‘রক্তচোষা’ ‘কাবুলিঅলা’ ইত্যাদি মহান ভূষণ অর্জনেও ঘাটতি পড়ে নি। অথচ বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণদানকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, যেখানে কোন কোন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকেরও  সীমিত পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম রয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হারই তুলনামূলক নিম্নতম বলে জানা যায়।

অবশ্য গ্রামীণ ব্যাংক ঘোষিত এই যে ২০% ডিক্লাইনড রেট, তার মধ্যে ছোট্ট একটা ফাঁক থেকে গেছে বলে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও রয়েছে ঘোলাটে ধারণা। সেটা হলো গ্রামীণের সুদ আদায় প্রক্রিয়া নিয়ে। এক্ষেত্রে গ্রামীণের সিস্টেম অনুযায়ী প্রতি ১০০০ টাকা ঋণের জন্যে গোটা বছরের সম্ভাব্য সুদের পরিমাণ ১০০ টাকা ধরে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ভাগ করে শুরু থেকেই সমান কিস্তিতে আদায়ের উদ্যোগ নেয়া। তবে সুদের পূর্বোক্ত গড় পদ্ধতির হিসাব অনুযায়ী প্রথম সপ্তাহেই যে টাকা চার্জ হয়, যা আনুমানিক চার টাকার কাছাকাছি, তার থেকে কম পরিমাণ কিস্তিতেই আদায় করা হয়। পঞ্চাশ কিস্তিতে ভাগ করা হলে তা হয় ২ টাকা। যদি এটা আরো কম কিস্তিতে বিভাজন হয় (২৫ কিস্তির পর পুনরায় ঋণ নেয়ার কারণে) তাহলে এর পরিমাণ ৩টাকাও হতে পারে। তবে এটা বলা যায় প্রথম অন্তত ২৫ সপ্তাহ পর্যন্ত যে টাকা সুদ চার্জ হতে পারতো, সে সময় পর্যন্ত সুদ আদায়ের পরিমাণ বাস্তবে অবশ্যই তার চেয়ে কম হয়ে থাকে।

আর বিশেষজ্ঞদের হিসাব জটিলতাটাও এখানেই। নিয়ম অনুযায়ী যদি ঋণ পরিশোধের পর সুদ আদায় করা হতো এককালীন, তাহলে উপরোক্ত হিসাবে সুদের হার নিয়ে কোন বিতর্ক থাকার সুযোগই হতো না। যেহেতু শুরু থেকেই সুদের আংশিক কিস্তি ঋণের কিস্তির সাথে (২০+২ বা ২২+৩ টাকা) আদায় করা হয়, তাই ধরে নেয়া যায় আদায়কৃত সুদের চূড়ান্ত হারে কিছুটা বিচ্যুতি ঘটে। কিন্তু সেটা কতো ? অনেকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন তা। কারো কারো মতে এই বিচ্যুতিসহ চূড়ান্ত হিসাব দাঁড়ায় ২২%, কেউ বলেন এটা ২১%। কেউ আবার ফ্র্যাকশন বা ভগ্নাংশ যোগ করে বলেন ২১ দশমিক সামথিং।  এ ব্যাপারেও দক্ষ গণিতবিদরা সঠিক রেটটা হিসাব করে দেখতে পারেন তা আসলে কতো। তবে আমার ধারণায় এটা ডিক্লাইন রেটে ২২ পারসেন্টের চাইতে কমই হবে। সম্ভাব্য ২১.২৫%। এটাকেও যদি চূড়ান্ত রেট হিসেবে বিবেচনা করি তাহলেও প্রশ্ন আসে ক্ষুদ্রঋণের তহবিল সহায়তাকারি সংস্থা পিকেএসএফ-এর মাধ্যমে সরকার কেন ক্ষুদ্রঋণের সুদ আদায়ের হার সর্বোচ্চ ২৭% এর মধ্যে রাখতে বলছে ? এটা নিশ্চয়ই ডিক্লাইড রেটেই হবে। ধারণা করি, সম্ভবত পিকেএসএফ-এর আওতাধীন উপরে উল্লিখিত ফ্ল্যাট রেটের হিসাবধারী  সংস্থাগুলোর সুদহিসাবের মাহাত্ম্যটা নিশ্চয়ই তাঁদেরও নজরে এসেছে। তবে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর তদারকি ও তাদের তহবিল সহায়তার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফ-এর  বেঁধে দেয়া রেটের চাইতেও বিশেষায়িত ব্যাংক গ্রামীণের রেট যে অনেক কম, এটাই প্রকৃত বাস্তবতা। ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তির যুগে এসে গ্রামীণের ওই ম্যানুয়াল হিসাব প্রক্রিয়াটি এখন কেবল কম্প্যুটারের সহায়তায় নির্ণীত হচ্ছে এই যা। তবে কম্প্যুটার প্রযুক্তির ব্যবহারে এই হিসাব গণনা আরো নিখুঁত হবে বলা যায়। কেননা এতে সুদ নির্ণয়ের গাণিতিক হিসাবগুলো দিনভিত্তিক আদায়যোগ্য ঋণের ব্রেক মেথডে বের করা সম্ভব। এবং জানামতে হচ্ছেও তাই।

বিস্ময়ের কথা হলো, অনেকেই সরেজমিনে যাচাই না করে সম্ভবত কান-কথার উপর নির্ভর করেই অবিবেচকের মতো গ্রামীণ ব্যাংককে উচ্চসুদ হারের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে রীতিমতো কটুবাক্যও বর্ষণ করে যাচ্ছেন। এটা কেন করেন তা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে যাঁরা শুধু ধারণার বশবর্তী হয়ে গ্রামীণের প্রতি কাল্পনিক অভিযোগ আনছেন, তাঁদের প্রতি আমার নিবেদন, এবার অন্তত একবারের জন্যে হলেও সরেজমিন তথ্য যাচাই করে প্রকৃত সত্যটুকু তুলে ধরুন। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, ইতিহাসের চোখে ধুলা দিয়ে কতদিন আর নিজের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা যায় !

পরিশেষে যদি প্রশ্ন হয়, হঠাৎ এই অবেলায় এতো ব্যাখ্যা করে সুদের এই হিসাব পর্যালোচনার কী কারণ থাকতে পারে ? বিনীত জবাব হলো, বিশ্বনন্দিত ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নে আমাদের যার যে দৃষ্টিভঙ্গিই থাক, বহুল আলোচিত ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকাণ্ড নিয়ে নির্মোহ পাঠ ও যথাযথ বিশ্লেষণের প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় একটা সংবেদনশীল বিষয়ের প্রকৃত বাস্তবতার দিকে কৌতুহলি পাঠকের আগ্রহী দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। শুধু তাই নয়, এটা সময়ের দাবীতে ইতিহাসের চোখ থেকে যৎকিঞ্চিৎ ধুলো সরানোর নগন্য প্রচেষ্টাও । আদৌ তা হলো কিনা সময়ই  তা বলে দেবে হয়তো।

তবে তথ্য বিচারে লেখকের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে না এড়িয়ে যথাযথ অনুসন্ধিৎসাই হোক আমাদের ব্যক্তিগত দায়মোচনের অবাধ অঙ্গিকার।

সহায়ক-সূত্র:

> পুস্তিকা : গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার

> প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক: ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচন

[ sachalayatan ]


Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 214,062 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 88 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

এপ্রিল 2011
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ   জুন »
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: