h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| যেখানে শুয়ে আছেন আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ সাতজন |

Posted on: 18/03/2011


.
| যেখানে শুয়ে আছেন আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ সাতজন |
-রণদীপম বসু

১৯৭৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বরে সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ ও অদম্য সাহসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতির সেরা বীর সন্তানদেরকে শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এদের মধ্যে মরণোত্তর সাতজন সর্বশ্রেষ্ঠ উপাধি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ৬৮ জন ‘বীর উত্তম’, ১৭৫ জন ‘বীর বিক্রম’ এবং ৪২৬ জন ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।

শহীদ সাত বীরশ্রেষ্ঠরা হলেন রাইফেলস-এর ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ  ও ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ, সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল  ও সিপাহি মোহাম্মদ হামিদুর রহমান, নৌবাহিনীর ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন  এবং বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁরা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত আছেন। তাঁরা আমাদের গৌরবের অহঙ্কার। এই বীর সন্তানেরা এখন কে কীভাবে কোথায় শোয়ে আছেন তা দেখার আগে আসুন আমরা আরেকবার অবনত চিত্তে শ্রদ্ধা জানাই তাঁদের জীবন ও বীরোচিত গৌরব গাথাকে গর্বভরে স্মরণ করে।

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান:

১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকার ১০৯ আগা সাদেক রোডের ‘মোবারক লজে’ জন্ম নেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান
(Motiur Rahman) । মাতা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। ৯ ভাই ২ বোনের মধ্যে মতিউর ৬ষ্ঠ। পৈতৃক নিবাস তৎকালীন ঢাকা জেলা বর্তমান নরসিংদি জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে। পিতা মৌলবী আবদুস সামাদ ছিলেন কালেক্টরেট অফিসের সুপারিন্টেনডেন্ট। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে মতিউর এরপর চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানে সারগোদার পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে। ডিস্টিংকশনসহ মেট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালের জুন মাসে রিসালপুর পি.এ.এফ কলেজ থেকে বৈমানিক হিসেবে কমিশন লাভ করেন এবং ডিউটি পাইলট হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর করাচির মৌরীপুরে জেট কনভার্সন কোর্স সমাপ্ত করে পেশোয়ারে গিয়ে জেট পাইলট হন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ফ্লাইং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। এরপর মিগ কনভার্সন কোর্সের জন্য পুনরায় সারগোদায় যান। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর রিসালপুরে পাঠানো হয় তাঁকে। রিসালপুরে দু’বছর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করার পর ১৯৭০-এ করাচি বদলি হয়ে আসেন জেট ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হয়ে।

ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সমাধিসৌধ। আলোকচিত্র: রণদীপম বসু


১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দু’মাসের ছুটিতে ঢাকায় বেড়াতে আসেন মতিউর রহমান। দেশে অবস্থানকালে ২৫শে মার্চ পাকবাহিনীর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে মর্মাহত তিনি তখনই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে মনস্থ করেন। পাক-সৈন্যরা ভৈরব আক্রমণ করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইপিআর-এর সঙ্গে থেকে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরি করেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনদের চাপে তাঁকে ফিরে যেতে হয় পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মস্থলে। তাঁর মন পড়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে আর সুযোগ খুঁজতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের। দিনটি ছিলো একাত্তরের ২০ আগস্ট। জীবনের মায়া পরিত্যাগ করে স্ত্রী মিলি রহমান এবং দুই কন্যা মাহিন মতিউর ও তুহিন মতিউরের চাইতেও বড় হয়ে ওঠে তাঁর দেশপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে পাকিস্তানের করাচির মৌরীপুর বিমানঘাঁটিতে তাঁরই অবাঙালি ছাত্র ও সহযাত্রী পাইলট অফিসার মিনহাজ রশীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ জঙ্গি বিমান টি-৩৩ (যার ছদ্মনাম ব্লু-বার্ড ১৬৬) ছিনতাই করে পালিয়ে আসার সময় রশীদ এ ঘটনা কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানিয়ে দিলে অপর চারটি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশীদের  সাথে মতিউরের ধস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশীদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন। উড্ডয়ন উচ্চতা কম থাকায় রশীদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে ৩৫ মাইল দূরে বিন্দা গ্রামের থাট্টায় বিধ্বস্ত হয়। মতিউরের সাথে প্যারাসুট না থাকায় তিনি নিহত হন। তাঁর মৃতদেহ ঘটনাস্থল থেকে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়। সেখান থেকে করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের মূল্যায়নস্বরূপ তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁকে শত্রুভূমি পাকিস্তান থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এনে স্বাধীন বাংলার মাটিতে পুনরায় সমাহিত করা হয় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে।

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল:

Mostafa Kamal ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বর্তমান ভোলা জেলার দৌলতখান থানার পশ্চিম হাজিপুর গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের
(Mostafa Kamal) জন্ম। পিতা হাবিবুর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার। শৈশব থেকেই দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাত ছিলেন বলেই হয়তো পিতার সৈনিক জীবন তাঁকে আকৃষ্ট করে। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার পর বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ভর্তি হন। কুমিল্লায় ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে তাঁর পোস্টিং হয়। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে এই রেজিমেন্টকে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠানো হয়। পঁচিশে মার্চ কালরাত্রি থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৭ মার্চ এই রেজিমেন্ট পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ঘিরে তিনটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে। দক্ষিণ দিক থেকে নিরাপত্তার জন্য রেজিমেন্টের ২নং প্লাটুনকে আখাউড়ার দক্ষিণে গঙ্গাসাগরের উত্তরে দরুইন গ্রামে পাঠানো হয়। এই প্লাটুনেই ছিলেন সিপাহী মোস্তফা কামাল। কর্মতৎপরতার জন্য যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁকে মৌখিকভাবে ল্যান্স নায়েকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সে হিসেবে তিনি ছিলেন দশ জন সৈনিকের সেকশন কমান্ডার।
 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গঙ্গাসাগরে নির্মিত বীরশ্রেষ্ট মোস্তফা কামালের সমাধিসৌধ। আলোকচিত্রি: অজ্ঞাত। ছবি-কৃতজ্ঞতা:'পটভূমি তার শহীদ মিনার'-প্রকল্প ইত্তেফাক।

১৬ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে কুমিল্লা-আখাউড়া রেললাইন ধরে উত্তর দিকে এগুতে থাকে। পরদিন ১৭ এপ্রিল ভোরবেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দরুইন গ্রামে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের উপর মর্টার ও আর্টিলারির গোলাবর্ষণ শুরু করলে মেজর শাফায়াত জামিল ১১ নং প্লাটুনকে দরুইন গ্রামে আগের ২নং প্লাটুনের সাথে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেন। হাবিলদার মুনির ১১নং প্লাটুন নিয়ে দরুইনে পৌঁছলে সিপাহী মোস্তফা কামাল তাঁর কাছ থেকে গুলি নিয়ে নিজ পরিখায় অবস্থান নেন। বেলা ১১টার দিকে শত্রুর গোলাবর্ষণের সাথে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টিও। সাড়ে ১১টার দিকে মোগরা বাজার ও গঙ্গাসাগরের শত্রু অবস্থান থেকেও গোলাবর্ষণ শুরু হলো। এবং ১২টার দিকে পশ্চিম দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ।

প্রতিরক্ষার সৈন্যরা আক্রমণের তীব্রতায় বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং মোস্তফার ক’জন সঙ্গি শহীদ হন। মোস্তফা কামাল মরিয়া হয়ে পাল্টা গুলি চালাতে থাকেন। আত্মরক্ষার জন্য অধিনায়কসহ সবাই পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর পূর্ব দিকের সৈন্যরা পেছনে নতুন অবস্থান সরে যেতে থাকে এবং মোস্তফাকে যাবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু পুরো কোম্পানিসহ তাদের সবাইকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য মোস্তফা স্থানত্যাগ না করে  সাহসিকতার সঙ্গে পূর্ণোদ্যমে এলএমজি থেকে গুলি চালাতে থাকেন। তাঁর ৭০ গজের মধ্যে শত্রুপক্ষ চলে এলেও তিনি থামেননি। ফলে শত্রুরা তাঁর সঙ্গিদের পিছু ধাওয়া করতে সাহস পায়নি। একসময় গুলি শেষ হয়ে এলে শত্রুর আঘাতে তিনি লুটিয়ে পড়েন।

বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন:

Ruhul Amin ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ির বাঘচাপাড়া গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন
(Mohammad Ruhul Amin) জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আজহার পাটোয়ারী, মাতা জোলেখা খাতুন। বাঘচাপড়া প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে আমিষাপাড়া হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। সংসারের অসচ্ছলতার কারণে হাইস্কুলের পড়া শেষ করেই ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পাকিস্তান নৌ-বাহিনীতে যোগ দেন। আরব সাগরে অবস্থিত মানোরা দ্বীপে পিএনএস বাহাদুরে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর পিএনএস কারসাজে যোগদান করেন। ১৯৫৮-তে পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করেন এবং ১৯৬৫-তে মেকানিসিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। পিএনএস কারসাজে কোর্স সমাপ্ত করার পর আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮-তে চট্টগ্রাম পিএনএস বখতিয়ার নৌঘাঁটিতে বদলি হয়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঘাঁটি থেকে পালিয়ে গিয়ে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২নং সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী গঠিত হলে কলিকাতায় চলে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে দুটো গানবোট উপহার দেয়। গানবোট দুটোর নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। রুহুল আমিনকে পলাশের প্রধান ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।
 

খুলনায় রূপসার তীরে বাগমারা গ্রামে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সমাধিসৌধ। আলোকচিত্রি: ব্লগার ঝড়ো হাওয়া। ছবি-কৃতজ্ঞতা: রাগিব হাসান (উইকিপিডিয়া)।

৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলের পর খুলনার মংলা বন্দরে পাকিস্তানি রণতরী পিএনএস তিতুমীর দখল করার উদ্দেশ্যে ১০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে সাতটায় ‘পলাশ’ নিয়ে রুহুল আমিন মুক্তিবাহিনীর অন্য গানবোট ‘পদ্মা’ ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর গানবোট ‘পানভেল’-এর সঙ্গে মংলা বন্দরে পৌঁছান। দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি এলে অনেক উঁচুতে তিনটি পাকিস্তানি জঙ্গি বিমান  উড়তে দেখা যায়। শত্রুর বিমান অনুধাবন করে পদ্মা ও পলাশ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্র নাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। কিছুক্ষণ পরেই বিমানগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে এসে আচমকা গোলাবর্ষণ শুরু করে। গোলা সরাসরি ‘পদ্মা’র ইঞ্জিনরুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে দেয়। ‘পদ্মা’র এই পরিণতিতে পলাশের অধিনায়ক লে. কমান্ডার রায় চৌধুরি নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দিলেও ক্ষুব্ধ রুহুল আমিন বোটের ইঞ্জিন সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুঁড়তে বলে ইঞ্জিনরুমে ফিরে আসেন। ইতোমধ্যে শত্রুবিমানগুলো উপূর্যপুরি বোমা বর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয় এবং আহত হন তিনি। তবুও জাহাজ ত্যাগ না করে প্রাণপন চেষ্টা করে এই সাহসী বীর জীবনের বিনিময়ে রণতরীকে রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব মনে করেছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। অবশেষে পলাশের ধ্বংসাবশেষ পেছনে ফেলে আহত রুহুল আমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপসায়। পাড়েও এসে পৌঁছান তিনি। কিন্তু ততক্ষণে ঘৃণ্য রাজাকারের দল অপেক্ষা করছিলো সেখানে। আহত এই বীর সন্তানকে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে রূপসার পাড়ে-ই। তাঁর বিকৃত মৃতদেহ বেশ কিছুদিন সেখানে পড়ে ছিলো অযত্নে অবহেলায়।

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান:

Hamidur Rahman ১৯৫৩ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলা বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের
(Mohammad Hamidur Rahman) জন্ম। পিতা আব্বাস আলী মণ্ডল, মাতা মোসাম্মাৎ কায়সুন্নেসা। প্রথমে খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং পরে স্থানীয় নাইট স্কুলে সামান্য লেখাপড়া করলেও অভাবের তাড়নায় স্কুল ছেড়ে দিতে হয়। ১৯৭১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলে তাঁকে চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নারকীয় গণহত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে অবস্থিত প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সশস্ত্র লড়াই শুরু করলে হামিদুর রহমান এই বাহিনীতে যোগ দেন।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে ১৯৭১ সালের শেষের দিকে হামিদুর রহমান ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শ্রীমঙ্গল থানার ধলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন। এখানে অবস্থিত সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পাক-বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি দখল করা মুক্তিবাহিনীর জন্য খুবই জরুরি ছিলো। পরিকল্পনা মতো ২৮ অক্টোবর ভোর চারটায় মুক্তিবাহিনী লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌঁছে অবস্থান নেয়। সামনে দু’দিকে দু’প্লাটুন, পেছনে এক প্লাটুন মুক্তিসৈন্য অবস্থান নিয়ে তিন দিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে শত্রু অভিমুখে। শত্রু অবস্থানের কাছাকাছি এলে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয় এবং ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান বাহিনীর ৩০.এ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা এ যুদ্ধে অংশ নেয়। পাক-বাহিনীর একটি মেশিনগান-পোস্ট এমনভাবে বসানো ছিলো যে একে এড়িয়ে মুক্তিবাহিনীর জন্য সামনে এগুনো ছিলো অসম্ভব। মুক্তিবাহিনী পাক-বাহিনীর ওই মেশিনগান-পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রেনেড ছোঁড়ার দায়িত্ব দেয়া হয় হামিদুর রহমানকে। দায়িত্ব পেয়ে তিনি পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে, কিন্তু তার পরপরই হামিদুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। সে অবস্থাতেই তিনি মেশিনগান-পোস্টে গিয়ে সেখানকার দু’জন পাকিস্তানী সৈন্যের সাথে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেন এবং এভাবে একসময় মেশিনগান পোস্টকে অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন। এই সুযোগে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল উদ্যমে এগিয়ে যান এবং পাকিস্তানী শত্রু-বাহিনীকে পরাস্ত করে সীমান্ত ফাঁড়িটি দখল করতে সমর্থ হন। কিন্তু হামিদুর রহমান বিজয়ের এ স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি। ফাঁড়ি দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হামিদুর রহমানের লাশ উদ্ধার করে।

ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধি। আলোকচিত্র: রণদীপম বসু।


হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখণ্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামে স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। নিচু স্থানে অবস্থিত হওয়ায় কবরটি একসময় পানির নিচে তলিয়ে যায়। ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলস-এর একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করে এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ:

Munsi Abdur Rouf ১৯৪৩ সালের মে মাসে ফরিদপুর জেলার বোয়ালখালি থানা বর্তমান মধুখালী উপজেলার সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ
(Munsi Abdur Rouf)। পিতা মুন্সী মেহেদী হোসেন, মাতা মকিদুন্নেসা। কিশোর বয়সে পিতার আকস্মিক মৃত্যুর ফলে বেশিদূর লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি তাঁর। সংসারের অভাব মোচনের তাগিদে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় ১৯৬৩ সালের ৮ মে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ ভর্তি হন। তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৩১৮৭। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে তিনি চট্টগ্রামে ১১ নম্বর উইং-এ কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন।

যুদ্ধে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি পার্বত্য চট্টগ্রামের মহালছড়ি জলপথ দিয়ে পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনীর চলাচল প্রতিরোধের জন্য বুড়িঘাট এলাকার চিংড়ি খালের দুই পাড়ে প্রতিরক্ষা-ঘাঁটি গড়ে তোলে। মুন্সী আবদুর রউফ ছিলেন এই কোম্পানির একজন যোদ্ধা। রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি জলপথ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে ৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের দুই কোম্পানি সৈন্য সাতটি স্পীডবোট ও দুটি লঞ্চে করে বুড়িঘাট দখলের জন্য অগ্রসর হয় এবং প্রতিরক্ষা বুহ্যের সামনে এসে ৩ ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে হঠাৎ গোলাবর্ষণ শুরু করে।

রাঙ্গামাটির রিজার্ভ বাজারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিসৌধ। আলোকচিত্রি: অজ্ঞাত। ছবি-কৃতজ্ঞতা: 'পটভূমি তার শহীদ মিনার' প্রকল্প ইত্তেফাক।

সামান্য অস্ত্র ও ক্ষীণ লোকবল নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা রুখে দাঁড়ায়।  শত্রুর প্রবল শক্তি ও আক্রমণের তীব্রতায় সহযোদ্ধাদেরকে অস্ত্র নিয়ে পশ্চাদাপসারণের পরামর্শ দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে গেলেন পরিখায় এবং মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। মেশিনগানের এই পাল্টা আক্রমণের ফলে শত্রুর স্পীডবোটগুলো ডুবে যায়, আহত হয় এর আরোহীরা এবং লঞ্চ দুটো দ্রুত পেছনে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। এরপর সেখান থেকে শুরু করে দূরপাল্লার ভারী গোলাবর্ষণ। মর্টারের ভারী গোলা এসে পড়ে আবদুর রউফের উপর, লুটিয়ে পড়েন তিনি, আর নীরব হয়ে যায় তাঁর মেশিনগান। ততক্ষণে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হয় তাঁর সঙ্গিরা।

বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ:

Nur Mohammad Sheikh ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ (
Nur Mohammad Sheikh)। পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেসা। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু কিশোর বয়সে পিতা-মাতাকে হারিয়ে আর লেখাপড়া হয় নি তাঁর। সুঠাম দেহ আর সাহসী মন সম্বল করেই ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ ভর্তি হন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ। তাঁর কর্মস্থল ছিলো দিনাজপুর। ১৯৭০ সালে তাঁকে দিনাজপুর থেকে যশোরে বদলী করা হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ছুটিতে নিজ গ্রামে এসে পাক-বাহিনী কর্তৃক নিরীহ জনসাধারণকে হত্যার ঘটনা দেখে তিনি চাকুরিস্থলে ফিরে না গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭১-এর ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের সুতিপুরে মুক্তিবাহিনীর নিজস্ব নিরাপত্তার প্রয়োজনে একটি স্থায়ী টহল বসানো হয় এবং এই নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে ন’টার দিকে হঠাৎ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ করা হয়, তবু পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এক সময়ে সহযোদ্ধা সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এলএমজি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাদাপসরণ করতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে।
 

যশোরের শার্শার কাশীপুরে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধিসৌধ। আলোকচিত্রি: অজ্ঞাত। ছবি-কৃতজ্ঞতা: 'পটভূমি তার শহীদমিনার' প্রকল্প ইত্তেফাক।

নূর মোহাম্মদ ধরাশায়ী হওয়ামাত্র আহত নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। হাতের এলএমজি সহযোদ্ধা সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বললেন এবং মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন যতক্ষণ না তাঁরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণ ঐ রাইফেল দিয়ে শত্রুসৈন্য ঠেকিয়ে রাখবেন এবং শত্রুর মনোযোগ তাঁর দিকেই কেন্দ্রীভূত করে রাখবেন। অন্য সঙ্গিরা তাঁকে অনুরোধ করলেন তাঁদের সাথে যাওয়ার জন্য, কিন্তু তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে গেলে সবাই মারা পড়বে এই আশঙ্কায় তিনি রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। বাকিদেরকে তিনি অধিনায়কোচিত আদেশ দিলেন তাঁকে রেখে চলে যেতে।

শেষপর্যন্ত তাঁকে রেখে সন্তর্পণে সরে যেতে পারলেন বাকিরা। এদিকে সমানে গুলি ছুঁড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ। একদিকে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনী, অন্যদিকে মাত্র একটি রাইফেল ও সীমিত গুলি সম্বল করে অর্ধমৃত এক সৈনিক। এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রুপরে এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে।

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর:

Mohiuddin Jahangir বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ থানার রহিমগঞ্জ গ্রামে ১৯৪৮ সালে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের
(Mohiuddin Jahangir) জন্ম। পিতার নাম আবদুল মোতালেব হাওলাদার। মেধাবী ছাত্র জাহাঙ্গীর ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং ১৯৬৬-তে আইএসসি পাশ করার পর বিমান বাহিনীতে যোগদানের চেষ্টা করেন। কিন্তু চোখের অসুবিধা থাকায় ব্যর্থ হন। পরের বছর ১৯৬৭ সালে ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৮-এর ২রা জুন ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি পাকিস্তানে পশ্চিম কারাকোরাম এলাকায় ১৭৩ নম্বর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটেলিয়নের ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগদানের লক্ষ্যে ৩ জুলাই  পাকিস্তানে আটকে পড়া আরো তিনজন অফিসারসহ তিনি পালিয়ে পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা অতিক্রম করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তরক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে খরস্রোতা মুনাওয়ার নদী পার হয়ে দিল্লী-কলিকাতা ঘুরে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মেহেদীপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যোগ দেন।

বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শনের কারণে তাঁকে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘাঁটি দখলের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১০ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম, লেফটেন্যান্ট আউয়াল ও ৫০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা চাঁপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে বারঘরিয়া এলাকায় অবস্থান নেন। ১৪ ডিসেম্বর শীতের ভোরে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বারঘরিয়া এলাকা থেকে ৩/৪টি দেশি নৌকায় করে রেহাইচর এলাকা থেকে মহানন্দা নদী পার হন। নদী অতিক্রম করার পর উত্তর দিক থেকে একটি একটি করে প্রত্যেকটি শত্রু অবস্থানের দখল নিয়ে দক্ষিণে এগুতে থাকেন।

তিনি এমনভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা করেছিলেন যেন উত্তর দিক থেকে শত্রু নিপাত করার সময় দক্ষিণ দিক থেকে শত্রু কোনকিছু আঁচ করতে না পারে। এভাবে এগুতে থাকার সময় জয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত তখনই ঘটে বিপর্যয়। হঠাৎ বাঁধের উপর থেকে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের ৮/১০ জন সৈনিক দৌড়ে চর এলাকায় এসে যোগ দেয়। এরপরই শুরু হয় পাকিস্তানী বাহিনীর অবিরাম ধারায় গুলিবর্ষণ। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর জীবনের পরোয়া না করে সামনে এগিয়ে যান। ঠিক সেই সময়ে শত্রুর একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় জাহাঙ্গীরের কপালে এবং শহীদ হন তিনি। তাঁর মরদেহ শহীদী মর্যাদায় সমাহিত করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার ঐতিহাসিক গৌড়ের সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে।

বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি কীভাবে ধারণ করছি আমরা?

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশমাতৃকার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়া আমাদের এই আত্মত্যাগী বীরশ্রেষ্ঠরা (Virashreshtha) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত আছেন। খুলনায় রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামে রূপসার তীরে শুয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের সমাধি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গঙ্গাসাগরে, বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে শায়িত, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের সমাধি রাজশাহীর চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক গৌড়ের সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে এবং বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি রয়েছে যশোরের  শার্শার কাশিপুরে। উল্লিখিত এই পাঁচজন বীরশ্রেষ্ঠকে তাঁদের স্ব স্ব যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের স্থানেই সমাহিত করা হলেও বাকি দু’জন বীরশ্রেষ্ঠর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। তাঁরা হচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান ও বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। বর্তমানে এ দু’জনের সমাধিসৌধ রয়েছে ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে।

শহীদ বীরশ্রেষ্ঠদের সমাধিসৌধ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত ডিজাইনের একাংশ। ছবি: রণদীপম বসু


উল্লেখ্য যে, এই সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর স্মৃতিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহিমান্বিত করে রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তাঁদের স্ব স্ব সমাধিক্ষেত্রে এক অভিন্ন আকার ও ডিজাইনে ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এ প্রেক্ষিতে যে ডিজাইনটি নির্বাচিত হয় তা নান্দনিক স্থাপত্যবৈশিষ্ঠ্যে সত্যিই অসাধারণ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিই এর যথাযথ বর্ণনা ও প্রতীকী ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তবে সাধারণ দৃষ্টিতে প্রতীকীগুলো মোটেও অবোধ্য নয় বলেই মনে হয়। উঁচু ও প্রশস্ত বেদীর উপর একধার ঘেষে সারিবদ্ধ সাতটি স্তম্ভ সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর প্রতীক হিসেবে ভাবা যায় সহজেই। বেদীর দুই-তৃতীয়াংশ অবস্থানে আড়াআড়ি উল্লম্বভাবে তৈরি একটি জাতীয় পতাকার খণ্ডিত আদলে আয়তাকার ক্ষেত্রের মধ্যে ফাঁকা অর্ধ-গোলাকার অবয়ব ছুঁয়ে নির্মিত বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে মানচিত্রের রূপে। একবার দেখলেই বোঝা যায় এটা আমাদের জাতীয় পতাকার সেই অর্ধবিমূর্ত আদিরূপ, যার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি। আর মানচিত্রের নিম্নভাগ ছুঁয়ে পাশের বৃত্তাকার ক্ষেত্রটির মাঝে শ্বেতমর্মরে নির্মিত মূল সমাধি। আমাদের প্রাণপ্রিয় শহীদদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া পতাকা আর তাঁদেরই অবদানে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেশ ও জাতির এক চমৎকার প্রতীকী উপস্থাপনা। দেখলেই কেমন করে ওঠে বুক- শ্রদ্ধায় বিষাদে অহঙ্কারে। আরো কিছু নান্দনিক উপস্থাপনা রয়েছে গোটা স্থাপত্যটি ঘিরে। কিন্তু সে মোতাবেক বিভিন্ন অঞ্চলে সমাহিত সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর অভিন্ন ডিজাইনের স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির সিদ্ধান্ত কি পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে আজো ?

স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পেরিয়ে এসে আজ এক বুক কষ্ট নিয়ে এই প্রশ্লটুকু রাখতে সত্যিই লজ্জা হয়। কারণ সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর এই চারজনের সমাধিতে উপরিউক্ত অভিন্ন ডিজাইনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও বাকি তিনজন বীরশ্রেষ্ঠ রাঙ্গামাটিতে সমাহিত মুন্সী আবদুর রউফ, যশোরের শার্শায় সমাহিত বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ও মিরপুর বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধির ক্ষেত্রে বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে সেই মর্যাদা রক্ষিত হয়নি এখনো।
 

মিরপুর বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ও বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের পাশাপাশি সমাধি ভিন্ন চেহারায়।

মিরপুর বুদ্ধিজীবী সমাধিক্ষেত্রে গেলে যে-কারো মনই কষ্ট ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠবে। কারণ এখানে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শহীদ মতিউর রহমান ও শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের সমাধি পাশাপাশি থাকায় যথাযথ ডিজাইনে নির্মিত মতিউর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভের পাশে অবস্থিত খুব সাধারণ কবরের মতো পড়ে থাকা হামিদুর রহমানের সমাধিটি সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টিতে শুধু যে মানসিকভাবে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে তা-ই নয়, বুকের ভেতরে একটা লজ্জাতুর অপরাধবোধও জেগে উঠে।

জাতি হিসেবে শহীদদের প্রতি আমাদের দায়বোধ প্রশ্নহীন। তাঁদের প্রতি আমাদের যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনেও কমতি নেই। তাঁদের সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভগুলো আমাদের চেতনায় অনুপ্রেরণার উৎস। কোথাও কোথাও আমরা এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো জৌলসপূর্ণ করেই রেখেছি হয়তো। তবু বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদারই নামান্তর। যতক্ষণ না তা পূরণ হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই অক্ষমতা জাতির জন্য লজ্জা হয়েই ঝুলে থাকে। যদি তা-ই হয়, আমাদের একান্ত শ্রদ্ধার এই জায়গাটাকে এভাবে আর কতোদিন লজ্জায় আক্রান্ত করে রাখবো আমরা ? যত দ্রুত সম্ভব এ লজ্জার অবসান হোক- মহান স্বাধীনতার মাসে আমাদের এই নাগরিক মিনতিটুকু যেন আর বিফলে না যায়, এ আশা কি করতে পারি আমরা ?

তথ্য-সহায়তা:
১)  সাত বীরশ্রেষ্ঠ, বাংলা উইকিপিডিয়া
২)  শিশু-বিশ্বকোষ: ৪র্থ খণ্ড, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।
৩)  ‘পটভূমি তার শহীদ মিনার‘-প্রকল্প, ইত্তেফাক।

Advertisements

1 Response to "| যেখানে শুয়ে আছেন আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ সাতজন |"

বীরশ্রেষ্ঠদের ছবিতে ভুল আছে।

বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের ছবি হচ্ছে ষষ্ঠ ছবি।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের ছবি হচ্ছে দ্বিতীয় ছবি।
তৃতীয়টি বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের ছবি।
পঞ্চমটি বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ছবি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 193,002 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 77 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2011
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   এপ্রিল »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: