h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| শ্রদ্ধেয় রাহাত খান, এভাবেও মিথ্যাচার করা যায় !

Posted on: 22/03/2011


১৪ অক্টোবর ২০০৬: শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ঘোষণার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ড. ইউনূস ও অন্যান্য

| শ্রদ্ধেয় রাহাত খান, এভাবেও মিথ্যাচার করা যায় !
-রণদীপম বসু

ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নন’- ১৯ মার্চ ২০১১ তারিখের দৈনিক কালের কণ্ঠে এরকম শিরোনামের একটা উপসম্পাদকীয় কলামে চোখ পড়তেই চমকে ওঠলাম ! আরো চমক অপেক্ষা করলো যখন লেখক হিসেবে এটাতে স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় রাহাত খানের নাম দেখলাম ! (Priyo Blog-এও একই লেখার পোস্ট ) যিনি একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তো বটেই, তার ওপর দৈনিক ইত্তেফাক-এর মতো সমৃদ্ধ ও দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী একটি পত্রিকায় যিনি অনেকদিন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে এতোকালের প্রতিষ্ঠিত একটি সত্যকে দুমড়ে দেয়া শিরোনামের এরকম একটি লেখা পড়ার আগেই নিজস্ব ভাবনা-রাজ্যটা যে দুলে ওঠবে ভীষণ তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে ! কিন্তু লেখাটা পড়ার পর সেই দুলুনিটা ঠেকলো গিয়ে আমাদের কথিত বিজ্ঞবানদের নিজেদের যা কিছু ইমেজ তা হাস্যস্পদ করে সুকৌশলে ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে অন্য কোন সম্মানিত নাগরিকের ইমেজ ধ্বংসের  বিকৃত সুচতুরতা দেখে। এটাকেই হয়তো বলে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গ করা। সমাজের মানী ব্যক্তিদের মধ্যে এই অভ্যস্ততা দেখে আমরা সাধারণ নাগরিকরা যে কতোটা হীনম্মন্য হয়ে পড়ি তা হয়তো তাঁরা ভেবে দেখারও প্রয়োজন মনে করেন না। এভাবে আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর তালিকা থেকে তাঁরা তাঁদের নামটাকে ধুসর করে দিয়ে আমাদের মনোজগতে যে অমোচনীয় দাগ কেটে দেন সেটা তাঁরা মুছবেন কী করে ! আবারো মনে পড়লো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত পঙক্তিটার কথা- ‘দেখায় বড়র মতো, বড় নয় কেউ।’

শুনেছি রাম জন্মের ষাট হাজার বছর পূর্বেই নাকি রামায়ণ রচিত হয়। রামায়ণে বর্ণিত এই কথাটা সংশ্লিষ্ট বিশ্বাসীরা হয়তো কায়মনোবাক্যেই বিশ্বাস করেন। বিশ্বাসের কাছে যুক্তি কোন্ ছাই ! কেননা দেবর্ষি নারদই যখন বাল্মীকিকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে- তুমিই রচিবে যাহা তাহাই সত্য, অন্য কিছু নয় ! তখন তো আর বিশ্বাস না করে জো নেই ! সর্বশক্তিমান প্রভু চাইলে কী না করতে পারেন ! অতএব যা হবার তা-ই হলো, আমরা বিশ্বাস করে নিলাম যে রামায়ণ-বর্ণিত কাহিনী অনুযায়ী ভারতের অযোধ্যায় রাম জন্ম নিলেন, একদিন পাকেচক্রে তিনি সদলে বনবাসে গেলেন এবং ঘটনাপরম্পরায় রাম-রাবণের যুদ্ধও সংঘটিত হলো। অবশেষে রাম তার অবতারসুলভ ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে রামরাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন। এখন সেই রামও নেই আর সেই অযোধ্যাও নেই। অথচ এই সাহিত্য-ফেলাচিটা রামায়ণ বিশ্বাসীদের কেউ একবার ভেবে দেখারও প্রয়োজন বোধ করলেন না যে, রামায়ণের রচনাকাল থেকে ষাট হাজার বছর আসলে কতদূর ! রামায়ণের কথা যদি সত্যিই হয়, তাহলে আদৌ কি রাম এখনো জন্ম নিয়েছেন, কিংবা আরো কতো হাজার বছর পর রামের জন্ম নেয়ার কাল ঘনিয়ে আসবে ?

এক হিসেবে এই বিশ্বাসীদের দোষ দেয়ার কোন সুযোগ নেই যতক্ষণ না রামায়ণের রচনাকাল থেকে ষাট হাজার বছর অতিক্রম করে এর সত্যাসত্য যাচাই করার সুযোগ পাই আমরা। সে পর্যন্ত ওটাকে নাহয় সে-যুগের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য হিসেবেই বিবেচনায় রাখি ? কিন্তু যে ঘটনা আগেই ঘটে গেছে এবং এরপর পৃথিবীর নদীগুলোয় অনেক পানিও গড়িয়ে গেছে তা পাল্টানোর ক্ষমতা কি স্বয়ং বিধাতাও রাখেন ? এটাকেই আমরা ইতিহাস বলি। কিন্তু বিধাতা সে ক্ষমতা না রাখলেও বাঙালির সে ক্ষমতা যে বহু আগেই অর্জিত হয়ে গেছে তা বোধ করি এখন আর কেউ অস্বীকার করবেন না। নইলে ওঠতে-বসতে বাংলায় ইতিহাস-বিকৃতি নামক শব্দযুগলের হরদম ব্যবহারে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হতে হতো না। এখন আমাদের মহান স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হয়, সংশ্লিষ্ট জনদের মৃত্যুর পর স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক হয়, মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার নিয়ে, সুশীল-অশীল নিয়ে বিতর্ক হয়, ইত্যাদি কতকিছু ! এবার এর সাথে আরেকটি বিষয় যুক্ত হলো, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা বিতর্ক।
.

১৪ অক্টোবর ২০০৬: শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ঘোষণার পর ঢকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ড. ইউনূসের পাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্ণর ড. আতিউর রহমান ও অন্যান্য


প্রফেসর ইউনূসকে নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহু বিতর্ক রয়েছে। যে যার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই এ বিতর্কে পক্ষাবলম্বন করেন। কেউ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, কেউ অরাজনৈতিক দৃষ্টিতে, কেউ কর্পোরাল ভঙ্গিতে, কেউবা অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দেখেন। আবার কেউ দেখেন সামাজিক দৃষ্টিতে।  এটা যার যার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, দায়বোধ ও নাগরিক অধিকারের ব্যাপার। যে যার মতো করে দেখতেই পারেন। মতামত প্রকাশ করার অধিকারও তিনি ধারণ করেন। তবে তা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই হতে হয়। কিন্তু কেউ যদি এসবের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য বিচ্যুতি বা বিকৃতি ঘটিয়ে প্রকাশ্যে অন্য নাগরিকের প্রতিষ্ঠিত ইমেজ ধ্বংস করার বিতর্কে নামেন, তাহলে তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করাও নাগরিক অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। শ্রদ্ধেয় রাহাত খানের লেখাটি পড়ে ধারণা করছি তিনি সেরকম একটি খারাপ দৃষ্টান্ত রাখার ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয়ে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার আসনটিই টলিয়ে দিতে বসেছেন। কেননা ড. ইউনূস সম্পর্কে তাঁর মনগড়া ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তিনি বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে যেভাবে উদ্দেশ্যমূলক ইতিহাস বিকৃতির পরাকাষ্ঠা দেখালেন তাতে করে তাঁর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা তো হারালোই, গোটা লেখাটাই একটা অন্তঃসারশূন্য বিকৃত বাগাড়ম্বরে পরিণত হয়েছে।
.
১৪ অক্টোবর ২০০৬: শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ঘোষণার পর সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনে ড. ইউনূস ও অন্যান্য
পাঠকের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখা বাঞ্ছনীয়, এ লেখার উদ্দেশ্য ড. ইউনূস বন্দনা নয় বা তাঁর সম্পর্কে আমার অবস্থান উপস্থাপন করাও নয়। এবং কাউকে অসম্মান করাও এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং বস্তুনিষ্ঠতার অভাব ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্যবিকৃতির মাধ্যমে কিভাবে রাহাত খানের মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির লেখাও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে তা দেখানো। কেননা তাঁর লেখায় যেভাবে ভুল ম্যাসেজ দেয়া হয়েছে তাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের তথ্য অনভিজ্ঞ পাঠক যে নিমেষেই বিভ্রান্ত হয়ে ভুল তথ্য ও ধারণা লালন করবেন তা তিনিও জানবেন না। তথ্য জানার অধিকার যেমন সবার রয়েছে, তেমনি তথ্যবিকৃতিকারীকেও তার দায় নিতে হয়।

জনাব রাহাত খান তাঁর লেখায় ড. ইউনূস বিষয়ক আমাদের এতোকালের জানা সত্যকে মাটিচাপা দিয়ে একটি সিদ্ধান্ত টেনে ফেলেছেন এভাবে-

‘তবে একটি ভুল তথ্য তাঁর ওপর আরোপ করা হয়। বলা হয়, তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। কথাটা সত্য নয়। ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশ সরকার। দেশের প্রচলিত আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধান ও তদারকির আওতায় একটি বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে ১৯৯০ সালে এর প্রতিষ্ঠা। ড. ইউনূসকে প্রতিষ্ঠাতা ম্যানেজিং ডাইরেক্টর পর্যন্ত বলা যেতে পারে। তবে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা তিনি নন কোনোক্রমেই।’

রাম-রহিম-যদু-মধু কেউ যদি উপরোক্ত কথাগুলো বলতো তাহলে হয়তো আমরা পাগলের প্রলাপ ভেবে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু এই কথাগুলোই যখন একজন রাহাত খান বলেন তখন তা আর হেসে উড়িয়ে দেয়ার উপায় থাকে না। কেননা উপরোক্ত কথাগুলোর পরই তিনি পরবর্তী বাক্যবিন্যাসে এটাই বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে একজন সাধারণ ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসেবে ড. ইউনূসকে অপসারণ কতোটা যুক্তিসঙ্গত। তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকার করে নিলে রাহাত খানের পরবর্তী কথামালা অসার হয়ে যায় ! অতএব কোনভাবেই প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া চলবে না। ফলে তিনি সুকৌশলে একটি কাল্পনিক বানোয়াট তথ্য দিয়েই তাঁর কথা টেনেছেন। অর্থাৎ তিনি নিজেই আরেকটি নতুন ইতিহাস রচনা করে ফেললেন ! জনাব রাহাত খান বলবেন কি তিনি কোথায় এ তথ্য পেয়েছেন যে, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৯০ সালে ? সাহিত্যে কল্পনা মূখ্য হলেও ইতিহাসে কল্পনাবিলাসের স্থান নেই, এ কথাটা যদি সাহিত্যিক রাহাত খানকে অঙ্গুলিনির্দেশ করতে বলতে হয় তাহলে এর চাইতে দুর্ভাগ্য আমাদের আর কী আছে ! কাল্পনিক ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে জনাব রাহাত খান হয়তো স্বেচ্ছায় ভুলে গিয়েছিলেন যে, ড. ইউনূসের অর্জিত বহু দেশি-বিদেশি পুরস্কারের মধ্যে একটি ছিলো ১৯৮৫ সালে প্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার। আর ১৯৮৪ সালে তিনি লাভ করেন ফিলিপাইনের রেমন ম্যাগসাসে পুরস্কার। নিশ্চয়ই ড. ইউনূসকে রামায়ণের কাহিনীর মতো গ্রামীণ ব্যাংকের জন্মের আগেই এ পুরস্কার দেয়া হয়নি।
.

১৪ অক্টোবর ২০০৬: জাতীয় স্মৃতিসৌধের মন্তব্য বইয়ে লিখিত অনুভূতি ব্যক্ত করছেন নোবেল লরিয়েট ড. ইউনূস


প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে বিশেষ সংসদীয় অধ্যাদেশ বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক (Grameen Bank) প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং তখনকার অর্থমন্ত্রী ছিলেন আমাদের বর্তমান অর্থমন্ত্রী মহোদয়ই। সময়ের কী পরিহাস ! প্রকৃতপক্ষে গ্রামীণ ব্যাংকের জন্ম তারও আগে, সেই ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প হিসেবে। এ ব্যাপারে জানতে হলে প্রফেসর ইউনূসের (Dr. Yunus) কোন এক জন্মদিনে উইশ করে লেখা ‘আটাশে জুন, এক অভিনব মানুষ ড. ইউনূসের জন্মদিন’ শীর্ষক এই পোস্টটাতে ঢুঁ মারলে এক নজরে ড. ইউনূসের জীবন ও কর্ম ইতিহাসের একটা টাচ-লাইন পেয়ে যেতে পারেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ড. ইউনূসকে নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক কিছু বিতর্কের প্রেক্ষিতে প্রচলিত যে বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক পানি ঘোলাঘুলি চলতো তাঁর একটা আউট-লাইন দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তাঁর অন্য এক জন্মদিনে পোস্ট করা এই ‘জন্মদিনের শুভেচ্ছা পোস্ট বনাম প্রফেসর ইউনূসকে নিয়ে উত্থিত প্রশ্নগুলো’ শীর্ষক লেখাটিতে। এছাড়া দুই বাঙালি নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন ও ড. ইউনূসের দারিদ্র্য দর্শনের একটা ছোট্ট তুলনামূলক আলোচনা রয়েছে এই ‘প্রফেসর ইউনূস ও অমর্ত্য সেন, ভিন্ন স্রোতে অভিন্ন মুখ’ শিরোনামের লেখাটায়। তবে হালের ২০মার্চ ২০১১এ দৈনিক প্রথম আলোয় বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের (Rehman Sobhan) ‘চাই রাষ্ট্র নায়কোচিত প্রজ্ঞা’ শিরোনামের গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গভীর পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে যথেষ্ট চিন্তার খোরাক দেবে বলে মনে হয়। জনাব রেহমানের এই লেখাটার সর্বক্ষেত্রেই একমত হতে হবে এমন কথা নেই, তবে এখান থেকে হয়তো আমরা আমাদের অজানা আরো অনেকগুলো তথ্য পেয়ে যেতে পারি।
.

সে যাক, আমরা পূর্বের আলোচনায় ফিরে আসি। কেউ হয়তো বলতে পারেন যে জনাব রাহাত খান (Rahat Khan) হয়তো ১৯৮৩ সালের জায়গায় ভুল করে ১৯৯০ লিখে ফেলেছেন। এটা বিশ্বাসযোগ্য হতো যদি তিনি এরপরও উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরো কিছু তথ্যবিকৃতির আশ্রয় না নিতেন। তাঁর গোটা লেখাটিতে নিজের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার নামে একজন প্রতিষ্ঠিত প্রবীন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসেবে নিজের নামের প্রতি বিন্দুমাত্র সুবিচার না করেই তিনি যেসব তথ্য উপাত্ত মুখস্থ বুলির মতো উগরে দিলেন সেখানে সাহিত্যিক বা সাংবাদিকসুলভ তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই না-করার আরেকটি কটু দৃষ্টান্ত বাড়ালেন শুধু। এই আকালের দেশে আমাদের শ্রদ্ধা রাখার তালিকাটা আরেকটু হ্রাসই করলেন তিনি। নইলে ড. ইউনূস সম্পর্কে এভাবে নিশ্চিত করে বলতেন না-

‘বাংলাদেশে তাঁর জন্ম, বাংলাদেশি বলে তাঁর পরিচিতি, অথচ আশ্চর্যের বিষয় ড. ইউনূস কোনো দিন, এমনকি নোবেলপ্রাপ্তির পরও বাঙালির গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক শহীদ মিনারে যাননি। কোনো দিন যাননি সাভারের স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধে।’
.

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মিডিয়া ক্যামেরা ঘিরে রেখেছে নোবেল লরিয়েট ড.ইউনূসকে


সাংবাদিকতার মহান পেশা যাঁর গৌরবময় অর্জনের তালিকায় শুধু নয়, ইত্তেফাকের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার যিনি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন, তিনি কী করে এভাবে বেমালুম ইতিহাস হজম করে ফেলেন ! কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। কিন্তু নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের মতো এতো বড়ো একজন ব্যক্তিত্ব যিনি দুনিয়া জুড়ে এই দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করেছেন এবং করছেনও, তাঁর নামে গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাচারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তাঁর চরিত্র হননের পেছনে রাহাত খানের মতো ব্যক্তির কী ফায়দা সেটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বৈকি। ২০০৬ এর ১৩ অক্টোবর এই জাতি যখন নোবেল পুরস্কারের মতো বিশাল সম্মানপ্রাপ্তির আনন্দে উল্লসিত, তার পরদিনই বাঙালির গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতি সৌধে ড. ইউনূসের শ্রদ্ধা নিবেদনের সচিত্র প্রতিবেদন দেশের প্রধান প্রধান পত্রিকায় কি সেটা ফলাও করে প্রকাশিত হয়নি ? তা কি বাঙালি এতো সহজেই ভুলে যাবে বলে রাহাত খান মনে করছেন ! বাঙালি সম্পর্কে তিনি এই ধারণাই পোষণ করেন ! তিনি কিভাবে ভাবলেন যে ডজন ডজন মিডিয়া-ক্যামেরা ছাড়া আর কোন ক্যামেরা সেখানে যায় নি ! সেদিনের সাংবাদিক ভাইদের কাছেও আমার জানতে ইচ্ছে হয়, এতো এতো ক্যামেরার উৎপাতে আমরা কৌতুহলী যারা শুধু এক নজর কাছে থেকে দেখবার জন্যে ড. ইউনূসের ধারেকাছেও ঘেষতে পারিনি, সেইসব স্টিল ক্লিক ও ভিডিও ক্লিপগুলো কি শুধুই লোক দেখানো ছিলো ? আহা সেলুকাস !
এ ছাড়াও জনাব রাহাত খান আরেক জায়গায় লিখেছেন-

‘সমাজে সামান্য কিছু ক্ষেত্র ছাড়া যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ হারের ক্ষুদ্রঋণে দারিদ্র্যমোচনে তেমন সফল হননি, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় গণহত্যাকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো প্রতিবাদ জানাননি, আমেরিকায় নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে যিনি আত্মরক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন, দেশের প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সময় যিনি সর্বদা তাঁর নেপথ্যচারিতা ও নিষ্ক্রিয়তা রক্ষা করেছেন নির্লিপ্তভাবে- সেই তিনি, ব্যবসা-বাণিজ্যের শিরোমণি ড. মুহাম্মদ ইউনূস পেলেন শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার। শান্তি পুরস্কারের প্রতি নোবেল কমিটির এই দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিহাস ছাড়া আর কী বলা যায়।’
.

তিনি নোবেল কমিটি ও পুরস্কার নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করতেই পারেন, এ ব্যাপারে কোন বিতর্কে যাওয়া আমার কাম্য নয়। কিন্তু উপরিউক্ত উদ্ধৃতির সাথে তাঁর লেখার প্রথমোক্ত উদ্ধৃতিটুকু মিলিয়ে দেখলে বক্তব্যের স্ববিরোধীতা কি পাঠকের চোখে পড়ে না ? প্রথমেই তিনি কিন্তু ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অস্বীকার করলেন। তাঁর মতানুযায়ী সরকারই এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ড. ইউনূস সেখানে একজন বেতনভোগী এমডি। সেক্ষেত্রে তাঁর কথিত গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ হারের ক্ষুদ্রঋণের আয় ও দায় কার কাঁধে বর্তায় সেটুকু কি তিনি খোলাশা করে বলবেন ? আসলেই কি গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদ উচ্চ হারের ? এ মুহূর্তে এটাও আমার বক্তব্যের লক্ষ্য নয়। আমার বক্তব্য স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ড. ইউনূসের কার্যক্রম নিয়ে জনাব রাহাত খান যা বললেন তা নিয়ে। যদি বলি রাহাত খান অনেকটা না-জেনেই এ কথাগুলো বলেছেন, তাহলে আমাদের প্রিন্টিং মিডিয়ায় পত্রিকা-সম্পাদক হিসেবে রাহাত খানের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে।  তাই এ কথা আমি বলছি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি না যে রাহাত খান জানেন না ড.ইউনূস সেসময় আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ফেলে রাতদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজের আঁকা ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন সম্বলিত নিয়মিত একটি নিউজলেটার প্রকাশ করে গেছেন। কিভাবে বিশ্বাস করবো যে রাহাত খান জানেন না মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সেই নিউজলেটারগুলোর ভলিউম এখনো সংরক্ষিত আছে ? জাতীয় প্রেস ক্লাবের অদূরে সেই জাদুঘরে যাওয়ার সময় না হলে অন্তত সেখান থেকে একটা ভলিউম কাউকে দিয়ে কিনে আনতেও পারেন ! ভেবে আশ্চর্য হই, যে কালের কণ্ঠে রাহাত খানের উপসম্পাদকীয়টা ছাপা হলো এই মার্চ মাসে, এক বছর আগের আরেক মার্চে এই পত্রিকাতেই মগজ ধোলাই নামের ট্যাবলয়েডে মুক্তিযুদ্ধকালীন কার্যক্রম নিয়েই ড. ইউনূসের একটি সাক্ষাতকার যে ছাপা হয়েছিলো, সেটাও রাহাত খানের নজরে আসেনি তা বলি কী করে !
.

এই হতভাগা দেশে সাধারণ মানুষ কখনো ইতিহাস বিকৃত করে না, বিকৃত করে বিশিষ্ট জ্ঞানপাপী জনেরাই। কথিত আছে, উদ্দেশ্যমূলক এরকম তথ্যবিকৃতির কারণে এদেশে যেমন বহু মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করে বেড়ায়, তেমনি অনেক রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধার লেবাস পরে দম্ভ করে বেড়ায়। রাহাত খান আজ মুক্তিযুদ্ধে ড. ইউনূসের ন্যূনতম ভূমিকাকেও যেভাবে অস্বীকার করলেন, তা অব্যাহত থাকলে আগামীতে তিনিই যে আরেক কাল্পনিক ইতিহাস ফেঁদে ড. ইউনূসকে রাজাকার যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে বিচার চেয়ে বসবেন না তা বিশ্বাস করি কী করে ! এসব ঘটনার বাহুল্যে আমরা এখন আশ্চর্য হওয়ার ক্ষমতাও বোধ করি হারাতে বসেছি।
.

এই পোস্টের ফাঁকে ফাঁকে প্রামাণ্য হিসেবে কিছু সংগৃহীত ছবি জুড়ে দিলাম এজন্যেই যে, এসব ছবিই বলবে আমাদের সম্মানিত রাহাত খানরা কিভাবে নিজের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসও সুযোগে পাল্টে দিতে বিন্দুমাত্র কসুর করেন না। আমাদের শ্রদ্ধার জায়গাগুলো এভাবে বিলীন হয়ে যাক এটা চাই না বলেই এ প্রতিক্রিয়াটার জন্ম। ড. ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংক ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তর্ক-বিতর্ক চলছে দেশি-বিদেশি মিডিয়াগুলোতে। এসব হাইপোথিটিক্যাল আলোচনা-তর্কে যাওয়ার জন্যে বর্তমান পোস্ট নয়। কারণ টাইম ইজ দ্য বেস্ট টিচার। সময়ই একদিন কাউকে না কাউকে দিয়ে প্রকৃত সত্যটুকু খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনবে। সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বৈ কি। তবে সত্যকে অস্বীকার করে কোন অর্জনই যে আসলে অর্জন নয় এটা যেন আমরা কখনোই ভুলে না যাই।

পরিশেষে আবারও বলে রাখি, কোন রাম-শ্যাম-যদু-মধু যদি এই উদ্দেশ্যমূলক লেখাটা লিখতো তাহলে লেখাটাকে গুরুত্ব দেয়ার কোন আগ্রহ থাকতো না। কিন্তু রাহাত খানের মতো বিশিষ্ট একজন ব্যক্তি যখন এরকম ভুল তথ্য সম্বলিত লেখা বাজারে ছাড়েন তখন সেটাকে আর গুরুত্ব না দিয়ে উপায় থাকে না। কেননা সচেতন নাগরিক হিসেবে জেনেশুনে এরকম তথ্যবিকৃতি এড়িয়ে যাওয়া অপরাধ ভেবেই এই প্রতিক্রিয়াটা বাধ্য হয়ে লিখতে হলো। এই পোড়ার দেশে তথ্যবিকৃতির বিপজ্জনক ধারা রোধ হওয়া আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম ও তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্যেই জরুরি এখন। আশা করি কেউ এটাকে কোনভাবেই ব্যক্তিবিদ্বেষ হিসেবে নেবেন না।
.
সংযুক্তি: ১৯৭১ সালে ড.ইউনূসের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির কর্মতৎপরতা নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠ ২১ মার্চ ২০১০ সংখ্যায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারের স্ক্যান-কপি  নিচে দেয়া হলো।
.

Advertisements

11 Responses to "| শ্রদ্ধেয় রাহাত খান, এভাবেও মিথ্যাচার করা যায় !"

বিধ্বংসী পোষ্ট দাদা। তবে গন্ডারের চামড়া তো তেনাদের, এগুলোকে মনে করে নেবেন বরই কাঁটার হালকা খোঁচাই তো…।

ধন্যবাদ রিং ভাই !

may may thanks Mr. Basu for your article

পোষ্ট টা ওদের জন্য একেবারে উপযুক্ত জবাব!

“এই হতভাগা দেশে সাধারণ মানুষ কখনো ইতিহাস বিকৃত করে না, বিকৃত করে বিশিষ্ট জ্ঞানপাপী জনেরাই”।
খুবই সত্যি!
অনেক ধন্যবাদ!

আপনাকেও ধন্যবাদ।
ইতিহাস বিকৃতির এই জঘন্য ভাইরাস থেকে আমরা মুক্ত হতে চাই…।

This guy i.e. Rahat Khan could not hide his real self – what a pathetic man, what a moron ! With all his abilities he is a mere sycophant and a spineless creature, a parasite that have been nourished in the unhealthy acrimonious political climate of Bangladesh. Thanks Mr Basu – well done and keep up.

দাদা এটা তাড়াতাড়ি কমুনিটি ব্লগে দিয়ে দেন।

সচলায়তনে দেয়া হয়েছে শামীম ভাই।
পোস্টের নিচে সচলের লিংক দেয়া আছে। ধন্যবাদ।

সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ! কষ্ট হয়, আমরা আমাদের নূন্যতম নৈতিকতাবোধ হারিয়ে ফেলেছি। তথ্যপূর্ণ চমৎকার লেখার জন্য ধন্যবাদ।

এই দুর্বহ অবস্থা থেকে কবে যে আমরা মুক্ত হবো কে জানে !
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 193,201 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 77 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2011
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   এপ্রিল »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: