h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

| কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: আহসান মঞ্জিল |

Posted on: 02/03/2011


Ahsan Manzil
.
| কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: আহসান মঞ্জিল |
-রণদীপম বসু

ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক হিসেবে আহসান মঞ্জিলের (Ahsan Manzil) নাম শোনেন নি এমন শিক্ষিত বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে দক্ষিণমুখী হয়ে দাঁড়ানো আগুনে লালরঙা এই অসাধারণ কারুকার্যময় অট্টালিকা কেবল অমূল্য স্থাপত্য হিসেবেই নয়, ঢাকা নগরের অতীত ইতিহাস ও তৎকালীন জীবনযাত্রায়ও রেখেছে ব্যাপক প্রভাব। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত ঢাকায় তো বটেই, গোটা পূর্ববঙ্গেও প্রভাব বিস্তার করেছিলো আহসান মঞ্জিল। স্থানীয়ভাবে ঢাকাবাসীদের কাছে এর পরিচয় নবাববাড়ি নামে। অর্থাৎ এটা শুধু মঞ্জিল নয়, নবাব পরিবারের আভিজাত্য, বৈভব ও প্রভাবের প্রতীক এই অট্টালিকা। পাশাপাশি দুটো বিশাল দ্বিতল ভবনের পূর্ব পাশের ভবনে ছিলো নবাব পরিবারের বাস এবং পশ্চিম পাশেরটি ছিলো দরবার হল।
.
Ahsan Manzil Dhaka
.
আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইংরেজ সৃষ্ট নতুন নবাবদের আদি পুরুষ ঢাকার জমিদার আলী মিয়া বা খাজা আলীমউল্লাহ ১৮৩৫ সালে মতান্তরে ১৮৩৮ সালে ফরাসি কুঠিয়ালদের কাছ থেকে বুড়িগঙ্গার তীরে তাদের কয়েকটি কুঠিবাড়ি কিনে নেন। মূলত বাড়িগুলো ছিলো ফরিদপুরের জালালদির জমিদার শেখ এনায়েতুল্লাহর। ধারণা করা হয় এগুলোর একটি পরিচিত ছিলো রংমহল নামে। এনায়েতুল্লাহর ছেলে শেখ মুতিউল্লাহ এই রংমহল বিক্রি করে দিয়েছিলেন ফরাসিদের কাছে। ফরাসিদের কাছ থেকে কিনে রংমহলটি সংস্কার করে আলীমউল্লাহ বসবাস শুরু করেন। ব্যাবসা থেকে পুঁজি প্রত্যাহার করে জমিদারিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নব্য জমিদার হয়ে ওঠা আলীমউল্লাহ ১৮২৫ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কতকগুলো জমিদারি কিনেছিলেন। যার বার্ষিক আয় ছিলো তৎকালীন হিসাবে আটলক্ষ টাকা। কিন্তু তিনি শুধু ঢাকার নন, পূর্ববঙ্গের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হলেও নব্য ধনী হিসেবে সামাজিক আভিজাত্যে তাঁর স্থান ছিলো নিচুতে। তাঁর কেনা মহলটির তৎকালীন নাম ছিলো আলী মিয়ার রংমহল। আভিজাত্য অর্জনের জন্য আলীমউল্লাহ তখন ঢাকার বনেদী পরিবারসমূহের কাছ থেকে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনা শুরু করলেন। পরবর্তীকালে এই পরিবারের উত্তরপুরুষ খাজা আবদুল গনি সারাজীবন ঢাকায় অবস্থান করে ঢাকা শহর উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখে এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে সখ্যতা সৃষ্টি করে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এই পরিবারের প্রভাব প্রতিপত্তি বৈভব বহুগুণ বৃদ্ধি করেন। এরই ফলশ্রুতিতে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেয়া নবাব উপাধি প্রাপ্ত হন এবং বংশানুক্রমিকভাবে সে উপাধি ব্যবহারের অধিকারও অর্জন করেন। এতে করে আক্ষরিক অর্থেই তিনি নবাবী জীবন-যাপনের মাধ্যমে ঢাকা শহর শাসন করেন।
.
Ahsan Manzil Dhaka.
১৮৭২ সালে নবাব আবদুল গনি সেই আলি মিয়ার রংমহলটিকে প্রায় পুননির্মাণ করে নিজের ছেলের নামে নাম রাখেন ‘আহসান মঞ্জিল’, যদিও ঢাকাবাসীর কাছে সবসময় এটি নবাববাড়ি নামেই পরিচিত। জর্জিয়ান বা পালাডিয়ান (স্থপতি আন্দ্রে পালাডিও-র নামানুসারে) স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দ্বিতল স্থাপনাটি বিশাল সোপান সারিসহ একটি উঁচু পেডিয়াম বা মঞ্চের উপর স্থাপিত। এর দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার দিকে বারান্দা ও সিঁড়ি, যে সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি দোতলায় ওঠা যায়। সিঁড়িটি দ্বিতীয় তলায় তিন খিলান বিশিষ্ট প্রক্ষিপ্ত প্রবেশপথে গিয়ে উন্মুক্ত হয়েছে। উত্তর দিকে রয়েছে ফটক ও নহবতখানা যা আবদুল গনিই নির্মাণ করিয়েছিলেন। তবে সে সময় বাড়িটিতে কোন গম্বুজ ছিলো না। ১৮৮৮ সালে ঢাকায় প্রবল টর্নেডোতে বাড়িটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাগ্যক্রমে নবাব পরিবার বেঁচে যায়। এরপর নবাব পরিবার ঢাকায় তাঁদের আরেকটি অট্টালিকায় আশ্রয় নিয়ে আহসান মঞ্জিল আবার পুনঃনির্মাণ করান এবং তখনই নির্মিত হয় নবাববাড়ির বর্তমান আকর্ষণীয় গম্বুজটি। যা প্রবেশপথের পেছনের স্তম্ভ ও জানালাযুক্ত ড্রামের উপর স্থাপিত।
.
Ahsan Manzil Dhaka.
‘আহসান মঞ্জিল’-এর ওপরতলার পূর্বদিকে ছিলো বৈঠকখানা, লাইব্রেরী ও অতিথিদের জন্য তিনটি ঘর। পশ্চিমদিকে বলনাচের ঘর, নবাবদের শোয়ার ঘর। নিচের তলায় সমপরিমাণ ঘর, পূর্বদিকে ছিলো খাবার ঘর আর পশ্চিম দিকে বিখ্যাত দরবার হল। ১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গের মাধ্যমে ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় বা তার আগের বছর নওয়াব সলিমুল্লাহ বাহাদুরের সম্মানিত অতিথি হিসেবে গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন এই প্রাসাদে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায়।
.
Ahsan Manzil Dhaka.
বর্তমানে ‘আহসান মঞ্জিল’ সংস্কার হয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে সংরক্ষিত। প্রতিদিন দর্শনীর বিনিময়ে প্রচুর দেশী-বিদেশী দর্শনার্থীর আগমনে আহসান মঞ্জিল এলাকা দারুণ সরব হয়ে ওঠে। কালের পরিক্রমায় সেই নবাবেরা আজ নেই, নবাবীও নেই। তবু বিকেলের হালকা সূর্যালোকেও ঝলমল করে ওঠা আহসান মঞ্জিলের আগুনরঙা গায়ের প্রতিফলিত আভা এখনো নবাব পরিবারের সেই বৈভব ও ঐতিহ্যের আলো ছড়িয়ে যায় ঠিকই দর্শনার্থীদের বিস্ময়মণ্ডিত চোখে…।
.
Ahsan Manzil Gate Dhaka.
তথ্যসহায়তা:
০১) স্থাপত্য / বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-২ / বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।
০২) ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী / মুনতাসীর মামুন।
০৩) ছবি : রণদীপম বসু।
[ আহসান মঞ্জিলের আরো ছবি এখানেএখানে ]
.

Advertisements

2 Responses to "| কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: আহসান মঞ্জিল |"

আশা রাখি আপনার এ ক্ষুরধার লেখনী চলতেই থাকবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 176,747 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2011
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   এপ্রিল »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: